কাশ্মীর : কি করা প্রয়োজন মুসলমানদের!

কাশ্মীর : কি করা প্রয়োজন মুসলমানদের!

কাশ্মীর : কি করা প্রয়োজন মুসলমানদের!

সগীর আহমদ চৌধুরী : প্রতিনিয়ত ছটপট করছি কাশ্মীরের আপডেট জানার জন্যে, কী হচ্ছে আমাদের মা-বোনদের সাথে তা জানতে। কিছু ভাই কাশ্মীরের পুরোনো ছবি-ভিডিও আপলোড দিচ্ছে, এতে বিভ্রান্ত হচ্ছি, নারকীয়তা দেখে আতঙ্কিত হচ্ছি, আবার প্রতিরোধ দেখে আশান্বিত হয়েও পরে হতাশ হতে হয়। এসব পুরোনো জিনিসে অনুভূতি ভীষণভাবে আহত অনুভব করি, শুধু কটা লাইকের জন্য এভাবে আমাদের ভাবাবেগের সাথে তামাশা করা কি ঠিক হচ্ছে?

কাশ্মীর নিয়ে কিছুতেই আশ্বস্ত হতে পারছি না। ভারতের পন্য বয়কটের আহ্বান শুনছি, পন্য, চ্যানেল, দ্রব্য সব। এ আহ্বানের মূল্য দেয়া হয় না, জনগণ সচেতন নয়, সচেতন যারা আছে আবেগে দুয়েকদিন, তারপর পুরোনো অভ্যাস অনুযায়ী ভারত-অভারতের কোনো তফাৎ করি না আমরা। আর প্রকৃতপ্রস্তাবে এটি সম্ভবও না, বিশেষত রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত ছাড়া এটি কখনো কার্যকরী হওয়ার নয়।

জাতিসংঘ-ওআইসি ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মূলত বিবৃতিতেই তাদের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রাখবে। পাকিস্তান অভ্যন্তরীণভাবে এতো সমস্যাগ্রস্ত যে, ইচ্ছে থাকলেও সে আসলে কোনো পদক্ষেপ নিতে পারবে না। না কাশ্মীরী ভাইদের সহযোগিতা করতে পারবে, না সামরিক সহয়তা দিতে পারবে। ভারতীয় বিশ্বাসঘাতকতার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ভারতকে দোষবে দূরে থাক, বরং কাশ্মীরীদের সহযোগিতার জন্য উল্টো পাকিস্তানকে এক ঘরে করতে চেষ্টা করবে, প্রতিরোধ সংগ্রামকে জঙ্গিবাদের তকমা দেবে।

ভারতের বিরুদ্ধে যতো যুদ্ধ অতীতে হয়েছে বা ভবিষ্যতে হবে আমি মনে করি এর সবগুলোই গযওয়ায়ে হিন্দের অন্তর্ভুক্ত। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুসংবাদ অনুয়ায়ী প্রত্যেকটি যুদ্ধই ফযীলতপূর্ণ। তবে এ নিয়েও আমি আশান্বিত হতে পারছি না। বলা হচ্ছে, ফিলিস্তীন থেকে মুসলমান রাজা এসে ভারতের রাজাকে পাকড়াও করে নিয়ে যাবেন। ফিলিস্তীনই তো মুসলমানদের হাতছাড়া, আর গণতান্ত্রিক বিশ্বে রাজা-রাজত্ব আসবে কোত্থেকে? এসব হাদীস মূলত দুর্বল, আমার কাছে উপখ্যান ছাড়া কিছুই মনে হয় না। সত্য ধরে নিলেও এসব ঘটবে কিয়ামতের নিকটবর্তী সময়ে, আর কিয়ামত কি এতো সন্নিকটে? আল্লাহু আ’লাম।

এসব উপখ্যান-রূপকথায় বিশ্বাস এবং অন্যের ওপর ভরসা না করে আমাদের আসলে প্রস্তুতি শুরু করা উচিত। আল্লাহ বলেছেন, وَأَعِدُّوا لَهُمْ مَا اسْتَطَعْتُمْ مِنْ قُوَّةٍ (তোমরা সাধ্যানুযায়ী শক্তি অর্জন করো)। এখানে বহুবচনের শব্দ এসেছে। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে জাতি অর্থাৎ জাতীয়ভাবে আমাদের শক্তিশালী হতে হবে। এজন্য আমরা এভাবে তৈরি হতে পারি।

