ইসলাম মানবতার ধর্ম, রক্তের নয়
মুহাম্মদ আইয়ূব ❑ ২০০৭ সালের কথা। তখন আমি ইবতেদায়ি পড়ি আশুলিয়ার এক মাদ্রাসায় (জামিয়াতুল আবরার)। মাথা থেকে পা পর্যন্ত জিহাদি জজবায় ভরপুর এক কিশোর। বোডিংয়ের বেড়া থেকে পেশাব খানার দেয়াল কোনটাই আমার ঘুষি থেকে নিস্তার পেত না। উদ্দেশ্য? হাত শক্ত করে কাফেরদের দাঁত ফালাইয়া দেওয়া। আমার সাথি ভাইয়েরা বৈকালের অপেক্ষায় থাকত। কারণ আছরের পর রুমে ঢুকেই ঘোষণা দিতাম, এখন আমি সারা রুম ঘুরে ঘুরে আজান দিব আর তোরা আমার আজান শেষ হওয়া পর্যন্ত আমাকে ঘুষাবি। তবে যাদের সাথে আমার আগ থেকে রেষারেষি আছে তারা এখানে নো এন্ট্রি। উদ্দেশ্য? জিহাদের জন্য শরীর শক্ত বানানো।
ক্লাসের যারা বড় তাদের কাছে চট্টগ্রাম দিয়ে মিয়ানমার যাওয়ার রাস্তা বাতলাইতাম। উদ্দেশ্য? ঐখানকার কাফের মুশরিকদের চিরতরে শেষ করে দেওয়া। অবশ্য আমার এ চেতনার পিছনে নসিম হিজাযী, আলতামাশ আর আসলাম রাহীদের মত জমাতিদের ভ্রষ্ট লেখদের হাত ছিল। জামিআ ইকরায় না পড়লে বোধহয় আমি আজও এই অন্ধকারে ঘুরপাক খেতাম। আল্লাহ তাআলা সবাইকে হেফাজত করুন। তবে আমার এই ফালতু জিহাদি জজবায় উর্দু দোসরির ক্লাস থেকে কয়েকটি ঘটনা ধীরে ধীরে পানি ঢালতে শুরু করে। যেমন- এক. একবার এক ইহুদি রাসূলের (সা.) মেহমান হলো, রাতের সব খাবার একাই সাবাড় করে হুজুর (সা.)-এর পবিত্র বিছানা মোবারকে শুয়ে তা নাপাকি দিয়ে তলিয়ে ফেলল। অতঃপর সকাল হওয়ার আগেই পালিয়ে গেল।
রাসূল (সা.) এ ঘটনায় খুব মর্মাহত হলেন। অপবিত্র বিছানা নিজ হাতে ধুতে ধুতে আফসোস করতে থাকলেন যে, আমি তো আমার মেহমানের সেবা যত্ন করতে পারি নাই, না জানি বেচারার কত কষ্ট হয়েছে! অথচ সাহাবারা (রা.) খুব ক্ষেপা। কার এত বড় সাহস নবীজীর সাথে এমন আচরণ করল! পেয়ারে নবী সবাইকে শান্ত করলেন।
দুই. এক গ্রাম্য বেদুঈন মসজিদে এসে পেশাব করতে লাগল। সাহাবারা তার দিকে তেড়ে গেলেন। রাসূল (সা.) তাঁদেরকে থামালেন। বললেন আগে ওকে পেশাব শেষ করতে দাও। শেষে রাসূল (সা.) তাকে শুধু এতটুকু বললেন, এই মসজিদ ইবাদাতের জন্য, পেশাব পায়খানার জন্য নয় ব্যস।
নবীজীর জীবনী থেকে মেসেজ পেয়েছি ইসলাম মানবতার ধর্ম, রক্তের নয়।
প্রিয় পাঠক! আমি জানি আপনি থমকে গেছেন। সেদিন আমিও থমকে গিয়েছিলাম। রাসূল (সা.)-এর জীবনীর প্রতি এক ভিন্নরকম টান অনুভব করলাম।পেয়ারে নবীজীর জীবনী যেখানেই পেয়েছি সেখানেই তৃষ্ণার্ত মুসাফিরের মত ঝাপিয়ে পড়ে তা ঢকঢক করে গিলেছি। নবীজীর জীবনী থেকে মেসেজ পেয়েছি ইসলাম মানবতার ধর্ম, রক্তের নয়। শপথ করে বলছি নবীজীর জীবনীতে যে একবার ঢুকে যেতে পারবে তার জীবনে অবশ্যই বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসতে বাধ্য ইনশাআল্লাহ। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়-
এক. মক্কা বিজয়ের দিন আউস গোত্রপতি হযরত সা’দ বিন উবাদা (রা.) বললেন, ‘আল ইয়াউমু ইয়াউমুল মালহামাহ’ তথা আজ রক্তপাতের দিন। এ সংবাদ হুজুর (সা.)-এর কানে পৌঁছতেই তিনি হযরতের সা’দের কাছ থেকে ঝাণ্ডা নিয়ে তাঁর ছেলেকে দিয়ে দিলেন আর বললেন, ‘আল ইয়াউমু ইয়াউমুল মারহামাহ’। আজ তো ক্ষমার দিন, ভালবাসার দিন, রহমের দিন।
দুই. রাসূলের (সা.) কাছে সংবাদ আসল কালিমা পড়া সত্ত্বেও উসামা ইবনে যায়েদ এক লোককে হত্যা করেছে। মহানবী (সা.) হযরত উসামাকে ডেকে ঘটনার সত্যতা জিজ্ঞেস করলে তিনি বললে, সে তো মৃত্যু ভয়ে কালিমা পড়েছিল। হুজুর (সা.) তাঁর দিকে সরাসরি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন, ‘হাললা শাক্বাক্বতা ক্বলবাহু’। তুমি কি তার হৃদয় চিরে দেখেছ? (সে আল্লাহর ভয়ে কালিমা পড়েছিল নাকি মৃত্যুর ভয়ে?) আমি তোমার এই হত্যাকাণ্ড দায় নিতে পারব না!!!
