পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : উপমহাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় ইসলামী সঙ্গীতশিল্পী জুনাইদ জামশেদ রহ.। বৈচিত্রময় জীবনের অধিকারী জুনাইদ জামশেদ জীবনের শুরুভাগে ছিলেন পাকিস্তানের পপ সম্রাট। তাবলীগের ছোঁয়ায় জীবনের দিক পরিবর্তন করে হয়ে ছিলেন নাত সম্রাট। হামদ, নাতে কোটি মুসলিমের হৃদয়ে সত্যের আলোকে ছড়িয়ে দিতে গেয়েছিলেন আমৃত্যু।
ইনশাআল্লাহ ইনশাআল্লাহ নয়া পাকিস্তান ইনশাআল্লাহ। ইনসাফ কি আওয়াজ উঠে/ জুলমুকি দিওয়ার গিরে। হক বাতিল পে হো ছায়া/ হাত উঠাকর মান্গ দুআ। ২০১৩ সালে পাকিস্তানের ইমরান খানকে বিজয়ী করার জন্য কণ্ঠমাধুরিমায় যিনি জেগে উঠেছিলেন তিনি হলেন একসময়ের পপতারকা তবলীগের টানে আলোর পথ ফিরে পাওয়া জুনাইদ জামশেদ। কোটি কোটি মানুষ তখন গেয়ে উঠেছিলেন ’হাত উঠাকর মান্গ দুআ।’।
দিল দিল পাকিস্তান/তুম মিল গায়েসহ অসংখ্য কালজয়ী সঙ্গীতের মাধ্যমে সারাবিশ্বের দরবারে খ্যাতির সুউচ্চ শিখরে আরোহন করা জুনাইদ জামশেদ চিত্রলের নিকটবর্তী বিমান দূর্ঘটনায় ২০১৬ সালের বুধবার ০৮ ডিসেম্বর শাহাদাত বরণ করে।
তাবলীগের এই দায়ী দ্বীনের স্পর্ষ পাওয়ার সাথে সাথেই জিন্স এবং পপ তারকার জ্যাকেট খুলে লম্বা জুব্বা ও পাগড়ি পরা শুরু করে দেন। তার মাঝে দীনে ইসলামের বুঝ আসার পর তার সবকিছু অভাবনীয় পরিবর্তন তার চেহারায় এক নুরানি আভা এনে দেয়। তাঁর এ জৌতির্ময় চেহারা অনেক শোবিজ তারকাকে মহান আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। তিনি দীনের পথে আসার পর থেকে মহান আল্লাহর শানে হামদ ও নাত গাইতে শুরু করেন। তার এই বৈপ্লবিক পরিবর্তন দেখে সবাই প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে ওঠে।
মাওলানা তারিক জামিলের নিরলস দাওয়াতে বেশ কয়েকজন শিল্পীর হেদায়েত পথে আসার পথ ধরে তিনিও এ মহান দায়ীর আবেদন ফেলতে পারলেন না। সে সময়ই তিনি আর পপ সঙ্গীত গাইবেন না বলে তাওবা করেন। আর সে সময় থেকে মহান আল্লাহর শানে হামদ এবং রাসুলের শানে নাত গাইতে শুরু করেন। তারপর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত তিনি দীনের দায়ী হিসেবে কাজ করে গেছেন।
তিনি বলেন, আমাকে কলেজ-ইউনিভার্সটি পপ সম্রাট হওয়ার রাস্তা দেখিয়েছে। আর তাই এমন গোনাহের কাফফারা আমাকে আদায় করতেই হবে। সেজন্য তিনি কলেজ-ভার্সটির ছাত্রদের গোমরাহির পথকে দীনের পথে আনার জন্য তাদের মাঝে তাবলিগ করা শুরু করেন।
জুনাইদ জামশেদের মেধা ও চিন্তাশক্তি ছিল খুবই প্রখর। তিনি শোবিজ থেকে দূরে সরে যাননি এজন্য যে, টিভিতে খারাপ বিষয় প্রচার করা হয়, সেখানে দাওয়াত-তাবলিগ এবং হামদ ও নাত প্রচার করার মাধ্যমে তাতে পরিবর্তন আনা সম্ভব।
মহান আল্লাহর নামকে হৃদয়ে ধারণ করে প্রতিটি সকাল-সন্ধ্যা শুরু করা জুনাইদ জামশেদ প্যান্ট ছাড়ার পর কখনো তিনি এ পোশাক পরেননি। পাজামা জুব্বাকে তিনি নিজের পোশাক বানিয়ে নিয়েছিলেন। তিনি বলেছেন, মুসলমান যেহেতু, তবে মুসলমান হয়েই দেখানো উচিত। এজন্য তিনি নিজেদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরাকে নিজের মিশন বানিয়ে নিয়েছেলিন।
