ইসলামের দৃষ্টিতে ছোঁয়াচে রোগ | মুস্তাকিম বিল্লাহ

ইসলামের দৃষ্টিতে ছোঁয়াচে রোগ | মুস্তাকিম বিল্লাহ

ইসলামের দৃষ্টিতে ছোঁয়াচে রোগ 

মুস্তাকিম বিল্লাহ ❑ ছোঁয়াচে রোগ বা রোগ সংক্রমণ এটা ইসলামে সমাধানকৃত একটি বিষয়। ইসলাম বাস্তবতায় বিশ্বাসী এক ধর্ম বিশ্বাসের নাম। পার্থিব জীবন সংক্রান্ত সকল বিষয়ের যুক্তি-বাস্তবতা ইসলাম স্বীকার করে৷ তাই ইসলামের কোন বিষয় বাস্তবতার সাথে সাংঘর্ষিক নয়৷ বিশ্বজগতের স্রষ্টা আল্লাহ তায়ালা৷ জগতকুলের সমস্ত বিষয় তার মর্জি মোতাবেকই হয়৷

মানুষের শারীরিক সুস্থতা যেমন আল্লাহর বিশেষ একটা নেয়ামত; তেমনিভাবে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে শয্যাগ্রহণ করাটাও তাঁর ইশারা। তাঁর নির্দেশ বা ইচ্ছার বাইরে কোন কিছুই সংঘটিত হয় না৷ শারীরিক সুস্থতার জন্য রয়েছে যেমন বিভিন্ন কারণ-উপকরণ। তেমন অসুস্থতার জন্যেও রয়েছে বাহ্যিক নানান কারণ। যেমন, অতিরিক্ত ঠাণ্ডায় কিংবা বৃষ্টিতে ভেজার কারণে সর্দি-কাশি,জ্বর ইত্যাদি রোগে আক্রান্ত হওয়া।

অতিরিক্ত ঠাণ্ডার কারণে সর্দি লাগে এটা সঠিক৷ তবে অতিরিক্ত ঠান্ডার কারণেই সর্দি লাগে এটা সঠিক নয়। এমন অনেক মানুষ আছেন, যাদের খুব কমই ঠান্ডাজণিত অসুস্থতা দেখা দেয়৷ কারণ ঠান্ডার নিজস্ব কোন কার্যকরী ক্ষমতা নেই। আল্লাহ রোগগ্রস্থ করেন, যার কারণে আমরা রোগাক্রান্ত হয়ে থাকি। তিনি হুকুম প্রদান করেন বলেই, ঠান্ডার কারণে সর্দি বা ঠান্ডাজণিত বিভিন্ন অসুস্থতা দেখা দেয়৷

বস্তুর কোন ক্ষমতা নেই ক্ষতি বা উপকার করার৷ সব আল্লাহ তা’য়ালার ইচ্ছাতেই হয়৷

তেমনিভাবে সংক্রামক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে যাওয়াও রোগাক্রান্ত হয়ে যাওয়ার একটি কারণ। তবে সংক্রামক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শই রোগাক্রান্ত হওয়ার কারণ, এই ভাবনাটা সঠিক নয়৷ যদি কেউ দৃঢ় বিশ্বাস করে, অমুককে স্পর্শ করার কারণেই আমার এই রোগটা হয়েছে, তাহলে তার আকিদাতে সমস্যা দেখা দেবে নিশ্চিত৷

কারণ বস্তুর কোন ক্ষমতা নেই ক্ষতি বা উপকার করার৷ সব আল্লাহ তা’য়ালার ইচ্ছাতেই হয়৷ আর সে এখানে বস্তুকে ক্ষমতাধর মেনে নিচ্ছে৷ যেটা ইসলামী আকিদার সম্পূর্ণ পরিপন্থি৷ আমরা দেখতে পাই, অনেক সংক্রামক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে গিয়েও আমরা রোগাক্রান্ত হই না। কারণ, এখানে বিধাতার নির্দেশ আসেনি৷ দেহের জীবাণু স্থানান্তরিত হয়ে অন্যত্রে যাওয়া এটা বাস্তবতা, যা অস্বীকার করবার নয়।

