মোহাম্মদ রুহিন সরদার : পুলিশের চাকরি করলেও অনেকের কাছে এখনো পুলিশ হতে পারিনি! কি জন্য পারিনি তা নিজেও জানিনা। ছোটবেলা থেকেই সুযোগ পেলে বয়স্ক লোক দেখলেই বঙ্গবন্ধু এবং মুক্তিযুদ্ধের সময় দিনকাল কেমন কেটেছিল এ নিয়ে গল্প করতাম। তবে সামান্য কিছু কথা ছাড়া তেমন বেশি কিছু শুনতে পায়নি! কিন্তু চাকরি একযুগ হয়ে গেলেই ধরা দিলো তিন অসহায় দরিদ্র মূর্খ বীরযোদ্ধা!
চাকরির শুরুতে খাগড়াছড়ি ছিলাম, সেখান থেকে তেমন কিছু জানতে পারিনি, কিন্তু ফরিদপুর প্রায় ১০ বছর যাবত চাকরি করেছি। ডিউটির ফাঁকে অনেকের সাথে গল্প করে তেমন কিছু জানার সুযোগ হয়নি। গতবছর অর্থাৎ ২০১৮ সালের শেষের দিকে পরিচয় হয় খাজা তালুকদার নামক মানুষটির সাথে! আবার উনার মাধ্যমে বাদ-বাকি দুজন সম্পর্কেও জানার সুযোগ হয়। তিনজন হতদরিদ্র অসহায় মূর্খ। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ৪৮ বছর ধরে জমানো কিছু কথা জানায়ে দায়বদ্ধতা এড়াতে চাই, কিন্তু কে শুনবে আমার এই গল্প!
আমি ফরিদপুর জেলায় বোয়ালমারী থানার অধীনে জয়নগর পুলিশ ফাঁড়িতে এ.এস.আই হিসেবে কর্মরত থাকাকালীন সময়ে এই বীরদের সাথে পরিচিত হতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করছি। নিম্নে পর্যায়ক্রমে নাম ঠিকানা সহ সংক্ষিপ্ত ঘটনা তুলে ধরা হলো-
১.মোহাম্মদ বাকন খান (৭০)
পিতা : মৃত্যু আব্দুর রহমান খান
গ্রাম : প্রেমতারা
থানা : বোয়ালমারী
জেলা : ফরিদপুর
২. মোহাম্মদ খলিল তালুকদার (৬৫)
পিতা : মৃত্যু আব্দুল মজিদ তালুকদার
গ্রাম : কেরশাইল
থানা : বোয়ালমারী
জেলা : ফরিদপুর
৩. মোহাম্মদ চানু ফকির (৬৫)
পিতা : মৃত্যু মজিদ ফকির
গ্রাম : কয়ড়া
থানা : বোয়ালমারী
জেলা : ফরিদপুর
এই তিন চাচা মুক্তিযুদ্ধের সময় গ্রামের মানুষ জনের অবস্থা কেমন ছিলো, সে বিষয় নিয়ে একেকটি হৃদয়ভাঙ্গা গল্প শুনিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় (৩) নং চানু ফকিরের বড়ভাই জলিল ফকিরকে চোখের সামনে স্থানীয় রাজাকাররা হত্যা করলে তিনি পালিয়ে কমান্ডার শেখ ফরিদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে চলে যান যশোর জেলার কোতোয়ালী থানার আনসার ক্যাম্পে। সেখানে কয়দিনের ট্রেনিং শেষ করেই ঝাপিয়ে পড়েন মুক্তিযুদ্ধে! মোট ০৭ জনের মৌখিক কমান্ডার ছিলেন তিনি। পরবর্তীতে অভয়নগর এবং মাগুরা থাকাকালীন সময়ে দেশ স্বাধীন হলে, পুনঃরায় যশোর কোতোয়ালী থানার ক্যাম্পে ফিরে অস্ত্র নং ১৩০ এবং গুলি জমা দেন। সেখান থেকে একটা সার্টিফিকেট দেয় এবং সেটা নিয়ে চলে আসেন আবার নিজ গ্রাম কয়ড়ায়। বিষ্ময়ের সাথে প্রশ্ন করলাম তারপর? কান্নাজড়িত কন্ঠে উত্তর দিলেন বাবা সার্টিফিকেট হারিয়ে ফেলেছি, এখন কিচ্ছু নাই! সান্ত্বনা দিয়ে বললাম, চাচা আজ বড় অপরাধী হয়ে গেলাম, আমাদের ক্ষমা করবেন!