যথা- ১। মুসলমানদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ গড়ে তোলা: আকিদা-বিশ্বাস, মাসলাক, মাযহাব যার যাই হোক না কেন একটি ঐক্যকামী মনোভাব গড়ে ওঠা উচিত। কাদিয়ানি ছাড়া দেওবন্দী-বেরলবী, শিয়া-সুন্নি, জামায়াত, সুফি এমনকি মাযারপন্থিদের সাথেও ভ্রাতৃত্ববোধ গড়ে তুলতে হবে। সবাই মিলে একটি মাত্র সংগঠন গড়ে তুলতে হবে না, দল হাজারটি হোক, ইখতিলাফও আপন আপন জায়গায় থাক, তবে পারস্পরিক সালাম-কালাম, শ্রদ্ধবোধ, সহযোগিতার মানসিকতা গড়ে ওঠুক। আকিদা, মাসলাকী ও ফিকহী ইখতিলাফগুলো সম্পূর্ণই অ্যাকাডেমিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ করে দেওয়া হোক। বাহ্যিক ঐক্যে এটি কোনো বাধা হয়ে না দাঁড়াক।

৬ আগস্ট ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ঢাকায় কাশ্মীরে ভারতীয় আগ্রাসনের প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিলের আহ্বান করেছে। আমার পরিচিত জামায়াতের অনেক নেতা-কর্মিকে দেখেছি এর সফলতা কামনা করতে, এটি প্রচার করতে। জামায়াত-ইসলামী আন্দোলন ঐক্য হয়তো গড়ে ওঠবে না, মওদুদিয়ত নিয়ে বিতর্কও হয়তো কখনো শেষ হবে না, কিন্তু অন্তত এটুকু তো হতে পারে যে, মওদুদিয়ত বিরোধিতার চর্চাটা অ্যাকাডেমিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ করে এ নিয়ে প্রকাশ্য মুসলিম বিভক্তির দ্বন্দ্ব-সংঘাত থেকে বিরত হই!

২। জাতীয়ভাবে আমাদের শক্তিশালী হতে হবে, অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হতে হবে, পরনির্ভরতা থেকে সম্পদে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে হবে, আমদানি নির্ভরতা কমাতে হবে, দেশে উৎপাদন বাড়াতে হবে, অপচয় রোধ করতে হবে, বিলাসিতা ছাড়তে হবে। মুসলমানদের নওজোয়ানকে নৈতিকতায় গড়ে তুলতে হবে, শত পার্সেন্ট শিক্ষিত হতে হবে। শিক্ষায় মানবিক বিষয়াবলির চেয়ে বিজ্ঞান-প্রযুক্তি এবং টেকনিক্যাল ও উৎপাদনমুখী বিষয়াবলির গুরুত্ব দিতে হবে। ডাক্তারি, ইঞ্জিনিয়ারিং, মেডিসিন, ম্যানেজম্যান্ট, ফিজিওথেরাফি, ফার্মেসি, নার্সিং ও আর্কিটেকচার ইত্যাদি বিষয়ে সাফল্যের শীর্ষে পৌঁছা জরুরি। মুসমানদেকে অত্যন্ত পরিশ্রমী জাতি হিসেবে গড়তে হবে। আমাদের জিহাদ করতে হবে, এ প্রসঙ্গে ভারতীয় পার্লামেন্টারিয়ান ব্যরিস্টার আসাদউদ্দীন ওয়াইসি বলেন, ‘মুসলমানৌ মেঁ গরীবী হে, উস কে খেলাফ জেহাদ করৌ। এলেম মেঁ কমী হে, ইলম-সাইন্সে মেঁ তরক্কী করৌ।’ এটিই মূলত জিহাদের প্রকৃত প্রস্তুতি।

দেশে রাজনীতিক সংস্কারও জরুরি, সৎ ও দেশপ্রেমিক মানুষের ক্ষমতায়নের জন্য লড়াই করতে হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। জনগণের সম্পদ লুটপাট, অপচয় ও অপব্যায়ের বিরুদ্ধে রুখ দাঁড়াতে হবে। শিক্ষার সর্বস্তরে ইসলামের মূল্যবোধের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, পর্যায়ক্রমে দেশকে ইসলামি নীতি-আদর্শের আলোকে গড়ে তুলতে হবে। তবে এ লক্ষ্যে হাসিলে দেশে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা করা যাবে না, দেশের সামান্য ক্ষতি হয়, সম্পদের বিনষ্ট হয় কিংবা অরাজকতার সুযোগে বর্হিশক্তির নাক গলানোর সুযোগ হয় এমন কিছুই করা যাবে না। দাওয়াতী কাজ বাড়াতে হবে, সাংগঠনিক শক্তির ভিত মজবুত করতে হবে, নৈতিকতার প্রসার করতে হবে। মুসলিম জোয়ানদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা করতে হবে, সর্বত্র স্কাউটিং গড়ে তুলতে হবে, ক্রিকেট ও ফুটবল খেলার প্রবর্তন করতে হবে, প্রাত্যাহিক ব্যায়ামের সবক দিতে হবে। ঘরের মা-বোনদের হাতে কাজ দিতে হবে, তাদের বিলাসী ও অলস মনোভাব কাটিয়ে পরিশ্রমী করে তুলতে হবে।

লেখক : শিক্ষক ও রাজনীতি বিশ্লেষক

মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *