আন নাযারাত || পর্ব-৪

আন নাযারাত || পর্ব-৪

  • মুফতি আব্দুস সালাম ইবন হাশিম

ভূমিকা

(গত পর্বের পর)

আমি পড়েছি ওয়াজির ইবনু যায়েদুন-এর বিলাপ—কখনো নিজের জীবন নিয়ে, আবার কখনো প্রেমিকা ওয়াল্লাদা-র স্মৃতিতে—প্রতিটি উচ্চারণ আমাকে এক অনন্ত বিষাদের স্রোতে ভাসিয়ে নিয়েছে।

কেঁদেছি ইবনু মুনারযির-এর কান্নায়, যিনি তাঁর প্রভু আবদুল মজিদ-এর জন্য শোক প্রকাশ করেছিলেন; কেঁদেছি বুহতুরির আর্তনাদে, যিনি খলিফা আল-মুতাওয়াক্কিল-এর জন্য শোকবিহ্বল ছিলেন; ইবনু লাব্বানার অশ্রু ইবনু আব্বাদ-এর জন্য; আত-তাইমির বিলাপ ইয়াজিদ ইবনু মাজিদ-এর জন্য; মারওয়ান ইবনু হাফসার কান্না মা’ন ইবনু জায়েদার জন্য।

সবচেয়ে হৃদয়বিদারক যে চিত্রটি আমার মস্তিষ্কে গভীর ছাপ রেখে গেছে, তা হলো মজনু-এর পাগলামি তার লায়লাকে নিয়ে।

আমি তাকে কল্পনায় দেখি, নিজের গোত্রের পাশেই, নিঃসঙ্গ, বস্ত্রহীন, আত্মবিচ্যুত হয়ে বসে আছেন। তার মন বিক্ষিপ্ত, বুদ্ধি বিচ্যুত, মুখে আবোলতাবোল বকছেন, মাটিতে রেখা আঁকছেন, ধূলার সঙ্গে খেলা করছেন।

তারপর তিনি হয়ে ওঠেন জংলি পশুর সঙ্গী—মরুর মধ্যে উদ্ভিদের ওপর জীবনধারণ করছেন,  হরিণের সঙ্গে জলপানে যাচ্ছেন, পথচারীদের সঙ্গে পথ বেয়ে উঠছেন, তাদের সঙ্গে ঢাল বেয়ে নামছেন—শেষে সে প্রাণ হারান এক শুষ্ক, ধূলিধূসর, পাথরে ভরা, প্রাণশূন্য প্রান্তরে—নিঃসঙ্গ, নীরব, কাতর এক মৃত্যুর গহ্বরে।

আর কাঁদিয়েছে আমাকে কায়েস লুবনার শোক—যে নিজ প্রেমিকা লুবনা-কে ত্যাগ দিয়েছিল পিতার আদেশ মান্য করে, তাঁর সন্তুষ্টির জন্য, এবং নীতির প্রতি আনুগত্য প্রদর্শনের আশায়। তারপর  সেই প্রেম তাকে টেনে নিয়ে গেল অচিন এক দিশায়, এমন দুর্দান্ত মোহে, এমন দগ্ধ ভালোবাসায়, যে সে চিরতরে হারিয়ে গেল দ্বিধার মধ্যে—একদিকে নীতিবোধের প্রতি বিশ্বস্ততা, আরেকদিকে হৃদয়ের প্রেম-নিষ্ঠা।

কী গভীর ব্যথা, কী অন্তর্দাহ! যেমন ছিল জামীল ইবনু মু’আম্মার-এর অবস্থান তাঁর পিতার সামনে—যিনি তাঁকে ভর্ৎসনা করলেন কঠোর ভাষায়, তীব্র দুঃখে ও ক্রোধে, তাঁর বুসাইনার সাথে -প্রেমকে কেন্দ্র করে যে উন্মাদনা তাঁকে গ্রাস করেছিল। অথচ তবু জামীল সাহস করলেন, নিজের প্রাণের ঝুঁকি নিয়েও তাঁর প্রেমিকাকে ভালবাসার কথা বললেন, আর বললেন এক অলঙ্ঘ্য সত্য:

“হে পিতা! আপনি কি কখনো দেখেছেন এমন কোনো মানুষ, যে তার হৃদয়ের প্রেমকে নিজ ইচ্ছায় রুখতে পেরেছে? অথবা যে নিজেকে ভুলিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছে? অথবা যে কপালে যা লেখা, তা নিজ শক্তিতে ফিরিয়ে দিতে পেরেছে?

