হামাস নেতা সিনওয়ারকে লক্ষ্য করে হামলা ইসরায়েলের

হামাস নেতা সিনওয়ারকে লক্ষ্য করে হামলা ইসরায়েলের

পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : ফিলিস্তিনের ছিটমহল গাজার দক্ষিণাঞ্চলে হামাস নেতা মোহাম্মদ সিনওয়ারকে লক্ষ্যস্থল করে একটি হাসপাতালে বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। এতে তার ভাগ্যে কী ঘটেছে তা পরিষ্কার হয়নি। এদিকে গাজা জুড়ে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৭০ জন নিহত হয়েছে। অন্যদিকে ইয়েমেন থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসের দাবি করেছে ইসরায়েল।

ইসরায়েলের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও এ হামলার বিষয়ে জ্ঞাত দুটি সূত্রের বরাত দিয়ে সিএনএন জানিয়েছে, মঙ্গলবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যায় খান ইউনিসের ইউরোপীয় হাসপাতালে হামলাটি চালানো হয়। গত অক্টোবরে ইসরায়েলি বাহিনী ইয়াহিয়া সিনওয়ারকে হত্যার পর থেকে তার ভাই মোহাম্মদ সিনওয়ার গাজায় হামাসের আসল নেতা হয়ে উঠেছিলেন।

ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইউরোপীয় হাসপাতালটিতে হামলায় ছয় ফিলিস্তিনি নিহত ও আরও অন্তত ৪০ জন আহত হন। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) জানিয়েছে, হাসপাতালটির নিচে ভূগর্ভস্থ একটি অবকাঠামোতে ‘হামাসের কমান্ড ও কন্ট্রোল সেন্টার’ ছিল, সেখানে ‘সন্ত্রাসীদের’ লক্ষ্যস্থল করেছে তারা। তবে কাকে লক্ষ্য করে এ হামলা চালানো হয়েছে আইডিএফ তা জানায়নি।

খান ইউনিসের ইউরোপীয় হাসপাতালের নার্সিং বিভাগের প্রধান ডা. সালেহ আল হামসের ভাষ্য অনুযায়ী, হাসপাতালের উঠানে অনেকগুলো ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। এতে কিছু মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে। ঘটনাটিকে ‘বিপর্যয়কর’ বলে অভিহিত করেছেন তিনি। হামলার সময় মেডিক্যাল টিমগুলো রোগীদের হাসপাতালের নিরাপদ পাশে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। ধারণা করা হচ্ছে এটি গত কয়েক সপ্তাহের মধ্যে গাজায় হওয়া সবচেয়ে বড় হামলাগুলোর একটি। সিনওয়ারকে নিয়ে ইসরায়েলের দাবিগুলো প্রত্যাখ্যান করেছে হামাস।

এক বিবৃতিতে তারা বলেছে, এককভাবে ফিলিস্তিনি প্রতিরোধই তার দাপ্তরিক গণমাধ্যমের মাধ্যমে, প্রকাশিত তথ্য নিশ্চিত বা অস্বীকার করার জন্য অনুমোদিত কর্তৃপক্ষ ইসরায়েলি কর্মকর্তারা মোহাম্মদ সিনওয়ারকে তার ভাই ইয়াহিয়ার মতোই কট্টরপন্থি বলে বিবেচনা করে। কিন্তু মোহাম্মদ সামরিক দিক থেকে অনেক বেশি অভিজ্ঞ।

আইডিএফের তথ্য অনুযায়ী, মোহাম্মদ ২০১৬ পর্যন্ত খান ইউনিস ব্রিগেডের কমান্ডার ছিলেন। তিনি ও তার ভাই ইয়াহিয়ার মতো ইসরায়েলে চালানো ৭ অক্টোবর হামলার অন্যতম মূল পরিকল্পনাকারী বলে বিশ্বাস ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর। গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে গাজায় হামাসের অনেক জ্যেষ্ঠ নেতার সঙ্গে তিনিও লুকিয়ে ছিলেন। ২০২৩ এর ডিসেম্বরে আইডিএফ একটি ভিডিও প্রকাশ করে বলেছিল, মোহাম্মদ সিনওয়ার গাজার একটি টানেল দিয়ে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছেন।

২০২৪ এর ফেব্রুয়ারিতে আইডিএফ জানায়, তারা খান ইউনিসের পশ্চিমাংশে তার দপ্তর খুঁজে পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি শুভেচ্ছার নিদর্শনে হিসেবে হামাস মার্কিন-ইসরায়েলি নাগরিক এডেন আলেকজান্ডারকে মুক্তি দেওয়ার এক দিন পর মোহাম্মদ সিনওয়ারকে লক্ষ্যস্থল করল ইসরায়েল। এই এক জন জিম্মিকে মুক্ত করার জন্য যে চুক্তি হয়েছে তা ইসরায়েলকে পাশে ঠেলে দিয়েছে, কারণ হামাস ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে।

এদিকে মঙ্গলবার ভোররাত থেকে গাজায় ইসরায়েলের চালানো হামলায় অন্তত ৭০ জন নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসার্থীরা। এর মধ্যে কেবল উত্তর গাজাতেই ভারী বোমাবর্ষণে অন্তত ৫০ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। উত্তর গাজার জাবালিয়া শহর এবং শরণার্থী শিবিরে হামলা হয়েছে।

সেখানকার ইন্দোনেশীয় হাসপাতাল জানায়, নিহতদের মধ্যে আছে ২২ জন শিশু ও ১৫ জন নারী। অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে হামলাস্থলের মেঝেতে লাশের স্তূপ পড়ে থাকতে দেখা যায়।

ইসরায়েলের সেনাবাহিনী বলছে, তারা গাজায় সাধারণ মানুষের ওপর এই হামলার খবর খতিয়ে দেখছে। মঙ্গলবার রাতে হামলা চালানোর আগে জাবালিয়াসহ আশপাশের এলাকাগুলোতে অধিবাসীদের সতর্ক করা হয়েছিল বলেও দাবি করে তারা। ফিলিস্তিনের একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী রকেট হামলা চালানোর জবাবে উত্তর গাজায় এই হামলা চালানো হয় বলে জানিয়েছে ইসরায়েলের সেনাবাহিনী।

জাতিসংঘের মানবিক কার্যক্রম বিষয়ক প্রধান টম ফ্লেচার জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যদের গাজায় ‘গণহত্যা ঠেকাতে’ ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানোর পর ইসরায়েল এই হামলা চালাল।

অন্যদিকে ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী আরও জানিয়েছে, তারা ইয়েমেন থেকে তাদের ভূখণ্ডের দিকে ছোড়া একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বাধা দিয়ে ধ্বংস করেছে। বুধবারের এই হামলার ঘটনায় কেউ আহত বা কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে তাৎক্ষণিকভাবে খবর হয়নি।

টাইমস অব ইসরায়েল জানিয়েছে, জেরুজালেম ও আশপাশের অনেকগুলো শহরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সতর্কতা জানিয়ে সাইরেন বেজে ওঠে। পশ্চিম তীরের কিছু ইহুদি বসতিতেও সাইরেনের শব্দ শোনা যায়। সাইরেন বাজার কয়েক মিনিট আগে ইসরায়েলিদের ফোনে আসা সতর্ক বার্তায় দীর্ঘ পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কথা জানানো হয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য সফরের মধ্যেই ইসরায়েলে এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাল ইয়েমেনের হুতিরা।

ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, ইয়েমেনের হুতিদের সঙ্গে তিনি একটি অস্ত্রবিরতিতে পৌঁছেছেন আর এটি লোহিত সাগরে মার্কিন জাহাজগুলোতে হামলা বন্ধ করবে। হুতি সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি জানিয়েছেন, তেল আবিবের বেন গুরিয়ন বিমানবন্দর লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্রটি ছোড়া হয়।

এর কিছুক্ষণ পর ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) ইয়েমেনের হুতি নিয়ন্ত্রিত তিনটি বন্দরের জন্য সতর্ক বার্তা দিতে শুরু করে। আইডিএফ ইয়েমেনি বন্দরগুলোতে বিমান হামলা চালাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইসরায়েলের সেনাবাহিনী বলেছে, হুতিরা হোদেইদাহ, রাস ইসা ও সালিফ বন্দর ব্যবহার করে আসছে, এগুলো থেকে সবাইকে সরে যাওয়ার জন্য সতর্কতা জারি করা হচ্ছে।

সূত্র: রয়টার্স, আলজাজিরা

Related Articles