সম্প্রতিকালে উদ্ভূত করোনাভাইরাস একটি সংক্রামক ব্যাধি। যা আক্রান্ত ব্যক্তির শরির থেকে হাঁচি-কাশি,স্পর্শ বা অন্য কোন কিছুর সাহায্যে জীবাণু বের হয়ে অন্য একজন সুস্থ মানুষের শরীরে প্রবেশ করছে। ফলে সুস্থ মানুষটিও আল্লাহ তা’য়ালার হুকুমে রোগাক্রান্ত হয়ে পড়ছে। তবে জীবাণু স্বীয় ক্ষমতায় কোন ব্যক্তিকে আক্রান্ত করছে বা করতে পারে এমন ধারণা ইসলাম কখনোই স্বীকার করে না এবং এমনটা বিশ্বাস করার অনুমতি দেয় না৷ বরং এমন ধারণা বা বিশ্বাস লালন করতে কঠোরভাবে নিষেধ করে৷

ইসলামে সংক্রমণ ব্যাধি বলতে কিছু নেই, এর অর্থ হল, ইসলামে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংক্রমনশীল ব্যাধি বলতে কিছু নেই।

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে গেলে সুস্থ ব্যক্তির শরীরে উক্ত জীবাণু সংক্রমণ করতে পারে এটা বাস্তবতা৷(ইসলাম বাস্তবতা স্বীকার করে,তবে সেটা আকিদা-বিশ্বাস ঠিক রেখে৷) উক্ত জীবাণু সংক্রমণের কারণেই সে অসুস্থ হয়ে পড়বে এটা নিশ্চিত নয়। তবে এটা একটা মাধ্যম। আর এটা তখন অন্যের শরিরে প্রবেশ করবে, যখন আল্লাহ তা’য়ালার আদেশ থাকবে৷ ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে যাওয়া ছাড়াও কোন ব্যক্তি উক্ত ভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারে। তেমনি আক্রান্ত ব্যক্তিকে স্পর্শ করার পরও স্পর্শকারীর দেহে ভাইরাস নাও আসতে পারে৷

ইসলামে সংক্রমণ ব্যাধি বলতে কিছু নেই, এর অর্থ হল, ইসলামে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংক্রমনশীল ব্যাধি বলতে কিছু নেই। যেমন, আগুনের কার্যক্ষমতা পুড়িয়ে দেওয়া। কিন্তু এটা তার নিজস্ব ক্ষমতা নয়। আল্লাহ তা’আলা আগুনকে পুড়িয়ে দেওয়ার সক্ষমতা দিয়েছেন, তাই আগুন পুড়িয়ে দেয়।

যদি আগুনের নিজস্ব ক্ষমতা থাকতো তাহলে হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম কে নমরুদের আগুনে পুড়িয়ে ছারখার করে দিতে পারতো। কিন্তু আগুন সেটা পারেনি। এরদ্বারা প্রতীয়মান হয়, আগুনের পুড়িয়ে দেওয়া এটা আল্লাহর ইচ্ছার প্রতিফলন।

ছোঁয়াচে রোগ সম্পর্কে হাদিসের ভাষ্য : ছোঁয়াচে রোগ বা সংক্রমণশীল ব্যাধি সম্পর্কে হাদিসে দু’ধরনের ভাষ্য পাওয়া যায়। হযরত ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘নিশ্চয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, সংক্রামক রোগ এবং কুলক্ষণ বলতে কিছু নেই।’ (বুখারী, হাদীস নং : ৫৭৫৩)

‘রোগের কোন সংক্রমণ ক্ষমতা নেই, সফরের কোন অশুভ আলামত নেই, পেঁচার মধ্যেও কোন লক্ষণ নেই।’

অন্য এক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, ‘নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুষ্ঠ রোগীর প্লেটে বসে খানা খেতে বলেছেন এবং আল্লাহর উপর ভরসা করতে বলেছেন।’ (তিরমিযী, হাদীস নং : ১৭১৮)