আল্লাহর কসম, যদি পারতাম হৃদয় থেকে তার স্মৃতি মুছে ফেলতে, অথবা দৃষ্টির ভেতর থেকে তার ছায়া সরিয়ে দিতে—তবে নিশ্চয়ই তা করতাম।

কিন্তু সে সাধ্য আমার নেই। এ এক দুর্ভাগ্য, এক অভিশাপ, যা আমার ভাগ্যে লিখিত হয়েছে, সময়ের হাতে আরোপিত এ এক দহন।

আমি তো এই গোত্রের এলাকায় যাওয়া থেকে বিরতই থাকি, তার কাছে যাওয়া থেকেও নিজেকে বাঁচিয়ে রাখি—যদি এ বিরহে মৃত্যুই ঘটে আমার! এটিই আমার সাধ্য, এটিই আমার সাধনার সীমা।”

আর কাঁদতে লাগলেন প্রিয়নবী ﷺ, যখন তিনি শুনলেন কায়েস ইবনু আসিম তার পূর্বজন্মের (জাহেলি যুগের) ঘটনা বর্ণনা করছেন—যেখানে তিনি বলছিলেন, কীভাবে তিনি নিজের কন্যাদের জীবন্ত কবর দিতেন। তিনি বললেন, “আমার অনুপস্থিতিতে একবার আমার স্ত্রী এক কন্যার জন্ম দেন, এবং তাকে তার মামার বাড়িতে লুকিয়ে রাখেন—মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচানোর জন্য, এবং তার প্রতি মমতার কারণে। আমি যখন সফর শেষে ফিরে আসি, এবং তার গর্ভাবস্থার কথা জিজ্ঞাসা করি, তখন সে জানায় যে মৃত সন্তান প্রসব হয়েছিল। তারপর বহু বছর কেটে যায়, এবং সেই কন্যাটি বড় হয়ে ওঠে। একদিন সে তার মায়ের সঙ্গে দেখা করতে আসে, এবং আমি তাকে সেখানেই দেখি। আমি তার সৌন্দর্য ও বুদ্ধিমত্তায় মুগ্ধ হই এবং জিজ্ঞাসা করি সে কে। তখন মেয়েটি নিজেই আমাকে পুরো ঘটনা খুলে বলে, কিছুই গোপন করেনি—আশা করেছিল আমি হয়তো তাকে আপন করে নেবো, তাকে ভালোবাসা ও স্নেহ দেবো।

কয়েকদিন আমি কিছু করিনি। এরপর একদিন, যখন তার মা বেখায়ল ছিলেন, আমি  মেয়েটিকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ি—দূর মরুভূমিতে গিয়ে তার জন্য একটি গর্ত খুঁড়ি। তখন সে আমাকে জিজ্ঞাসা করতে থাকে, ‘হে আমার বাবা, আপনি আমার সঙ্গে কী করতে চলেছেন? কেন এই গর্ত?’ আমি তখন তাকে ধীরে ধীরে সেই গর্তে রাখি, আর সে কাঁদতে থাকে—’আপনি কি আমাকে একা ফেলে যাবেন এখানে? আপনি কি আমাকে ছেড়ে চলে যাবেন?’ কিন্তু আমি তার দিকে ফিরে তাকাইনি; আমি মাটি ফেলতে শুরু করি। সে কেবল কাঁদে, আর শেষ পর্যন্ত, তার কণ্ঠস্বর স্তব্ধ হয়ে যায়, আর গহিন নিস্তব্ধতা নেমে আসে মরুভূমি জুড়ে।”

আর একদিকে ছিল সেই বেদনার্ত বেদুঈন মায়ের অশ্রুবর্ষণ, যে তার আদরের সন্তানকে হারিয়েছে প্রবাসের মাটিতে। ছেলেটি ছিল মৃত, অচেনা এক নগরের অচেনা এক কবরস্থানে। মায়ের হৃদয় ক্ষতবিক্ষত। সে সন্তানের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে তাকে শেষ বিদায় জানাচ্ছিল, কাঁপা কণ্ঠে বলছিল:

“আল্লাহর কসম, হে আমার বাছা! আমি তো তোমাকে নিজের দুধে স্নেহে লালন করেছি — একেবারে কোলের শিশু অবস্থায়। অথচ হায়, এত তাড়াতাড়ি তোমার বিদায়! মনে হচ্ছে, এই দুই অবস্থার মাঝে কোনো দীর্ঘ সময়ই ছিল না, যা আমি তোমার জীবনের আনন্দে কিছুটা তৃপ্তি নিয়ে কাটাতে পারতাম।

তুমি, যে একদিন ছিলে সজীব, নবীন, প্রাণপ্রাচুর্যে ভরপুর, যে হাসিতে আর সুবাসে পূর্ণ জীবন উপভোগ করছিলে — সেই তুমিই আজ মৃত্তিকার নিচে চাপা পড়া এক নীরব দেহ মাত্র, ধ্বংসপ্রাপ্ত অস্থির স্তূপ, এক শূন্য ধ্বংসভূমি!

হে আল্লাহ! তুমি তো তাকে আমার চোখের শীতলতা ও শান্তি হিসেবে দান করেছিলে। কিন্তু আমাকে বেশিদিন তার সান্নিধ্যে রাখোনি; অচিরেই তাকে আমার বুক থেকে কেড়ে নিয়েছো। তারপর তুমি আমাকে ধৈর্যের নির্দেশ দিলে, আর ধৈর্যের বিনিময়ে পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি দিলে। আমি তোমার সেই প্রতিশ্রুতি মেনে নিয়েছি, তোমার ফয়সালায় রাজি হয়ে গেছি।

তাই হে আল্লাহ, তুমি করুণা করো তার কবর জীবনের উপর, শান্তি দাও তার একাকীত্বে, ঢেকে দাও তার দোষত্রুটি সেই দিন, যেদিন সকল লজ্জা ও গোপন বিষয় উদঘাটিত হবে।

হায়, মাতৃহারা সব মায়েরা! কী ভয়াবহ তাদের হৃদয়ের জ্বলন, কী অস্থির তাদের রাতের নিদ্রাহীনতা, কী দীর্ঘ তাদের রাত, কী নিঃসঙ্গ তাদের মন, কী করুণ তাদের নিস্তব্ধতা!

তারা সুখ থেকে কত দূরে, আর দুঃখের কত কাছে!”

আর কত দুঃখ, কত হৃদয়ভাঙা অপেক্ষা করছিল সেই দুই প্রেমিকের—আরওয়া ইবনে হিজাম ও আফরা বিনতে আক্বাল-এর জন্য! নিয়তির নির্মম খেলায় তারা হয়েছিল পরাজিত ও বিচ্ছিন্ন; ভাগ্যের পথ তাদের এমন এক মোড়ে এনে দাঁড় করায়, যেখানে মিলনের সমস্ত সম্ভাবনা নিঃশেষ হয়ে যায়। আফরা হয়ে যায় অপরের সহধর্মিণী, আর আরওয়া রয়ে যায় একা, উদভ্রান্ত, প্রেমবিধুর, পৃথিবীর পথে পথে ঘুরে মরতে থাকে বিভ্রান্ত এক আত্মার মতো। কোথাও তার ঠাঁই নেই, শান্তি নেই, শুধু স্মৃতির বিষাক্ত ছায়ায় জীবনের পথ পাড়ি দিতে দিতে একদিন সে এসে দাঁড়ায় তার প্রিয় আফরার ঘরের কাছে।

সে নিজেকে অচেনা অতিথির বেশে লুকিয়ে আনে—ভেবে নেয়, আফরার স্বামী নিশ্চয়ই তাকে কেবল অচেনা এক পথিক ভেবে স্বাগত জানাবে। কিন্তু যখন জানতে পারে, সে ব্যক্তি তার আসল পরিচয় জানে তবুও তাকে তিরস্কার করে না, তুচ্ছ করে না, তখন লজ্জায় আর থাকতে পারে না। আফরার কাছে দাঁড়িয়ে সে বলে ওঠে:

“ওহে আফরা! তুমিই ছিলে আমার জীবনের একমাত্র প্রাপ্তি। তুমি চলে গেছো, আমার সমস্ত জীবনও যেন তোমার সঙ্গেই বিদায় নিয়েছে। এমন জীবনে বাঁচার কীইবা অর্থ আছে? এই মানুষটি—তোমার স্বামী—আমার প্রতি যা সহনশীলতা দেখিয়েছেন, যা উদারতা দেখিয়েছেন, তা কেউ কারো জন্য করে না। আমি আর থাকতে পারছি না। আমি চলে যাচ্ছি। আমি জানি, আমি চলেছি আমার মৃত্যুর দিকেই।”

তার চোখে তখন অশ্রুধারা, আফরার চোখেও। দুজনেই কাঁদতে থাকে, হৃদয় ফেটে যেতে থাকে, অতঃপর সে বিদায় নেয়—চিরদিনের মতো।

কিন্তু সেই বিদায়ের পর আরওয়া ভেঙে পড়ে, যেভাবে কোন ভগ্ন হৃদয় শেষবারের মতো টিকে থাকার শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলে। ফেরার পথে বারবার অজ্ঞান হয়ে পড়ে। তখন তার মুখের উপর রাখা হয় সেই রুমালটি—যা আফরা বিদায়ের মুহূর্তে তাকে দিয়েছিল। সেই চিহ্ন, সেই স্মৃতি, সেই গন্ধেই যেন আবার ফিরে আসে প্রাণ। সে ফিরে আসে তার বাড়িতে, কিন্তু দীর্ঘ এক বছর তার মুখ থেকে কেউ শুনতে পায় না কোনো শব্দ, না কোনো দীর্ঘশ্বাস—নীরব এক ধ্বংস হয়ে ওঠে সে।

শেষে, যখন সব আশা নিঃশেষ হয়ে যায়, তখন সে অসুস্থ হয়ে পড়ে। পথচারীদের একজন তাকে দেখে প্রশ্ন করে কী হয়েছে তার। সে নিজের বুকের ওপর হাত রেখে শুধু বলল:

“এ যেন এক বুনো পাখি এসে তার ডানা দিয়ে আমার হৃদয় আঁকড়ে ধরেছে—এতটাই যন্ত্রণায় কাঁপছে বুক।”

তারপর সে একটি দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলল—সেই নিশ্বাসেই যেন তার প্রাণ পাখি উড়ে গেল।

আফরা যখন তার মৃত্যুসংবাদ পায়, সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। সে ছুটে যায় স্বামীর কাছে, বলে: “আমার চাচাত ভাইয়ের যা কিছু ঘটেছে, তার সবই আমার কারণে। সে আমার জন্যই মরেছে। আমি তার জন্য শোক পালন করব, মাতম করব।”

স্বামী বলে, “তুমি যা চাও করো।”

তখন আফরা তিনদিন ধরে তার জন্য কাঁদে, আহাজারি করে, এবং চতুর্থ দিনেই—তিনদিনের ক্রন্দনের ভার সইতে না পেরে—সে-ও চলে যায় মৃত্যুর পথে, চিরদিনের জন্য আরওয়ার সঙ্গেই মিলিত হতে।

চলবে

 

অনুবাদক – মুদির, মাদরাসাতু ইকরা

Related Articles