যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবে ইতিবাচক হামাস ইসরাইলি সাড়ার অপেক্ষা

যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবে ইতিবাচক হামাস ইসরাইলি সাড়ার অপেক্ষা

  • আলজাজিরা, টাইমস অব ইসরাইল ও রয়টার্স।
  • হামাস মানলে ইসরাইলও যুদ্ধবিরতি মানবে, আশা যুক্তরাষ্ট্রের
  • রাফাহ থেকে জোর করে বাস্তুচ্যুত ১০ লাখের বেশি ফিলিস্তিনি
  • গাজায় কাজ করছে না ইসরাইলি সামরিক কৌশল : বিশেষজ্ঞ

ফিলিস্তিনের গাজায় সর্বশেষ যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবকে ইতিবাচকভাবে দেখছে হামাস। এখন ইসরাইলের সাড়ার অপেক্ষায় আছে বলে জানিয়েছে মধ্যস্থতাকারী দেশ মিসর। মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সামেহ শুকরি এ কথা বলেছেন। তিনি বলেন, সর্বশেষ যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে ‘ইতিবাচকভাবে’ দেখেছে হামাস। এখন ইসরাইলের প্রতিক্রিয়া কী, সেটার অপেক্ষা।
শুক্রবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন একটি চুক্তির জন্য একটি প্রস্তাব রাখেন। সেটিকে তিনি সর্বশেষ ইসরাইলি প্রস্তাব হিসেবে দাবি করেন। মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সামেহ শুকরি গাজা সীমান্ত এবং মাদ্রিদের ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের স্বীকৃতি নিয়ে আলোচনার জন্য স্পেনে অবস্থান করছেন। সেখানে তিনি আরো বলেন, মিসর রাফা সীমান্ত ক্রসিংয়ে ইসরাইলি উপস্থিতি প্রত্যাখ্যান করে। তিনি আরো বলেন, ফিলিস্তিনি প্রশাসন ছাড়া রাফা ক্রসিংয়ের কাজ চালিয়ে যাওয়া কঠিন।

যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব নিয়ে আশা যুক্তরাষ্ট্রের : এ দিকে গাজায় চলমান যুদ্ধের ইতি টানতে নতুন যে যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়েছে, হামাস রাজি থাকলে ইসরাইলও সেটি মেনে নেবে বলে আশা করছে যুক্তরাষ্ট্র। এ কথা জানিয়েছেন দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের মুখপাত্র জন কিরবি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন গত সপ্তাহে যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনাটি তুলে ধরেন। যুদ্ধবিরতির এই প্রস্তাবে ইসরাইল রাজি হবে বলে আশা প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। যদিও ইসরাইলের মন্ত্রিসভার কয়েকজন সদস্য ইতোমধ্যেই প্রস্তাবটির বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।

রোববার মার্কিন গণমাধ্যম এবিসি নিউজকে দেয়া একটি সাক্ষাৎকারে দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের মুখপাত্র কিরবি বলেছেন, যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবে হামাস রাজি হলে ইসরাইলও ‘হ্যাঁ বলবে’। আমরা এখন হামাসের কাছ থেকে একটি আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছি, বলেন করবি। ইসরাইল ও হামাস, উভয়পক্ষই ‘যত দ্রুত সম্ভব’ ঘোষিত যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনার প্রথম ধাপ কার্যকর করতে সম্মত হবে বলেও আশা করছেন তিনি।

মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের মুখপাত্র জন কিরবি আরো আশা করছেন যে, ছয় সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি চলাকালে উভয়পক্ষই বৈঠকে বসবে। কিরবি বলেন, আমরা বলছি না যে, তারা (হামাস) এখন আর ইসরাইলি জনগণের জন্য কোনো হুমকি না। অবশ্যই তারা হুমকি । কিন্তু তারা (অতীতে) যে কাজ করেছে, সেটি করার সামরিক সক্ষমতা (এখন) তাদের নেই।

যুদ্ধবিরতি চুক্তি আজই চূড়ান্ত করুন : ইসরাইলের বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার ল্যাপিদ সম্প্রতি উন্মোচিত যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনায় সম্মত হওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন এবং এ বিষয়ে বিস্তারিত জানার জন্য শিগগিরই কায়রোতে একটি প্রতিনিধিদল পাঠাতে বলেছেন। এক্স-এর একটি পোস্টে, ল্যাপিদ প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে সরকার টিকিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় সমর্থন দেয়ার বিষয়টি পুনর্ব্যক্ত করেছেন। নেতানিয়াহু সরকারের ডানপন্থী জোট মিত্ররা যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনায় সম্মত হলে সরকার পতনের হুমকি দিয়েছে।

ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহার দাবি : রাফা ক্রসিং দিয়ে ফের তৎপরতা শুরু করার জন্য এর ফিলিস্তিনি পাশ থেকে ইসরাইলি বাহিনীর প্রত্যাহার চায় মিসর। রোববার কায়রোতে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও মিসরের কর্মকর্তাদের মধ্যে একটি বৈঠক হয়েছে, এই বৈঠকে মিসর নিজেদের দাবিতে অনড় ছিল বলে দেশটির দুই নিরাপত্তা কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন।

মে মাসে রাফা শহরে আক্রমণ শুরু করার সময় ইসরাইল এই ক্রসিংটির ফিলিস্তিনি পাশটি দখল করে নেয়, পরে তারা গাজার সাথে মিসরের পুরো সীমান্ত নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়। এতে ক্ষুব্ধ মিসর এই গুরুত্বপূর্ণ ক্রসিংটিতে ইসরাইলের সাথে সব ধরনের সহযোগিতা বন্ধের হুমকি দেয়। মিসরের ওই দুই নিরাপত্তা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ক্রসিংটি ফের চালুর বিষয়ে কোনো চুক্তি না হলেও রোববারের বৈঠকটি ইতিবাচক ছিল।

বৈঠকে মিসরের প্রতিনিধিরা বলেছেন, যদি ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ কাজ ফের শুরু করতে রাজি হয় তবে তাদের কার্যক্রম তদারকি করার জন্য সীমান্তটি ইউরোপীয় পর্যবেক্ষকদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। এর জবাবে ইসরাইলি ও মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রাফা ক্রসিংয়ের কার্যক্রমের বাধাগুলো অপসারণে তারা দ্রুত কাজ করবেন।

বাস্তুচ্যুত ১০ লাখের বেশি ফিলিস্তিনি
গাজার রাফা শহর থেকে ১০ লাখের ফিলিস্তিনিকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করা হয়েছে। সোমবার এই তথ্য জানিয়েছে জাতিসঙ্ঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থী সংস্থা (ইউএনআরডব্লিউএ)। ত্রাণ সংস্থাগুলো জানিয়েছে, ইসরাইলি হামলা থেকে বাঁচতে গাজার অন্যান্য স্থান থেকে দক্ষিণাঞ্চলীয় রাফাহতে প্রায় দশ লাখেরও বেশি মানুষ আশ্রয় নিয়েছিল। অনেক ফিলিস্তিনি জানিয়েছেন, গত কয়েক মাস ধরে তারা গাজার যেখানেই যাচ্ছেন সেখানেই ইসরাইলি হামলার ঝুঁকিতে রয়েছেন। ইউএনআরডব্লিউএ বলেছে, হাজার হাজার পরিবার এখন খান ইউনুস শহরে ক্ষতিগ্রস্ত ও ধ্বংসপ্রাপ্ত ভবনগুলোতে আশ্রয় নিয়েছেন। সেখানে ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি সত্ত্বেও তাদের প্রয়োজনীয় পরিষেবা প্রদান করছে সংস্থাটি।

কাজ করছে না ইসরাইলি সামরিক কৌশল : গত বছরের ৭ অক্টোবর থেকে ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় নির্বিচারে আগ্রাসন চালিয়ে যাচ্ছে ইসরাইল। দীর্ঘ প্রায় আট মাসের এই যুদ্ধে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে গাজা। বাড়িঘর, মসজিদ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল সবকিছুই গুঁড়িয়ে দিয়েছে ইসরাইলি বাহিনী। জাতিসঙ্ঘের তথ্য মতে, উপত্যকার ৭০ শতাংশের বেশি স্থাপনা ধ্বংস করেছে ইসরাইল। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুদ্ধে সাফল্য অর্জনে স্পষ্টত ব্যর্থ হয়েছে ইসরাইল। গাজায় কাজ করছে না ইসরাইলি সামরিক কৌশল।

এ বিষয়ে দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের ওমর আশুর আলজাজিরাকে বলেছেন, ইসরাইলের সামরিক কৌশল- তিন দফার কৌশলের ওপর নির্মিত: এর মধ্যে রয়েছে গাজার কিছু অংশ পুনরুদ্ধার করা, যার মধ্যে এক কিমি. প্রশস্ত বাফার জোন, গাজাকে পূর্ব এবং পশ্চিমে ভাগ করার জন্য সালাহ আল-দিন রাস্তা বরাবর অবস্থান নেয়া নেটজারিম করিডোর দখলে নেয়া, এসব জায়গায় তাদের শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করা এবং তারপরে গোয়েন্দা-নেতৃত্বাধীন অভিযান পরিচালনা করা, যার লক্ষ্য হামাসের সেল এবং অন্যান্য সামরিক গোষ্ঠীকে ক্ষয় ও ধ্বংস করা।

তিনি বলেন, তারপর যখন তাদের বাহিনী ক্লান্ত হয়ে যায়, পুনরায় মোতায়েন করা এবং অভিযান অব্যাহত রাখা এবং এভাবে পুনরাবৃত্তি ঘটানো। ওমর আশুর বলেন, কিন্তু জাবালিয়া শরণার্থীশিবিরে আমরা যা দেখেছি ইসরাইলের এই কৌশল কাজ করছে না। এই সামরিক কৌশল আরো বেশি বেসামরিক মৃত্যুর কারণ হচ্ছে এবং নেতানিয়াহু সরকারের ওপর আরো বেশি আন্তর্জাতিক চাপের তৈরি করছে। স্পষ্টতই, তারা রাফাতেও তাদের সামরিক লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি।

Related Articles