আরো ইরশাদ হয়েছে, হযরত আবূ হুরাইরাহ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘রোগের কোন সংক্রমণ ক্ষমতা নেই, সফরের কোন অশুভ আলামত নেই, পেঁচার মধ্যেও কোন লক্ষণ নেই।’ তখন এক বেদুঈন বলল, ‘হে আল্লাহর রাসূল! তাহলে আমার উটের এ অবস্থা কেন হয়? সেগুলো যখন চারণভূমিতে থাকে তখন সেগুলো যেন মুক্ত হরিণের পাল। এমন অবস্থায় চর্মরোগাগ্রস্থ উট এসে সেগুলোর পালে ঢুকে পড়ে এবং এগুলোকেও চর্ম রোগে আক্রান্ত করে ফেলে।’ নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘তাহলে প্রথমটিকে চর্ম রোগাক্রান্ত কে করেছে?’ (বুখারী, হাদীস নং : ৫৭১৭)

উল্লেখিত হাদীসগুলির আলোকে প্রমানিত হয়, সংক্রামক ব্যাধি বলতে কিছু নেই। আল্লাহ তা’আলা যাকে রোগাক্রান্ত করেন সেই আক্রান্ত হয়। তবে সংক্রামক ব্যধিকে ইসলাম শর্তসাপেক্ষে সমর্থন করে। সেক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের বক্তব্য গ্রহণযোগ্য৷ অর্থাৎ এই বিষয়ে বিজ্ঞ কোন ডাক্তার যদি বিস্তর গবেষণা, কঠোর বিশ্লেষনের পর এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, এই রোগটা সংক্রামক, তাহলেই তার কথা গ্রহণীয় হবে৷ যে কেউ বললেই সেটা ইসলাম সমর্থন করবে না৷

উপরেল্লেখিত বর্ণনার বিপরীত কিছু বর্ণনা দ্বারা জানা যায় যে, রোগ সংক্রামক হতে পারে। হযরত আবূ হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘কুষ্ঠ রোগী থেকে দূরে থাক, যেভাবে তুমি সিংহ থেকে দূরে থাক।’ ( বুখারী, হাদীস নং : ৫৭০৭)

তদ্রুপ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেছেন, ‘যখন কোন অঞ্চলে তোমরা মহামারী বিস্তারের সংবাদ শোনো, তখন সে এলাকায় প্রবেশ করো না। আর তোমরা যেখানে অবস্থান করো, সেখানে মহামারীর বিস্তার ঘটে সেখান থেকে তোমরা বেরিয়ে যেও না।’ ( বুখারী, হাদীস নং : ৫৭২৮)

বিপরীতমুখী দু’ধরণের বর্ণনার সমাধান কি? : বিপরীতমুখী দু’ধরণের বর্ণনার সমাধান এভাবে হতে পারে যে, যেসব বর্ণনায় সংক্রমণের ভয়ে পালাতে বা দূরে থাকার হুকুম দেয়া হয়েছে, এটা সতর্কতার উপর নির্ভরশীল কিংবা দূর্বল ঈমানদারদের জন্য ইমান হেফাজতের মাধ্যম।

রোগের নিজস্ব কোন কার্যকারী ক্ষমতা নেই। সংক্রামক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শ দ্বারাই উক্ত রোগে আক্রান্ত হওয়া জরুরী নয়।

দূর্বল ঈমানদারদের কুষ্ঠ ইত্যাদি রোগী থেকে দূরে থাকতে বলা হয়েছে এজন্য যে, সংক্রমণ ব্যতিরেকে সাধারণভাবেই সে আক্রান্ত হয়, তাহলে তার আকিদা বিগড়ে যাওয়ার আশংকা রয়েছে। সে ভাববে, ‘আমি তার কাছে না গেলে এমনটি হতো না।’ তখন সংক্রমণের নিজস্ব কার্যকারী ক্ষমতা আছে বলে ধারণা করবে। এভাবে তার আকিদা নষ্ট হয়ে যাওয়ার এক্ষেত্রে সমূহ আশংকা রয়েছে।

আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সংক্রামক রোগীর সাথে খানা খাওয়ার নির্দেশে বুঝিয়েছেন যে, এতে কোন সমস্যা নেই। রোগের নিজস্ব কোন কার্যকারী ক্ষমতা নেই। সংক্রামক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শ দ্বারাই উক্ত রোগে আক্রান্ত হওয়া জরুরী নয়। এবং সেটা নিশ্চিতও নয়৷

আর যেসব হাদীসে রোগ সংক্রমণ হতে পারে বুঝা যায়, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল, কোন কোন রোগের মাঝে আল্লাহ তা’আলা সংক্রমণের ক্ষমতা দান করেন, অতঃপর তা সংক্রমিত হতে পারে। এটা রোগের নিজস্ব ক্ষমতাতে নয়, বরং আল্লাহর দেয়া ক্ষমতাবলে এমনটি হয়।

মহামারিতে আতংকিত না হয়ে আল্লাহর প্রতি মুখাপেক্ষী হয়ে নিজ গোনাহের কারণে লজ্জিত, মর্মাহত হয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা ইসলামের শিক্ষা।

সুতরাং বুঝা গেল যে, যেসব হাদীসে ইসলামে সংক্রমণশীল বলতে কিছু নেই বলা হয়েছে তার মর্মার্থ ইসলামে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কোন রোগ সংক্রমিত হয় না। যা জাহেলী যুগে মানুষের আকিদা-বিশ্বাস ছিল। হাদিসে মূলত তাদের উক্ত বিশ্বাসকে খণ্ডন করা হয়েছে। আর যে হাদীস থেকে সংক্রামক আছে বোঝা যায়, সে হাদীসও ব্যাখ্যা সাপেক্ষ৷ বাস্তবিক পক্ষে যেহেতু রোগ আল্লাহ তা’য়ালার ইচ্ছাতে সংক্রমিত হয়, তাই ইসলাম সেটাকেও একেবারে অস্বীকার করে না‌। তবে জীবাণু সংক্রমণ হলেই ব্যক্তি রোগাক্রান্ত হয়ে যাবে এটা চূড়ান্ত বিষয় নয়৷ যদি আল্লাহ তাকে ঐ রোগ দেন তাহলে সে আক্রান্ত হবে। তবে রোগ হবার মাধ্যম বানাবেন অন্য রোগীকে৷

সুতরাং হাদীসের মধ্যে কোন বৈপরীত্ব রইলো না। তাই ‘ইসলামে ছোঁয়াচে রোগ নেই’ অথবা ‘ইসলামে ছোঁয়াচে রোগ আছে’ এক কথায় বলা যাবে না বরং বিষয়টি ব্যাখ্যা সাপেক্ষ। যা উল্লিখিত আলোচনা দ্বারা স্পষ্ট হয়েছে৷

তাই কোন ভাইরাস, মহামারিতে আতংকিত না হয়ে আল্লাহর প্রতি মুখাপেক্ষী হয়ে নিজ গোনাহের কারণে লজ্জিত, মর্মাহত হয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা ইসলামের শিক্ষা। সতর্কতা এজন্য, যেন কঠোর সতর্কতার পরও রোগটা এলে সে বুঝতে পারে, এটা আল্লাহ তা’য়ালার ইচ্ছাতেই হয়েছে৷ রোগের সংক্রামক হবার নিজস্ব কোন ক্ষমতা নেই৷ আর সতর্ক না থাকলে, ব্যক্তির ধারণা হতে পারে, অন্যের থেকে রোগটা এসেছে৷ যে ধারণা আাকিদা নষ্ট হবার কারণ হতে পারে৷

আল্লাহ তা’আলা আমাদের সকল প্রকার রোগ-ব্যাধি, মহামারি থেকে হেফাজত করেন৷ এবং আক্রান্ত সবাইকে পূর্ণ সুস্থতা দান করেন৷ আমীন। ‘আল্লাহুম্মা ইন্না আউযুবিকা মিনাল বারাসি ওয়াল জুনুনি ওয়াল জুযামি ওয়া মিন সাইয়্যিইল আসকাম।’

লেখক: প্রাবন্ধিক, গবেষক ও শিক্ষক- আল জামিয়াতুল আরাবিয়া দারুল উলুম মাহমুদিয়া, ফকিরহাট, বাগেরহাট।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *