যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তে পুড়ে গেল স্কুল, কান্নায় ভাসল জাতি

যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তে পুড়ে গেল স্কুল, কান্নায় ভাসল জাতি

পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : দক্ষিণ এশিয়ার একটি ছোট দেশ বাংলাদেশ। আর এই দেশের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ শহর রাজধানী ঢাকা। এখানে রাজনৈতিক দল আর মতের অভাব নেই—সবাই ব্যস্ত নিজের মত নিয়ে। কিন্তু একটি অদৃশ্য বন্ধনে এই জাতি এক হয়ে যায় যখন হৃদয়বিদারক কিছু ঘটে। ঠিক তেমনি এক মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে গেছে গোটা জাতি—উত্তরায় ঘটে যাওয়া ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনায়।

মুহূর্তেই ঘটল বিপর্যয়

গতকাল সোমবার বেলা ১টা। ছুটি শেষে স্কুল থেকে বের হওয়া শিশু-কিশোররা কেউ বাসায় ফিরছিল, কেউ কোচিংয়ে যাচ্ছিল। ঠিক ১টা ১০ মিনিটে বিমানবাহিনীর একটি FT-7BGI প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান বিকট শব্দে মাইলস্টোন স্কুলের দোতলা ভবনে আছড়ে পড়ে।

আগুনে পুড়ে মৃত্যু: মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে শোক

বিমানের আঘাতে সঙ্গে সঙ্গেই বিকট বিস্ফোরণ, আগুন ও ধোঁয়ায় ভরে যায় পুরো এলাকা। অনেক শিশু ঘটনাস্থলেই আগুনে পুড়ে মারা যায়। শতাধিক আহত, অধিকাংশই শিশু। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে হৃদয়বিদারক ভিডিও ও ছবি। দেশজুড়ে নেমে আসে শোকের ছায়া।

 হতাহতের সংখ্যা ও অবস্থা

  • মৃত: ২৩ জন (রাত ১১:৩০টা পর্যন্ত), এর মধ্যে ১২ জন সিএমএইচে, ৫ জন বার্ন ইনস্টিটিউটে।
  • আহত: ১৭১ জন।
  • গুরুতর দগ্ধ: অন্তত ৫১ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
  • চিকিৎসাধীন: জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউট, সিএমএইচ, উত্তরা আধুনিক মেডিকেল, লুবনা হাসপাতাল, কুর্মিটোলা, ইবনে সিনাসহ বিভিন্ন হাসপাতালে।

বার্ন ইনস্টিটিউটে হৃদয়বিদারক দৃশ্য

চিকিৎসকদের মতে, আহতদের অধিকাংশের বয়স ৯–১৯ বছরের মধ্যে। অনেকেই আইসিইউতে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। উদাহরণস্বরূপ:

  • ইউশা (১১): কপাল, মুখ, মাথা ও পিঠ পুড়ে গেছে।
  • জুনায়েদ (তৃতীয় শ্রেণী): গুরুতর দগ্ধ।
  • নিলয় (১৮ ভাগ দগ্ধ), মাসুম (৬০ ভাগ), আবির (৯০ ভাগ), আনিজন (১০০ ভাগ) – অনেকেই আশঙ্কাজনক।

আহতদের খোঁজে স্বজনদের আহাজারি

রক্তে ভেজা গায়ে স্ট্রেচারে শুয়ে থাকা শিশুদের দেখে বার্ন ইউনিটের সামনে স্বজনদের কান্না, জ্ঞান হারানো ও রক্ত চেয়ে আকুতি—সব মিলে হৃদয়বিদারক চিত্র। অ্যাম্বুলেন্স এলেই ছুটে যাচ্ছে স্বজনরা, যদি তাদের সন্তান থাকে সেই গাড়িতে।

রক্ত সংকট ও সামাজিক উদ্যোগ

বিশেষ করে O ও AB নেগেটিভ গ্রুপের রক্তের জন্য দেখা দেয় তীব্র হাহাকার। সেনাবাহিনীর মাইকিং, স্বেচ্ছাসেবীদের প্রচেষ্টা ও সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করা পোস্টের মাধ্যমে অসংখ্য মানুষ রক্ত দিতে হাজির হন। পরবর্তীতে রক্তের চাহিদা পূরণ হওয়ায় নিবন্ধনের মাধ্যমে রেজিস্ট্রি করে তাদের পাঠিয়ে দেয়া হয়।

ফেসবুকজুড়ে ‘প্রে ফর মাইলস্টোন’

ফেসবুক ও অন্যান্য সামাজিক মাধ্যমে শোকবার্তা, প্রোফাইল পিকচার পরিবর্তন ও ‘প্রে ফর মাইলস্টোন’ হ্যাশট্যাগে পোস্টের ঢল নামে। নিহতদের মাগফিরাত এবং আহতদের সুস্থতার জন্য অনেকে প্রার্থনার আহ্বান জানান।

দুর্ঘটনার কারণ: যান্ত্রিক ত্রুটি

আইএসপিআর জানায়, FT-7BGI প্রশিক্ষণ বিমানটি যান্ত্রিক ত্রুটির সম্মুখীন হয়ে বিধ্বস্ত হয়। পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মো. তৌকির ইসলাম প্রাণপণ চেষ্টা করেন জনবিরল এলাকায় নামাতে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত স্কুল ভবনে বিধ্বস্ত হন এবং নিজেও মৃত্যুবরণ করেন।

উদ্ধার ও সহযোগিতা

সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী, পুলিশ, র‌্যাব ও ফায়ার সার্ভিস যৌথভাবে উদ্ধার কাজ চালায়। ফায়ার সার্ভিসের ৯টি ইউনিট ও ৬টি অ্যাম্বুলেন্স উদ্ধারকাজে অংশ নেয়। দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে বিমানবাহিনী একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।

আজ রাষ্ট্রীয় শোক পালিত

সরকার আজ মঙ্গলবার একদিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছে। সব সরকারি ও বেসরকারি ভবনে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়েছে। দেশের সব মসজিদ-মন্দির-গির্জাসহ উপাসনালয়ে বিশেষ দোয়ার আয়োজন চলছে।

বিভিন্ন মহলের শোকবার্তা

  • প্রধান উপদেষ্টা: দুর্ঘটনাকে “জাতির জন্য গভীর বেদনার ক্ষণ” বলে অভিহিত করেন। আহতদের চিকিৎসা ও তদন্তের নির্দেশ দেন।
  • ধর্ম উপদেষ্টা, হেফাজতে ইসলাম, খেলাফত মজলিস, খেলাফত আন্দোলন, ইসলামী ঐক্যজোট, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম সহ বিভিন্ন ইসলামি দল ও নেতৃবৃন্দ শোক প্রকাশ ও দোয়া করেন।
  • মুসলিম লীগ, আন্তর্জাতিক মজলিসে খতমে নবুওয়ত, বাউবি ভিসি সহ অনেকেই গভীর দুঃখ প্রকাশ করেন।

রক্তদানে যোগাযোগ নম্বর

বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর রেকর্ড অফিস খোলা হয়েছে রক্তদাতা ও সাহায্য সমন্বয়ের জন্য:
📞 01769993558 (হোয়াটসঅ্যাপ চালু)

উত্তরার এই মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি আমাদের সকলকে বাকরুদ্ধ করেছে। নিহতদের জন্য দোয়া ও আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা ছাড়া আর কিছুই করার নেই এই মুহূর্তে। আল্লাহ যেন এ ধরনের দুর্ঘটনা আর কখনও না ঘটান।

Related Articles