কওমীতে নেতৃত্বের মেয়াদ ও হাটহাজারী প্রসঙ্গ

কওমীতে নেতৃত্বের মেয়াদ ও হাটহাজারী প্রসঙ্গ

 মতামত । শেখ ফজলুল করীম মারুফ

কওমীতে নেতৃত্বের মেয়াদ ও হাটহাজারী প্রসঙ্গ

২০১৭ সালে ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলন একটি দুঃসাহসিক কাজ করেছিলো। একটি লোক বক্তৃতার মাধ্যমে “ইসলামী রাষ্ট্রের রূপরেখা” প্রস্তাবনা হাজির করেছিলো। আমেলার পক্ষ থেকে আমি অধমকে সেই দায়িত্ব দেয়া হয়েছিলো। তখন বয়স কম। সাহস করেছিলাম। এখন হয়তো সেই সাহস করবো না। সেই প্রস্তাবনায় আমরা রাষ্ট্র প্রধানের জন্য যেসব বিধান প্রস্তাব করেছিলাম তারমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ছিলো,

-ইসলামী রাষ্ট্রের প্রধানের মেয়াদকাল সুনির্দিষ্ট হবে এবং একই ব্যক্তি নির্ধারিত মেয়াদের বেশি দায়িত্বে থাকতে পারবেন না। এই প্রস্তাব করার পরে সমালোচনা উঠলো, চার খলিফার কোন খলিফারই মেয়াদকাল সুনির্দিষ্ট ছিলো না। বরং তারা আমৃত্যু দায়িত্ব পালন করেছেন। তাই মেয়াদকাল বেঁধে দেয়া শরীয়াহ সমর্থিত না।

এর বিপরিতে আমার যুক্তি ছিলো যে, ইসলামী রাষ্ট্র একটি জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্র। খোলাফায়ে রাশেদার যুগে এর যেসব বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পেয়েছে তা অব্যহত রাখতে হবে। কোন কাঠামো যদি না তা সুনির্দিষ্ট হয় তাহলে ঐতিহ্যের নামে সেই কাঠামো রক্ষা করতে গিয়ে মুল চরিত্র নষ্ট করা যাবে না। ইসলাম রাষ্ট্র পরিচালনার কোন কাঠামো নির্দিষ্ট করে দেয় নাই বলেই আমাদের অধ্যয়ন বলে। তাই সাহাবায়ে কেরামের রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামো রক্ষা করতে গিয়ে ইসলামি রাষ্ট্রের মুল চরিত্র নষ্ট করা যাবে না।

এখন হিজরী ১৪ শতক চলছে। রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে আমরা অনেক দুরে। তাঁর হাতে গড়া শ্রেষ্ঠ মানুষদের হাতে গোটা পৃথিবী অর্পণ করেও এই নিশ্চয়তা দেয়া যায় যে, কোন খেয়ানত হবে না। কিন্তু এতো বছর পরে এসে কারো ওপরে সেই আস্থা রাখা ঠিক হবে না। সেজন্যই আধুনিককালের ইসলামী রাষ্ট্রের চিন্তায় এমন সব আইনি কাঠামো রাখতে হবে যেনো কেউ চেষ্টা করলেও স্বৈরাচারী না হয়ে উঠতে পারে। ইসলামী রাষ্ট্রের চরিত্র নষ্ট করতে না পারে। খোলাফায়ে রাশেদার সময় এই আইনগত কাঠামোর দরকার ছিলো না কিন্তু এখন এমন সব আইনগত কাঠামো দরকার।

এই প্রস্তাব ও যুক্তি আমার কাছে যথার্থ মনে হলেও মনের গহীনে একটা অস্বস্তি ছিলো।

কিন্তু দারুল উলুম হাটহাজারী মাদ্রাসার মুহতামিম কাণ্ড দেখে আমার সেই অস্বস্তি দুর হয়ে গেছে। এটা দেখে আমার আরো বেশি করে প্রত্যয় জন্মেছে যে, যেকোন ক্ষমতা বা লাভজনক পদের মেয়াদকাল সুনির্দিষ্ট থাকা উচিৎ এবং সেই পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার পদ্ধতি সুনির্ধারিত হওয়া উচিৎ।

ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলনের সর্বশেষ সংশোধিত নীতিমালায় সংগঠনের শীর্ষ তিনটি দায়িত্ব অর্পণ ও স্থায়িত্ব সম্পর্কে একেবারে সুস্পষ্টভাবে বিধি প্রনয়ণ করা আছে। কেন্দ্রীয় সভাপতির জন্য কেন্দ্রীয় আমেলায় চার বছরের পুর্ব অভিজ্ঞতা আর সহ-সভাপতি বা সেক্রেটারী জেনারেলের জন্য তিন বছরের অভিজ্ঞতা শর্ত। আর কেন্দ্রীয় সভাপতি দুই মেয়াদের বেশি দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না।

আমি মনে করি সকল ইসলামপন্থী সংগঠনের শীর্ষ পদগুলোতে এবং সকল মাদ্রাসার শীর্ষ পদগুলোরও মেয়াদকাল বেঁধে দেয়া উচিৎ।

এখানে খোলাফায়ে রাশেদার উদাহরণ টানা বোকামী হবে। কারণ হজরত আবু বকর, উমর, উসমান আর আলী রাজিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম এর মতো ইখলাস, তাকওয়ার অধিকারি এই যুগের কেউ না। তাই তাদের ওপরে কিয়াস না করে আইনগত বাধ্যবাধকতা থাকলেই বরং ইসলামী নেতৃত্বের সৌন্দর্য বজায় থাকবে।

নেতৃত্বের সময়সীমা সংক্রান্ত আইনি বাধ্যবাধকতা থাকলে উম্মুল মাদারিসের চলতি লজ্জাজনক অধ্যায় এড়ানো যেতো। তবে ব্যতিক্রম থাকতে পারে এবং তা ভালো কাজও করতে পারে। বাংলাদেশেও তার উদাহরণ আছে।

লেখক : সাবেক সভাপতি, ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলন

মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *