আমার ছেলের নাম আবরার ফাহাদ | মাহবুব রেজা
এক
সকাল থেকে আবরার ফাহাদের মৃত্যু সংবাদ দেখার পর মনটা ভারী আর বিষণ্ণ হয়ে আছে। ক্রমাগত নিজের ওপর নিজের রাগ হচ্ছে। জেদ হচ্ছে। কারো সঙ্গে কথাও বলতে ইচ্ছে করছে না। সময় যত গড়াতে থাকল হত্যাকাণ্ডের নির্মমতা দেখে শিউড়ে উঠছি, এ আমি কোন দেশে আছি! ফেসবুকে একটা পোষ্টের জন্য এভাবে একজন বন্ধুকে অন্য বন্ধুরা মেরে ফেলতে পারে!
অফিসের প্রায় পুরোটা সময় মেজাজ খারাপ করে কানে হেড ফোন লাগিয়ে রাখলাম। লাকি আখন্দ আমার প্রিয় শিল্পীদের একজন। তাঁর অনেক গানই আমার অসম্ভব ভালো লাগে। আজ তাঁর একটা গানই বারবার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে শুনতে থাকলাম,আগে জানিতাম তবে মন ফিরে চাইতাম, এই জ্বালা আর প্রাণে সহে না…
দুই
অফিস থেকে সন্ধ্যার পরে বাসায় ফিরলে আবরারের মতো আমার একমাত্র ছেলের প্রথম এবং একমাত্র কাজ হলো সে আমার জন্য এক গ্লাস পানি নিয়ে এসে আমার টেবিলে রাখে। তারপর আমার সঙ্গে শৈশবের বন্ধুরা যেভাবে কথাবার্তা বলত সেও অবিকল সেরকম করে আমার সঙ্গে কথা বলে।
‘কি খবর?’
‘তোমার শরীরটা কেমন?’,
‘তোমার আর কিছু লাগবে?’
‘মাকে কি এখন চা দিতে বলব?’,
‘গোসল করবা?’
আজ আমার ছেলে টেবিলে পানির গ্লাস রেখে কিছু না বলে চুপচাপ নিজের ঘরে চলে গেল। ছেলে উদয়ন কলেজে পড়ে। প্রথম বর্ষ। বাবার শখকে সে নিজের শখ বলে জ্ঞান করে। বুয়েটে পড়ার আগ্রহ ঢের- কলেজ শেষ করে কোচিং করতে যায় বুয়েটের এক ছাত্রের কাছে।
পানি দিয়ে চলে যাওয়ার সময় আমি ছেলের দিকে তাকিয়ে থাকি।
ছেলেটা আমার গায়ের রঙ পায় নি। কোত্থেকে যে এমন গৌড় বর্ণ পেল! এখনই সে লম্বায় আমাকে ছাড়িয়ে গেছে, সামনের দিনে আমাকে আরও ছাড়িয়ে যাবে। ছেলেটার হালকা গোঁফের রেখা দিনদিন পষ্ট হচ্ছে, জুলফি, গাল আর থুতনির আশেপাশকার ভুট্টার আঁশের মতো কেশরাজি ক্রমশ ঘন হয়ে উঠছে।
ছেলেটা চলে গেল ঠিকই। কিন্তু ওর চলে যাওয়ার সময় মেঝেতে ওর ছায়া লম্বা হয়ে পড়ল। আমি সেই ছায়ায় আরেকজনের ছায়া দেখতে পেলাম।
সেই ছায়ার নাম আবরার ফাহাদ।
৭ অক্টোবর, ২০১৯