দীর্ঘ ৪৮ বছর ধরে চাপা কষ্ট বুকে রেখে, বাকরুদ্ধ হয়ে গেছে চানু ফকির। এপর্যন্ত কাউকে বলেননি কেন? এমন প্রশ্নের জবাবে বলেন- কোনদিন কেহ জিজ্ঞেস করে নাই, তাই বলিনি। বুকে জড়িয়ে ধরে বললাম, আপনার সার্টিফিকেট অবশ্যই আছে, অবশ্যই ফেরত পাবেন আপনার কৃত কর্মের ফল! সার্টিফিকেট ছিলো কি না, সেটা প্রমাণ করা খুবই সহজ ব্যাপার! চানু ফকির যুদ্ধকালীন সময়ে অস্ত্র নং ১২৯ পরবর্তীতে সেফটিকেচ ভেঙ্গে গেলে ১৩০ নাম্বার অস্ত্র দিয়ে যুদ্ধ করেন। তাহলে সেটা ঐ সময়ের অস্ত্রের রেজিস্টারে অবশ্যই চানু ফকিরের নাম লিপিবদ্ধ থাকার কথা, না’হলে একজন লোককে কখনো হাওয়ার উপরে একটা অস্ত্র দিয়ে দেয়নি। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলায় কতজন ভুয়াযুদ্ধের নাম দেখিয়ে বীর সেজেছেন! অথচ অস্ত্র কাঁধে নিয়ে, তিনদিন যাবত শুধু পানি খেয়ে, মাঠেঘাটে যুদ্ধ করে উপহার দিলেন এমন সোনার বাংলা! এছাড়াও বড়ো একফানা কলার লোভ দেখিয়ে রাজাকারদের ১১ টি হাতিয়ার লুট করার মতো গৌরব রয়েছে এই চানু ফকিরের!
সবচেয়ে বড় কথা হলো- শুনেছি তিনটা প্রশ্নের উত্তর দিয়ে নাকি মুক্তিযোদ্ধা হতে হয়। এটা সঠিক কিনা জানিনা, তবে এই তিনজনকে আপনি যদি মুক্তিযোদ্ধা সম্পর্কে ১০০ টা প্রশ্নও করেন আশাকরি বাস্তব সত্য সব তুলে ধরবে।
১. মোহাম্মদ বাকন খান। কমান্ডার কার্তিক বাবুর সাথে খুলনার আনসার ক্যাম্পে ছিলেন। সাতক্ষীরার বর্ডার পার হয়ে ভারতের চাকোলিয়ায় ১৫ দিনের ট্রেনিং শেষ করে মুক্তিযুদ্ধ করেন খালিশপুর, বয়রা এবং চুকনগর সহ বিভিন্ন এলাকায়। এদের ইতিহাস শুনলেও একেকটা বই লেখা যায়, তাই বিশেষভাবে অনুরোধ রইলো, তাদের মুখে একটু হাসি দেখতে পারলেই নিজের শান্তি!
২. মোহাম্মদ খলিল তালুকদার (খাজা)। কমান্ডার সামচুর সাথে ময়মনসিংহের বীরত্বগাঁথা ইতিহাস এবং হাজার হাজার বিহারীদের নিধন সহ টাঙ্গাইলের মধুপুর গড়ের ব্রিজ নিয়ে কথা শুনলেও গায়ের লোম খাঁড়ায়ে যায়। এখানে তিনজনের মধ্যে খলিল তালুকদারের ইতিহাস সবচেয়ে ভয়ংকর ঝুঁকির মধ্যে বীরত্বগাথা।
এদের নিয়ে আমি একটা বই লিখতেছি, বদলিজনীত কারণে পিছিয়ে পড়লাম, তবুও চেষ্টা থেমে নেই। চেষ্টা চলছে-কলম চলবে ইনশাআল্লাহ!
নোট : এরা তিনজনই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে সব কষ্ট ভুলে থাকতে চায়! সার্টিফিকেট না পেলেও দুঃখ নাই।


