পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : সৌদি আরব সমর্থিত ইয়েমেনি সরকারি বাহিনী সংযুক্ত আরব আমিরাত সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদী সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিলের (এসটিসি) কাছ থেকে হাজরামাউত ও আল-মাহরা গভর্নরেটের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করেছে। ইয়েমেনে প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে উপসাগরীয় দুই আরব শক্তির মধ্যে চলমান টানাপোড়েনের মধ্যেই এই সামরিক অগ্রগতি ঘটল।
আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেনি সরকারের শীর্ষ নির্বাহী সংস্থা প্রেসিডেনশিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের (পিএলসি) প্রধান রশাদ আল-আলিমি শনিবার এক বিবৃতিতে বলেন, সৌদি সমর্থিত হোমল্যান্ড শিল্ড বাহিনী সৌদি আরব-সংলগ্ন প্রদেশগুলোতে ‘সব সামরিক ও নিরাপত্তা অবস্থান পুনর্দখল’ করে ‘রেকর্ড সাফল্য’ অর্জন করেছে। তার ভাষায়, এক দিন আগে শুরু হওয়া অভিযানের ফলেই এই সাফল্য এসেছে।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, হাজরামাউত প্রদেশের রাজধানী ও পূর্বাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মুকাল্লার নিয়ন্ত্রণও পুনরায় নেওয়া হয়েছে। গত মাসে এসটিসি শহরটি দখলে নিয়েছিল এবং সাম্প্রতিক সময়ে সেখানে সৌদি বাহিনীর হামলা চালানো হয়।
ইয়েমেনি সরকারি সূত্র আল–জাজিরা আরবিকে জানিয়েছে, ইয়েমেনের সবচেয়ে বড় গভর্নরেট হাজরামাউতের সব জেলা এখন সরকারি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। একই সঙ্গে আল-মাহরা গভর্নরেটের যুব দপ্তরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ ওমর সুয়াইলাম রোববার তুরস্কের সংবাদ সংস্থা আনাদোলুকে বলেন, এসটিসি বাহিনী প্রত্যাহার করে নেওয়ার পর হোমল্যান্ড শিল্ড বাহিনী গভর্নরেটটির ‘নয় জেলার সবগুলো’ দখলে নিয়েছে।
গত মঙ্গলবার থেকে ইয়েমেনে নজিরবিহীন উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। কারণ, ডিসেম্বরের শুরুতে এসটিসি বাহিনী হাজরামাউত ও আল-মাহরা দখল করে নেয়। এই দুটি প্রদেশ মিলিয়ে ইয়েমেনের প্রায় অর্ধেক ভূখণ্ডজুড়ে রয়েছে এবং সৌদি আরবের সঙ্গে সরাসরি সীমান্ত রয়েছে।
আল–জাজিরার ইয়েমেন বিষয়ক সম্পাদক আহমেদ আল-শালাফি বলেন, গত এক দিনে ইয়েমেনের রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে। তার ভাষায়, ‘ইয়েমেনি সেনাবাহিনী ও হোমল্যান্ড শিল্ড বাহিনী সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে নেমে সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করেছে, যা মাটিতে সংঘাতের সমাধানে ভূমিকা রেখেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এর পর রাজনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে ইয়েমেন সরকার সৌদি আরবে সংলাপের জন্য সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিলকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে।’
সংঘর্ষে হতাহতের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য। শুক্রবার থেকে সৌদি সমর্থিত বাহিনীর সঙ্গে লড়াইয়ে অন্তত ৮০ জন এসটিসি যোদ্ধা নিহত হয়েছেন বলে রোববার এক এসটিসি কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা এএফপিকে জানান। তার দাবি অনুযায়ী, ‘১৫২ জন এসটিসি সদস্য আহত হয়েছেন এবং ১৩০ জনকে বন্দী করা হয়েছে।’ শনিবার এসটিসির এক সামরিক কর্মকর্তা এএফপিকে বলেন, সৌদি যুদ্ধবিমানগুলো ‘মুকাল্লার পশ্চিমে বারশিদ এলাকায়’ এসটিসির একটি ঘাঁটিতে ‘ব্যাপক’ বিমান হামলা চালিয়েছে।
তবে এই সংঘাতের মধ্যেই সংলাপের সম্ভাবনাও সামনে এসেছে। সৌদি আরবের সংলাপ প্রস্তাবকে এসটিসি স্বাগত জানিয়েছে। তারা এটিকে ‘এক আন্তরিক সুযোগ’ হিসেবে বর্ণনা করেছে, যা তাদের মতে ‘দক্ষিণের জনগণের আকাঙ্ক্ষা রক্ষা করতে পারে’।
এদিকে, হাজরামাউতের সাইয়ুন শহরে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবন ফিরছে বলে স্থানীয় সূত্র আল–জাজিরাকে জানিয়েছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুনরায় চালু করা এবং নাগরিক সেবা নিশ্চিত করার অংশ হিসেবে সেখানে কাজকর্ম শুরু হয়েছে। আল–জাজিরা আরবি জানিয়েছে, হোমল্যান্ড শিল্ড বাহিনী নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর হাজরামাউতের গভর্নর সালেম আহমেদ সাইদ আল-খানবাশি ওয়াদি হাজরামাউতের সাইয়ুন বিমানবন্দরে পৌঁছেছেন।
তবে দক্ষিণ ইয়েমেনের অন্যান্য এলাকায় উত্তেজনা এখনো কাটেনি। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেনি সরকার দক্ষিণের বন্দরনগরী এডেনে এসটিসির আরোপিত চলাচল সীমাবদ্ধতার অভিযোগ এনে বিবৃতি দিয়েছে। এতে বলা হয়, এসটিসি কিছু যাত্রীকে এডেনে প্রবেশে বাধা দিচ্ছে এবং শহরে ঢোকার চেষ্টা করা মানুষদের আটক করছে—যাদের মধ্যে চিকিৎসার জন্য আসা অসুস্থ ব্যক্তি ও পরিবারও রয়েছে।
সরকারের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘আদেনে নাগরিকদের চলাচলে এসটিসির এই নিষেধাজ্ঞা সংবিধানের গুরুতর লঙ্ঘন এবং রিয়াদ চুক্তির সরাসরি ভঙ্গ। আমরা সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিলকে অবিলম্বে ও নিঃশর্তভাবে সব ধরনের চলাচল নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আহ্বান জানাচ্ছি।’ একই সঙ্গে সরকার জানিয়েছে, বেসামরিকদের সুরক্ষা ও চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
রয়টার্সকে দেওয়া এক বক্তব্যে ইয়েমেনি সরকারের এক কর্মকর্তা বলেন, হাজরামাউত থেকে এগিয়ে এসটিসির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এডেনের দিকে অভিযান চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে। বৃহস্পতিবার বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর এডেন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে কিছু ফ্লাইট আবার চালু হয়েছে। বিমানবন্দর বন্ধের জন্য সরকার ও সৌদি আরব একদিকে এবং এসটিসি অন্যদিকে পরস্পরের বিরুদ্ধে দায় চাপাচ্ছে।
তবে অন্যান্য এলাকায় বিধিনিষেধ অব্যাহত রয়েছে। ইয়েমেনে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস জানিয়েছে, তারা ভারত মহাসাগরে অবস্থিত ইয়েমেনি দ্বীপ সোকোত্রা থেকে ও সেখানে যাওয়ার ফ্লাইট বন্ধ বা ঘুরিয়ে দেওয়ার তথ্য পেয়েছে।