রাজনীতেতে তেহরিক-ই-ইনসাফ পার্টিকে সমর্থন করেছিলেন জুনাইদ জামশেদ। পিটিআই নেতা ইমরানের কাছে জুনায়েদ জামশেদ একটি ধর্মান্ধতামুক্ত স্বপ্নের পাকিস্তানের কথা বলতেন। তিনি স্বপ্ন দেখতেন নয়া পাকিস্তানের। যেখানে রক্তপাত নেই। ধর্মের নামে জঙ্গিবাদ নেই। মানুষ নির্বিঘ্নে বেরিয়ে যেতে পারে শহরের পর শহর। জনগণের নিরাপত্তা যে পাকিস্তানে নিশ্চিত হবে শতভাগ। সাধরাণ মানুষ পাবে তার পরিপূর্ণ মর্যাদা।
পাকিস্তানের কিছু কিছু আলেম ইমরান খানের বিরুদ্ধাচারণ করলেও তিনি আলেমদের প্রতি সহজ ও সরল। ভালোবাসা রাখেন। বিশেষত বিশ্ব তাবলীগ জামাতের সাথীদের সঙ্গে তার সখ্যতার কথাও জানা যায়। ইমরান খানের এই দর্শনের কথা জুনাইদ জামশেদই বলতেন বলে জানিয়েছেন ইকরা মাল্টিমিডিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাওলানা সদরুদ্দীন মাকনুন। তিনি বলেন, ২০১৩ সালের সে নির্বাচনে প্রচারে যথেষ্ট ভূমিকা রেখেছিলেন জুনাইদ জামশেদ।
প্রসঙ্গত, ২০১৩ সালের একটি সাক্ষাতকারে নাত শিল্পী জুনাইদ জামশেদ বলেন, এই টকশোতে এখানে আমি ইমরান ভাইয়ের সাফা্ই গেয়ে কোনো কথা যদি বলি মানুষ বলবে আমি তার উকিল। আমি তার খেলাফ করলে বলবেন বিরোধিতা করছি। যারা নাচগান করছে তারাই তো রাষ্ট্র পরিচালনা করছে অথবা তাদেরই উপরই হুকুমত পরিচালনা করতে হবে। এখনো তো এই নেজাম পরিবর্তনের সূচনাই হয়নি। এই প্রথম বার ইমরান ভাইয়ের মধ্যে একটা রোল দেখেছি নয়া পাকিস্তান বানানোর জন্য।
১৯৬৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের করাচিতে তার জন্ম৷ বাবা জামশেদ আকবর খান ও মা নাফিসা আকবরের ৩ ছেলে ১ মেয়ের মাঝে তিনি ছিলেন প্রথম৷ তিনি ১ ছেলে ১ মেয়ের জনক ছিলেন৷ মেয়ের নাম আয়েশা জুনায়েদ৷
বিমানবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জামশেদের ছেলে জুনায়েদ লাহোরের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে গ্রাজুয়েশন করেন৷ এরপর শখের বশেই রাহেল হায়াত ও শাহজাদ হাসানের সঙ্গে ১৯৮৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তানের ৪০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে দেশাত্মবোধক গান ‘দিল দিল পাকিস্তান’ গাওয়ার মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন দেশটির প্রথম পপ ব্যান্ড ‘ভাইটাল সাইন’৷ তাদের প্রথম হিট এ্যালবাম ‘দিল দিল পাকিস্তান’ এনে দেয় আকাশচুম্বী খ্যাতি। এই গানটিই ঘুরিয়ে দেয় তার জীবনের মোড়। পরিণত করে একজন শৌখিন সঙ্গীতশিল্পী থেকে পেশাদার শিল্পীতে।
বিমানবাহিনীতে যোগ দিতে ব্যর্থ হয়ে জুনায়েদ একজন পেশাদার প্রকৌশলী হতে চেয়েছিলেন৷ সঙ্গীতটা আরম্ভ করেছিলেন অনেকটা শখের বশেই। কিন্তু এই প্রাথমিক সফলতার ফলে রাহেল ও সাজ্জাদ তাকে প্রেরণা যোগান। বেশ কয়েকটি জনপ্রিয় এ্যালবাম বেরোবার পর ১৯৯৫ সালে যখন ব্যান্ড ভেঙে যায়, জুনায়েদ জামশেদ তখন একক ক্যারিয়ার গড়তে আরম্ভ করেন। এতেও তিনি অসম্ভব জনপ্রিয়তা অর্জন করেন৷ পাকিস্তানের প্রথম পপস্টার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন নিজেকে।
জুনায়েদ জামশেদ তাবলিগের বয়ান করছেন
পাকিস্তান সেনাবাহিনী তাদের সঙ্গীত ‘কসম উস ওয়াক্ত কি’, পাকিস্তান বিমানবাহিনীর সঙ্গীত ‘পালাটনা ঝাপাটনা’তে শিল্পী হিসেবে নির্বাচিত করে তাকেই। জনপ্রিয়তায় যখন তুঙ্গে এবং একের পর এক হিট এ্যালবাম বেরোচ্ছে, তখনই হঠাৎ সঙ্গীত ছেড়ে দেবার ঘোষণা দেন তিনি। ২০০২ সালে সংবাদ সম্মেলন করে জানান এই খবর৷ তখন সঙ্গীতাঙ্গনে নেমে আসে শিল্পীবিয়োগে তুমুল ঝড়৷ অসংখ্য ভক্ত তাদের প্রিয়শিল্পীকে হারানোর খবরে হয়ে পড়ে বেদনাহত। শেষমেষ ২০০৩ সালের ১৪ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে সঙ্গীতজগতকে বিদায় জানান তিনি৷ আসলে বিদায় জানানো বলা ঠিক হবে না, মেধাবী এই শিল্পী তার ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ শিখরে অবস্থান করে খ্যাতি ও ভবিষ্যতের বদলে ইমানকে বেছে নেন।
এই নাটকীয় পরিবর্তনের পর এই বদলের সিদ্ধান্তগ্রহণে তার কোনো আফসোস হয়নি৷ তিনি বলতেন, ‘আমার আগের জীবনযাপনের কোনো দৃষ্টিভঙ্গি এখন আর অবশিষ্ট নেই। আমার নতুন জীবন খুব সরল, পবিত্র এবং সুন্দর। আমি অনুভব করি, আপনি আপনার জীবনে আল্লাহর হুকুম ও রাসুলের তরিকার ওপর আমল করেন৷ তাহলে দুনিয়াতেই আপনার জীবন জান্নাতে পরিণত হবে।’
নিজের পরিবর্তন সম্পর্কে জুনায়েদ বলেন, ‘১৯৯৭ সালের অক্টোবরে আমার এক বন্ধুর সাথে তাবলিগ জামাতে তিন দিন অতিবাহিত করি। এটা আমার জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় ঘটনা। এরপর উপলব্ধি করি, সারাজীবন আমি একটা বিরাট ভুলের মধ্যে কাটাচ্ছি এবং আমাকে অবশ্যই পরিবর্তন হওয়া প্রয়োজন। নাচ-গান ছাড়াও জীবনের বড় কোন উদ্দেশ্য আছে।’
দাতব্য সংস্থার দূত হিসেবে জুনায়েদ জামশেদ : কিন্তু সঙ্গীত যার পেশা, সঙ্গীত যার নেশা, রক্তের কণায় কণায় যার সঙ্গীত তার জন্য সঙ্গীত ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া ছিল অত্যন্ত কঠিন। তিনি সেই দিনকে স্মরণ করে বলেন, ‘আমি খুব বিষন্ন ছিলাম কারণ সঙ্গীত ছিল আমার রক্তকনিকায়, আমার চামড়ার নিচে, যাতে আমি ছিলাম অভ্যস্থ। কিন্তু আমি শুধু আল্লাহকে খুশি করতে চেয়েছি। আমি সেই ব্যক্তি হতে চাইনি যাকে আল্লাহর কিতাবে খারাপ বলা হয়েছে।’
যে ‘দিল দিল পাকিস্তান’, ‘এইতেবার’, ‘উস রাহ পার’, ‘দিল কি বাত’-এর মতো হিট এ্যালবামের শিল্পী তিনিই পরে গেয়েছেন- ‘বদরুদ্দোজা শামসুদ্দোহা’, ‘মেহবুবে ইয়াজদান’, ‘জালওয়ায়ে জানান’-এর মতো উচ্চাঙ্গের নাশিদ ইসলামি সঙ্গীত। তার মধুর কন্ঠে গাওয়া ‘এ্যায় আল্লাহ তুহি আতা তো যুদো সাখা’ সত্যিই চমৎকার।
মুফতি তাকি উসমানির লেখা ‘এলাহি তেরি চৌকাঠ পার ভিখারি বানকে আয়াহু’ এবং ‘মুঝে যিন্দেগি মে ইয়া রব সারে বন্দেগি আতা কর’ জুনায়েদের কণ্ঠে শুনলে হৃদয়ের গভীর থেকেই এ দোয়া আসে মহান আল্লাহ যেন তার মতো আমাদেরও তার দুয়ারের ভিখারী হিসেবে কবুল করেন।
মৃত্যু অবধি জুনায়েদ উর্দু গজল, হামদ-নাতের বিখ্যাত কণ্ঠশিল্পী হিসেবে বিশ্বব্যাপী শ্রোতাদের মনের স্থান লাভ করে আছেন৷ তিনি সঙ্গীতচর্চার পাশাপাশি নিয়মিত তাবলিগের কাজ করতেন। সঙ্গীত পরিবেশন ও বিশ্ব ইজতেমায় অংশ নেওয়ার উদ্দেশ্য তিনি অনেকবার বাংলাদেশ সফর করেছেন। সমাজসেবার জন্য সক্রিয়ভাবে কাজ করেছেন বিভিন্ন দাতব্য সংস্থার সঙ্গে। আজ তার প্রয়াণ দিবসে আমরা তার আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। আমরা দোআ করি মহান আল্লাহ তাকে জান্নাতের সুউচ্চ মাকাম দান করুন।