তিন. মুনাফেক নেতা আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের লাগাতার গাদ্দারী আর হঠকারিতায় অতিষ্ঠ হয়ে হযরত ওমর (রা.) বললেন হুকুম দিন এই মুনাফিকের কল্লা উড়িয়ে দিই। পেয়ারে হাবিব (সা.) কি বললেন? লোকে বলাবলি করবে মুহাম্মদ এখন নিজ সাথীদের ও হত্যা করতে শুরু করেছে। এসব ঘটনা যেই পড়বে সেই থমকে যেতে বাধ্য।
তাহলে এক বছর যাবত বোডিংয়ের বেড়া, পেশাব খানার দেয়াল আর আমার শরীরে যে জজবায় বিরামহীন ঘুষি পড়েছে তা কি ভুল ছিল? জজবা ভুল না তবে সিস্টেমে ভুল ছিল। রাসূলের সীরাত মোবারক, জামিআ ইকরা ও দেওবন্দের মাটিতে পাড়া দিয়ে আমার এ উপলব্ধি হয়েছে আলহামদুলিল্লাহ।
এই তিন বিস্তৃত ময়দানে সামান্য হেঁটেই আমি আমাকে বলেছি পল্টন, মুক্তাঙ্গন আর শাপলা চত্ত্বরে ইসলাম কায়েম করতে যেয়ে ফরজ নামাজ কাযা করার কথা তো ইসলাম বলে না! আত্মঘাতি বোম মেরে মুসলিম তো দূরের কথা কাফেরকে মারতেও ইসলাম নিষেধ করে!! তাহলে যারা করে? তারা ডাক্তার নামের সন্ত্রাস। ইসলাম একতা চায়, বিভেদ নয়। মানবতা চায়, পাষণ্ডতা নয়।
আমি পাশে থাকা সালমান ভাইকে বললাম, আজ যদি এটা বাংলাদেশে হত তাহলে আরশাদ মাদানী সাহেবকে এতক্ষণে নাস্তিক মুরতাদ বানিয়ে ফেলা হত (নাউজুবিল্লাহ)।
দেওবন্দে পড়াকালীন ২৬ জানুয়ারি (ভারতের গণতন্ত্র দিবস) আরশাদ মাদানী সাহেবের নেতৃত্বে অনুষ্ঠান হলো, যেখানের প্রধান প্রধান মেহমানদের মধ্যে ছিলেন হিন্দু আর শিখরা। তাদের বক্তব্যের শুরুতে খুব প্রশংসা করা হলো। আমি পাশে থাকা সালমান ভাইকে বললাম, আজ যদি এটা বাংলাদেশে হত তাহলে আরশাদ মাদানী সাহেবকে এতক্ষণে নাস্তিক মুরতাদ বানিয়ে ফেলা হত (নাউজুবিল্লাহ)। যাকগে ওসব। করোনার এই সঙ্কটকালে গুটিকয়েক আমলা, ইউপি চেয়ারম্যান আর মেম্বার বাদে সারা বাংলাদেশের মানুষ যেভাবে একে অপরের পাশে দাঁড়াচ্ছে, এতে আমরা আশাবাদী বাঙালি মুসলিম জাতী তার মানবতার ইতিহাসে নতুন পালক যুক্ত করছে আলহামদুলিল্লাহ। তবে কওমি নামধারী কতিপয় আলেমরা সাঈদীর মুক্তি চেয়ে করোনার ভয়াল সঙ্কটে আরো সঙ্কট তৈরী করেছে বলাবাহুল্য।
ভারত সরকার করোনাকে কেন্দ্র করে তাবলিগ তথা মুসলমানদের ঘায়েল করতে যখন প্রস্তুত ঠিক তখন দেওবন্দ থেকে শুরু করে গোটা বিশ্বের মুসলিমরা (এমনকি বিধর্মীরাও) দলমত নির্বিশেষে তাবলিগের পাশে দাঁড়িয়ে ভারত সরকারের নিন্দা করলেও এ দেশের ইসলামের ঠিকাদাররা বোবা থাকায় ঠিকাদারির দায়িত্বে অবহেলার প্রশ্ন উঠছে। মানুষ মানুষের জন্য বলে একটা কথা আছে, তবে শুধু মানুষ নিয়ে ভাবলে হবে না, পশু পাখি নিয়েও মানুষকেই ভাবতে হবে। কুকুরকে খাদ্য দিয়েছে বলে কলকাতার এক অভিনেত্রীকে মানুষরূপী অমানুষরা যাচ্ছেতাই বলেছে, এটা ঘোরতর অন্যায় হয়েছে।
পাঠক, পরিশেষে একটা কথা বলি- ‘দেশ ও দশের জন্য আর মাত্র কয়েকটি দিন ঘরে থাকুন, সতর্ক থাকুন, নিজে ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন। সবাইকে বাঁচতে দিন।’
লেখক : শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক


