এই সময় । অনন্য প্রতীক রাউত
এগিয়ে চলার শক্তি হোক গৌরবের পতাকা
কোন জাতির স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক হিসাবে বিবেচিত হয় জাতীয় পতাকা। ঐতিহাসিক সমৃদ্ধ জনপদ বাংলাদেশের ও রয়েছে সার্বভৌমত্বের ধারক, লাল-সবুজের সমুজ্জ্বল পতাকা। নয়মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, ৩০ লক্ষ শহীদ ও ২ লক্ষ ৭৬ হাজার মা-বোনের সম্ভ্রমের প্রতীক হিসাবে নীল আকাশে অবিরাম উড়ে চলেছে জাতীয় পতাকা। ১৯৭১ সালের ২ মার্চ যা প্রথম উত্তোলিত হয় দেশান্তবোধের বাহক হিসেবে, স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে।
গৗরবোজ্জ্বল সেই ইতিহাস ; পতাকা মুক্তি ও স্বাধীনতার সর্বোচ অহংকার। ২ রা মার্চ স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন দিবস । ১৯৭১ সালের এইদিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা প্রাণঙ্গে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করেন তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতা আ স ম আব্দুর রব। এর আগে ১ লা মার্চ ছাত্ররা গঠণ করে স্বাধীনবাংলা সংগ্রাম পরিষদ। যার সদস্য ছিলেন আ স মা আব্দুর রব ছাড়াও রুহুল কুদ্দুস মাখন, শাহজাহান সিরাজ।
সকাল ১১ টায় পতাকা উত্তোলন করা হয়। সারা রাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে ইকবাল হলের(বর্তমান শহিদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)১০৬ নম্বর রুমে পতাকার ডিজাইন করেন শিবনারায়ণ দাস, যিনি তৎকালীন কুমিল্লা জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন। স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা ও পাক সরকারের বিরুদ্ধে সংগ্রামী ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার ক্ষেত্রে ২ রা মার্চের পতাকা উত্তোলন ছিল অভূতপূর্ব এক অর্জন । যা বঙ্গবন্ধুর অসহযোগ আন্দোলনকে ত্বরাণিত এবং স্বাধীন জাতিরাস্ট্র বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।
আমাদের প্রত্যাশা ও বাস্তবতা ; পতাকা দেশান্তবোধ, জাতীয়তা বোধের অর্জিত চিহ্ন। নয়মাসের রক্তক্ষয়ী মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে যা বাঙালি জাতি ছিনিয়ে এসেছে। তাই পতাকা অহংকার, বাঙালিত্বের প্রতীক নিঃসন্দেহে। তবে, দুভার্গ্যবশত আমরা কথাগুলো বলার স্বার্থেই বলি। স্বাধীনদেশে পতাকা খামচে ধরা শকুনিদের ষড়যন্ত্র বা উপস্থিতি অন্তত সেটি প্রমাণ করে। স্বাধীনতা অর্জিত হলে ও থেমে নেই তাদের লালসাময় কর্মকা-। ৭৫ এ জাতির জনককে হত্যার মধ্য দিয়ে তাদের নীল-নকশার সূচনা। লজ্জাজনক হলেও সত্যি দেশের সপক্ষে থাকা অনেক সুযোগ সন্ধানী প্রভাব পতিপত্তি কিংবা ক্ষমতার লোভে হাত মিলিয়েছে তাদের সাথে। জাতির পিতার হত্যাকারীদের করেছে পুরষ্কিত, ইনডেমনিটির মতো কালো আইন দিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে পবিত্র সংবিধানকে। ধ্বংস করেছে বাঙ্গালি সংস্কৃতিকে, নির্বিচারে হত্যা করেছে রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের। যুদ্ধপরাধীদের সুকৌশলে করা হয়েছে রাজনৈতিক ভাবে প্রতিষ্ঠিত। নিজ অস্তিত্ব রক্ষার্থে দেশের কোটি জনতাকে রক্ষাকারী সেনাবাহিনীর চেইন অব কমান্ড করেছে ধ্বংস। গো-আজমের মতো দেশদ্রোহীদের দেয়া হয়েছে রাষ্ট্রীয় সন্মান, গাড়িতে তুলে দেয়া হয়েছে লাখো শহীদের কষ্টার্জিত পতাকা। ঠিক সেখানেই এক প্রকার বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে জাতীয় পতাকা তথা জাতির সাথে। আখের গোছানোর সংস্কৃতি আর প্রতিহিংসামূলক বিচার কাঠামো নানা লড়াইয়ের আড়ালে প্রতিনিয়ত ছিঁড়ে খাছে জাতির পতাকাকে। বিগত দশকগুলোতে ছিল না বর্গি, ইংরেজ কিংবা হানাদাররা তবুও কেন মানুষের মনে জন্মেছে শূন্যতা আর হাহাকার? কেননা, শূন্যতা সৃষ্টিকারী আমরাই।
নিজস্বার্থে ক্ষমতার লোভে দেয়া বিবেক বিসর্জন, নিরীহ লোকের প্রাণদন্ড, হরতালের মাধ্যমে জনজীবনে করে দেয়া বিপর্যস্ত, আকাশ চুম্বি বাড়ি ভিতরে কালো টাকার চচরি, আধুনিকতার নামে অপসংস্কৃতির চর্চা, দরিদ্রতার আড়ালে অপরাধ এসব কিসের নিদর্শন? আপনার বা আমার মতো মানুষের নোংরা বাস্তব কার্যকরীতার। দুঃখিনী মায়ের জরাজীর্ণ বস্ত্র, গৃহহীন নর-নারীর উদ্বাস্থ হবার দৃশ্য, অন্নের খোঁজে তৈরী হওয়া কিশোরী প্রমোদতরী, দুম করে গড়ে উঠা পান্থশালা, দেশদ্রোহীর তরবারী, পানির ট্যাঙ্কে অপশক্তির বিরুদ্ধে জীবন দেয়া বীরসেনানীর মরদেহ এসবের জন্যই জাতির পিতা দিয়েছিলেন স্বাধীনতার ঘোষণা? কখনোই না নিশ্চয়ই! তবে, হঠাৎ লাইনচ্যুত হওয়া ট্রেনের বগির পরিণতি যেমন হয় ভয়াবহ ঠিক তেমনী অবা হয়েছিল গোটা ছাপান্ন হাজার বর্গমাইল জুড়ে। পরিিিত সময়ের সাথে সাথে, মুক্তিকামী মানুষের মুক্তির ফাঁকে ফাঁকে বদলেছে সত্যি তবে রয়ে গেছে সেই ধারাবাহিকতার অংশবিশেষ। যা একবারেই হয়তো যাবে না মুছে দেয়া। তবে, সম্ভব মানুষ চাইলে, সবাই ঐক্যবদ্ধ হলে। ঐক্যবদ্ধতা নেই বলেই গ্রামের মোড়ল কালু মিয়ারা হুক্কা বা সিগারেট টানার আঁকেবাঁকে মেরে দিছে অন্যর সহায় সম্পত্তি। কখনো প্রভাবশালীর চক্করে সর্বস্ব হারাতে হছে হারাধন বাবুদের বা রিক্সা চালক রশিদ মিয়াদের। প্রতিটি মানুষ যখন পাবে বাঁচার অধিকার, পাবে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, থাকবে জীবনের নিরাপত্তা তখনই তৈরী হবে জাতীয় পতাকার সত্যিকারের স্বকীয়তা। অন্যথায় দৃশ্যপট আলোচ্য মতামতের সাথে হবুহ এক সূত্রে গাঁথা বলেই মনে হওয়া খুব স্বাভাবিক।
প্রকৃতপক্ষে, ভাঙা কিংবা গড়ার মাধ্যমেই এগোতে প্রতিটি স্বাধীন রাষ্ট্র। দুভার্গ্যক্রমে, বাংলাদেশের অবা হয়েছিল অস্বাভাবিকতায় আলোশূন্য অন্ধকার ঘরের মতো। তাইতো, সংগীতশিল্পী হায়দার হোসেনের কণ্ঠরূপ নেয় বাস্তবের মাটিতে , কি শোনার কথা ছিল, কি শুনছি, কি দেখার কথা ছিল, কি দেখছি, কি ভাবার কথা ছিল, কি ভাবছি ! সর্বোপরি, অগ্নিযাত্রায় সফল হয়ে শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে এগিয়ে যাছে বাংলাদেশ, এগিয়ে যাবেই বাংলাদেশ। পতাকা হবে সমুন্মত, মর্যাদা থাকবে অক্ষুন্ন এটাই একজন বাঙালি গর্ভে জন্ম নেয়া তরুণের চির প্রত্যাশা।
লেখক : শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়


