আদিল মাহমুদ : মুসলিম উম্মাহের দুটি আনন্দ-উৎসবের দিনের একটি হচ্ছে ঈদুল আযহার দিন। এই দিনের অন্যতম বড় ইবাদত হচ্ছে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্যে কুরবানি করা। কুরবানির বিধান যুগে যুগে সব শরিয়তেই বিদ্যমান ছিল। মানব সভ্যতার সুদীর্ঘ ইতিহাসে প্রমাণিত, পৃথিবীর সব জাতি ও সম্প্রদায় কোনো না কোনোভাবে আল্লাহর দরবারে তার প্রিয় বস্তু উৎসর্গ করতেন। উদ্দেশ্য একটাই ছিল- ‘আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জন।’
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্যে কুরবানির এক বিশেষ রীতি পদ্ধতি নির্ধারণ করে দিয়েছি, যেন তারা ওই সব পশুর ওপর আল্লাহর নাম নিতে পারে, যা আল্লাহ তাদেরকে দান করেছেন।’ (সুরা হজ : আয়াত ৩৪)
আল্লাহর নৈকট্য ও সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে পশু কুরবানী করা, ত্যাগ স্বীকার করা, উৎসর্গ করা ইত্যাদির নাম কুরবানি। ইমাম আওজায়ী, ইমাম লাইস, ইমাম আবু হানীফা রহ. প্রমুখের মতে কুরবানি করা ওয়াজিব। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাঁর নবীকে কুরবানি করতে নির্দেশ দিয়েছেন। বলেছেন- ‘আপনি আপনার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় করুন ও কুরবানি করুন।’ (সূরা কাওসার : আয়াত ২)
এ আয়াতে ঈদের সালাত আদায় করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে ও কুরবানির পশু জবাই করতে আদেশ করা হয়েছে। তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সারা জীবন কুরবানির ব্যাপারে অত্যন্ত যত্নবান ছিলেন। হাদীস শরীফে এসেছে- সাহাবি ইবনে উমর রা. বলেছেন, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দশ বছর মদিনাতে ছিলেন, প্রতি বছর কুরবানি করেছেন। (আহমদ ও তিরমিজি, আহমদ শাকের হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন)
কুরবানির প্রচলন শুরু হয়েছিল হযরত আদম আলাইহিস সালামের দুই ছেলে হাবিল ও কাবিলের মধ্যে সংঘটিত করবানির মাধ্যমে। যার বিস্তারিত বর্ণনা সুরা মায়েদা এর ২৭-২৮ নাম্বার আয়াতে রয়েছে। কুরবানির প্রচলন হযরত আদম আলাইহিস সালামের যুগ থেকে শুরু হলেও মুসলিম উম্মাহের কুরবানি মূলত আল্লাহর নবী হযরত ঈবরাহীম আলাইহিস সালাম স্বীয় পুত্র ইসমাঈল আলাইহিস সালামকে কুরবানি করার অনন্য ঈমানী পরীক্ষা থেকে বর্তমান পদ্ধতির কুরবানির সূচনা হয়েছে।
কুরবানি শরীয়তে এটি ইবাদত হিসেবে সিদ্ধ, যা কুরআন, হাদীস ও মুসলিম উম্মাহর ঐকমত্যে প্রমাণিত। কুরআন শরীফে এসেছে- ‘তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় করো ও পশু কুরবানি করো।’ (সূরা কাওসার : ২)
‘বল, আমার সালাত, আমার কুরবানি, আমার জীবন ও আমার মরণ জগৎসমূহের প্রতিপালক আল্লাহরই উদ্দেশ্যে। তাঁর কোন শরীক নেই এবং আমি এর জন্য আদিষ্ট হয়েছি আর আমিই প্রথম মুসলিম।’ (সূরা আনআম : আয়াত ১৬২-১৬৩)
হাদীসে এসেছে- বারা ইবনে আজিব রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ঈদের সলাতের পর কুরবানির পশু জবেহ করলো তার কুরবানি পরিপূর্ণ হলো, আর সে মুসলিমদের আদর্শ সঠিকভাবে পালন করলো। (বুখারী- ৫৫৪৫, মুসলিম-১৯৬১)
আনাস ইবনে মালিক রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজ হাতে দু’টি সাদা কালো বর্ণের দুম্বা কুরবানি করেছেন। তিনি বিসমিল্লাহ ও আল্লাহু আকবার বলেছেন। তিনি পা দিয়ে দুটো কাঁধের পাশ চেপে রাখেন। (বুখারী-৫৫৬৫, মুসলিম-১৯৬৬)
এক পরিবারে একাধিক ব্যক্তির উপর কুরবানি ওয়াজিব হলে তাদের প্রত্যেককে নিজ নিজ কুরবানি আদায় করতে হবে
কুরবানি প্রত্যেক ওই ব্যক্তির উপর ওয়াজিব, যে কুরবানি ঈদের প্রথম দিন, অর্থাৎ জিলহজ্জ মাসের ১০ তারিখ থেকে শুরু করে জিলহজ্জ মাসের ১২ তারিখ সূর্যাস্তের মধ্যে নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক থাকবে। নিসাবের পরিমাণ সম্পদের হিসাব হচ্ছে প্রয়োজনীয় অর্থ সম্পদের বাইরে অতিরিক্ত সম্পদের মূল্য (সাড়ে ৫২ ভরি রূপার মূল্য অনুযায়ী) ৫২ থেকে ৫৫ হাজার টাকার মধ্যে হওয়া। এক পরিবারে একাধিক ব্যক্তির উপর কুরবানি ওয়াজিব হলে তাদের প্রত্যেককে নিজ নিজ কুরবানি আদায় করতে হবে। সবার পক্ষ থেকে একজন কুরবানি আদায় করলে সবার পক্ষ থেকে আদায় হবে না।
কারও উপর কুরবানি ওয়াজিব না হলেও তিনি কুরবানি দিতে পারবেন। কিন্তু যার উপর কুরবানি ওয়াজিব তিনি কুরবানি আদায় না করলে ওয়াজিব ভঙ্গের গুনাহগার হবেন। কুরবানী ওয়াজিব হওয়ার পর কুরবানি না করে সেই টাকা দান করলে বা কারো সাহায্যে খরচ করলে কুরবানি আদায় হবে না। দান করার সওয়াব হবে এবং কুরবানি না করাতে গুনাহ হবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঐ ব্যক্তিকে ঈদগাহে আসতে নিষেধ করেছেন, যার উপর কুরবানি ওয়াজিব কিন্তু সে কুরবানি করল না।
তাই আমাদের সবার উচিত সামর্থ্য থাকলে কুরবানি আদায় করা। আর কুরবানীকে পুণ্যের কাজ হিসেবে মনে করা। অসম কোনো প্রতিযোগিতার নাম কুরবানী নয়। আল্লাহ তাআলা আমাদের তাওফিক দিন। আমীন
কুরবানির ফজিলত হচ্ছে, যে ব্যক্তি কুরবানি দিবে সে হযরত ঈবরাহীম আলাইহিস সালাম ও হযরত মুহাম্মদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আদর্শ বাস্তবায়ন করলো। পশুর রক্ত প্রবাহিত করার মাধ্যমে আল্লাহ রাববুল আলামিনের নৈকট্য অর্জন করলো। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আল্লাহর নিকট পৌঁছায় না তাদের গোশত এবং রক্ত, বরং পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া। এভাবে তিনি এগুলোকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন যাতে তোমরা আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করো এজন্য যে, তিনি তোমাদের পথ-প্রদর্শন করেছেন; সুতরাং আপনি সুসংবাদ দিন সৎকর্মপরায়ণদের।’ (সূরা হজ্ব : ৩৭)
কুরবানির মাধ্যমে পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী ও অভাবীদের আনন্দ দেয়া হয়ে থাকে। আর এটা অন্য এক ধরনের আনন্দ যা কুরবানির গোশতের পরিমাণ টাকা দিয়ে, বা সদকা দিয়ে অর্জিত হয় না।
আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে মানুষ দেখানোর জন্য কুরবানি নয় বরং পশুকে জবাইয়ের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে মনের পশু ও আমিত্বকে জবাই করার তাওফিক দান করুন। কুরবানির মাধ্যমে নিজেকে তাকওয়াবান হিসেবে তৈরি করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক : তরুণ আলেম


