কাছে থেকে দেখা একটি মৃত্যু | রশীদ জামীল
ছোটবেলা থেকে একটা কৌতূহল ছিল আমার। একটি মৃত্যুকে খুব কাছে থেকে দেখব। আমি দেখতে চাইছিলাম মৃত্যুর ঠিক আগ মুহূর্তে মানুষ কী করে! যদি জানতাম আমার ইচ্ছাটিকে এভাবে পূর্ণ করা হবে, তাহলে বলতাম, থাক আল্লাহ, লাগবে না আমার মৃত্যু দেখা।
১৮ রমজান ২০০৬। আমি আর আমার বাবার চেহারার মাঝে তখন এক ফিট মতন দূরত্ব। ঝুঁকে আছি আমি তাঁর মুখের উপর। আমি জানি কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার বাবা পৃথিবীর সাথে সব সম্পর্ক ছিন্ন করবেন। ডাক্তার আমাকে সেভাবেই জানিয়ে রেখেছেন।
দুপুর ২ টা বাজে তখন। বাবা অচেতন হয়ে আছেন প্রায় দেড় দিন হলো। স্টোক করার পর হাসপাতালে ভর্তি করার ১৮ ঘণ্টা চলে যাবার পরও যখন জ্ঞান ফিরছিল না, তখন সুহৃদ বন্ধুবর ডাক্তার Manjur Ahmed Sajib বলেছিলেন, ‘রশীদ ভাই, আল্লাহকে ডাকুন, তিনিই সব করতে পারেন। তবে মনকে শক্ত করুন। স্টোক করার পর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জ্ঞান না ফিরলে সাধারণোত রোগীর আর আর জ্ঞান ফিরে না।
সিলেট ওসমানি মেডিক্যাল কলেজ এন্ড হসপিটালের নিউরোলজি বিভাগের বিভাগের বিভাগীয় প্রধান সেদিন ছুটিতে ছিলেন। অসহায়ের মতো হয়ে ফোন দিলাম হৃদরোরোগ বিভাগের সিনিয়ার প্রফেসর ডাঃ সুধাংশুকে। বিশেষ কিছু কারণে তিনি আমাকে স্নেহ করতেন এবং ‘তুই ‘করে বলতেন। কাঁদো কাঁদো গলায় বলালাম, দাদা! আমার আব্বা স্টোক করে ওসমানিতে আছেন, কিন্তু নিউরোর ডাক্তার ছুটিতে। তিনি বললেন, ‘তুই একটু ওয়েট কর, আমি দেখছি। ৫ মিনিট পর আমাকে বললেন, আমি তাকে বলে দিয়েছি। সে আধা ঘণ্টার মধ্যে তোর বাবাকে দেখতে হাসপাতালে আসছে।
দুপুর ১ টার দিকে সিলেট ওসমানি মেডিক্যাল কলেজ এন্ড হসপিটালের নিউরোলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান এলেন। আব্বাকে দেখলেন। তারপর আমাকে আলাদা করে নিয়ে বললেন, অস্বাভাবিক কিছু না ঘটলে আর ঘণ্টা দু’য়েক… সে মতে সময় আছে খুব বেশি হলে আর মিনিট ত্রিশেক…
২ টা ৩০ মিনিটে চোখ খুললেন বাবা। আমার ছোটবোন দু’টি আর ছোটভাই কাছে ছিল। তাদের চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠল। ৩২ ঘণ্টা পর চেতনায় আসছেন বাবা। তারা চিৎকার করে বলে ওঠল,
ভাই! আব্বার জ্ঞান ফিরছে!
আব্বার জ্ঞান ফিরছে!
ঝাপিয়ে পড়ল তারা। ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলাম আমি। কারণ, একমাত্র আমিই জানি, ডাক্তার আমাকে বলেছেন মৃত্যুর ঠিক আগ মুহূর্তে একবার জ্ঞান ফিরতে পারে। এই পৃথিবীতে ৩২ ঘণ্টা শেষ ঘুম দিয়ে উঠে চোখ খুলে তাকালেন আমার বাবা। আমি ঠিক মুখের কাছে কান নিয়ে গেলাম।
আব্বা!
আব্বা!
ও আব্বা!
জবাব নেই! মাথা উঠিয়ে তাকালাম আমি তাঁর মুখের দিকে। তিনি ডানে-বামে একবার চোখ ঘুরালেন। সম্ভবত শেষবারের মত একবার দেখে নিলেন তাঁর কলিজার টুকরো সন্তানগুলোকে। কোনো কথা বললেন না। কোনো কথা বললে পারলেন না। দু’চোখ দিয়ে তখন তাঁর গড়িয়ে পড়ছিল পানি।
মিনিট মতন হবে- তারপরেই উচ্চ স্বরে এবং স্পষ্ট উচ্চারণে ‘আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহ’ বলেই চোখ বন্ধ করে ফেললেন। কয়েক মুহূর্ত ভ্যাবাচেকা খেয়ে রইল আমার ভাইবোনগুলো। আব্বা মারা গেছেন- সেটা বুঝতে বেশ কয়েক সেকেন্ড লেগে গেল তাদের। যখন বুঝল, তখন হাসপাতাল জুড়ে তৈরি হল অন্যরকম এক আবহ।
মৃত বাবাকে নিয়ে বাড়ি ফিরলাম। আমার ছোটভাইবোন ছাড়াও হসপিটাল থেকে সঙ্গি হলো আমার আরেক ছোটভাই Moynul Islam। ইফতারের ঠিক আগ মুহূর্তে ঘরে ফিরলাম আমরা। সেই ঘরে, তিল তিল শ্রম আর ভালবাসা দিয়ে যে ঘরটি তিনি বানিয়েছিলেন।
পরের দিন সকাল ১০ টায় জানাজা হলো। জানাজা পড়াল আমার ছোটভাই Husain Ahmad Misbah. জানাজার পর কবরে নেমে বাবাকে কোলে নিলাম শেষবারের মত। তখন পর্যন্ত নিজেকে ধরে রেখেছিলাম। মনকে শক্ত করে সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছিলাম, ‘আমি কাঁদব না’। আমাকে কাঁদলে হবে না। আমি বড় ছেলে। আমি কান্নাকাটি করে অস্থির হয়ে গেলে বাকিদের সান্ত্বনা দেবে কে? তাদেরকে কন্ট্রোল করব কীভাবে?
কবরে নামবার পর চোখ দুটো আর নিয়ন্ত্রণে থাকল না। উপরে যারা ছিল তাদের পক্ষে বুঝার উপায় ছিল না আমার বাবার কাফনের ভেজা বুকে গোলাপজলের পানি বেশি, নাকি চোখের পানি…
রাব্বিরহামহুমা কামা রাব্বা ইয়ানী সাগিরা।
সাক্বাল্লাহু সারাহু ওয়া যাআলাল জান্নাতা মাসওয়াহ।
লেখক : কলামিস্ট


