কুরআন ও হাদীসের আলোকে রমযান

কুরআন ও হাদীসের আলোকে রমযান

পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : রমযান—এ এক অনুপম আসমানী দাওয়াত। এ মাসে রহমতের দুয়ার উন্মুক্ত হয়, মাগফিরাতের সুবাতাস প্রবাহিত হয়, আর নাজাতের বার্তা হৃদয়ে হৃদয়ে ধ্বনিত হয়। রোযা ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের অন্যতম—ঈমান, সালাত ও যাকাতের পরই যার স্থান। আরবি ‘সওম’ শব্দের অর্থ বিরত থাকা। পরিভাষায়—সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত আল্লাহর সন্তুষ্টির নিয়তে পানাহার, দাম্পত্য মিলন ও রোযাভঙ্গকারী সকল বিষয় থেকে বিরত থাকাই সিয়াম।

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ… لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ
“হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোযা ফরয করা হয়েছে, যেমন ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর—যেন তোমরা মুত্তাকী হতে পার।”
—সূরা বাকারা (২): ১৮৩

আরও ইরশাদ হয়েছে—

فَمَنْ شَهِدَ مِنْكُمُ الشَّهْرَ فَلْيَصُمْهُ
“তোমাদের মধ্যে যে এ মাস পাবে, সে যেন অবশ্যই রোযা রাখে।”
—সূরা বাকারা (২): ১৮৫

অতএব, সুস্থ, মুকীম ও প্রাপ্তবয়স্ক প্রত্যেক মুসলিমের উপর রমযানের পূর্ণ সিয়াম পালন করা ফরয। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চাঁদ দেখার ভিত্তিতে রোযা শুরু ও শেষ করার নির্দেশ দিয়েছেন (সহীহ বুখারী: ১৯০৯; সহীহ মুসলিম: ১০৮০)। এ বিধান দ্বীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ; অকারণে তা পরিত্যাগ করা মহাপাপ।

রোযার অনন্য প্রতিদান

রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন—

قال الله تعالى: الصوم لي وأنا أجزي به
“রোযা আমার জন্য, আর আমি নিজেই এর প্রতিদান দিব।”
—সহীহ বুখারী: ১৮৯৪; সহীহ মুসলিম: ১১৫১

মানুষের নেক আমলের সওয়াব দশ থেকে সাতশ’ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়; কিন্তু রোযার প্রতিদান নির্ধারিত নয়—এটি সরাসরি আল্লাহর পক্ষ থেকে, বিনা হিসাবে। কারণ রোযা একান্ত গোপন ইবাদত—এতে রিয়া বা লোকদেখানোর সুযোগ ক্ষীণ। বান্দা কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই নিজের প্রবৃত্তিকে সংযত করে।

আল্লাহ বলেন—

إِنَّمَا يُوَفَّى الصَّابِرُونَ أَجْرَهُمْ بِغَيْرِ حِسَابٍ
“ধৈর্যশীলদের প্রতিদান দেওয়া হবে অগণিতভাবে।”
—সূরা যুমার (৩৯): ১০

রোযা ধৈর্যের শ্রেষ্ঠ অনুশীলন; তাই তার পুরস্কারও অসীম।

জান্নাতের ‘রাইয়ান’ দরজা

রাসূলুল্লাহ ﷺ ঘোষণা করেন—

“জান্নাতে একটি দরজা আছে, যার নাম ‘রাইয়ান’। কিয়ামতের দিন কেবল রোযাদাররাই এ দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে।”
—সহীহ বুখারী: ১৮৯৬; সহীহ মুসলিম: ১১৫২

যারা আল্লাহর জন্য ক্ষুধা-তৃষ্ণা সহ্য করেছে, তারা চিরতরে তৃপ্তির দরজা দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে। এ এক সম্মান, যা অন্য কোনো আমলের জন্য নির্দিষ্ট নয়।

রোযা—জাহান্নাম থেকে ঢাল

নবী ﷺ বলেছেন—

الصيام جنة من النار
“রোযা জাহান্নাম থেকে রক্ষাকারী ঢাল।”
—মুসনাদে আহমদ: ১৬২৭৮; ইবনে মাজাহ: ১৬৩৯

যেমন যুদ্ধে ঢাল সৈনিককে রক্ষা করে, তেমনি রোযা বান্দাকে পাপ ও আগুন থেকে আড়াল করে। এ ঢাল কেবল বাহ্যিক নয়; অন্তরেরও—কামনা, ক্রোধ ও হিংসাকে সংযত করে।

গুনাহ মাফ ও আত্মশুদ্ধি

রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন—

من صام رمضان إيمانا واحتسابا غفر له ما تقدم من ذنبه
“যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশায় রমযান মাসের রোযা রাখবে, তার পূর্বের গুনাহসমূহ ক্ষমা করা হবে।”
—সহীহ বুখারী: ৩৮; সহীহ মুসলিম: ৭৬০

আরও আছে—

“যে ব্যক্তি রমযানের সিয়াম ও কিয়াম আদায় করবে, সে জন্মদিনের ন্যায় নিষ্পাপ হয়ে যাবে।”
—মুসনাদে আহমদ: ১৬৬০

রোযা শুধু ক্ষুধা-তৃষ্ণার নাম নয়; এটি আত্মাকে পরিশুদ্ধ করার মহাসাধনা। কুরআনে বিভিন্ন কাফফারার ক্ষেত্রে রোযার বিধান নাযিল হওয়াও প্রমাণ করে—সিয়াম পাপমোচনের কার্যকর মাধ্যম (দেখুন: ২:১৯৬; ৪:৯২; ৫:৮৯; ৫৮:৩-৪)।

রোযা ও কুরআনের সুপারিশ

রাসূল ﷺ বলেন—

“রোযা ও কুরআন কিয়ামতের দিন বান্দার জন্য সুপারিশ করবে… এবং তাদের সুপারিশ গ্রহণ করা হবে।”
—মুসনাদে আহমদ: ৬৬২৬; মুসতাদরাকে হাকিম: ২০৮০

রমযান কুরআনের মাস। সিয়াম যখন তিলাওয়াতের সাথে যুক্ত হয়, তখন বান্দার নাজাতের সোপান সুদৃঢ় হয়।

দুআ কবুলের সুবর্ণ মুহূর্ত

নবী ﷺ ইরশাদ করেন—

إن للصائم عند فطره لدعوة ما ترد
“ইফতারের সময় রোযাদারের একটি দুআ রয়েছে, যা ফিরিয়ে দেওয়া হয় না।”
—ইবনে মাজাহ: ১৭৫৩

ক্ষুধার্ত অন্তর যখন বিনয়ী হয়, তখন তার প্রার্থনা আরশে পৌঁছে যায়। রোযাদারের দীর্ঘশ্বাসও ইবাদত।

রোযার দুই আনন্দ

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন—

“রোযাদারের জন্য দুটি আনন্দ—ইফতারের সময়ের আনন্দ, আর রবের সাক্ষাতে রোযার কারণে আনন্দ।”
—সহীহ বুখারী: ১৯০৪; সহীহ মুসলিম: ১১৫১

এ আনন্দ ক্ষণস্থায়ী দুনিয়াবি তৃপ্তি নয়; বরং আখিরাতের স্থায়ী প্রশান্তি।

রমযান কেবল সময়ের পরিবর্তন নয়—এ হৃদয়ের বিপ্লব। রোযা মানুষকে তাকওয়ার শিক্ষা দেয়, দারিদ্র্যের অনুভব জাগায়, অন্তরের হিংসা দূর করে, ধৈর্য ও সংযম শেখায়। রাসূল ﷺ আবু উমামা রা.-কে বারবার উপদেশ দিয়েছেন—“তুমি রোযা রাখ; এর সমতুল্য কিছু নেই।” (সহীহ ইবনে খুযাইমা: ১৮৯৩)

অতএব, আসুন—আমরা রমযানকে শুধু আনুষ্ঠানিকতা না বানিয়ে আত্মশুদ্ধির অভিযানে পরিণত করি। গোপন ও প্রকাশ্য পাপ থেকে তাওবা করি, কুরআনের সাথে সম্পর্ক নবায়ন করি, দান-সদকায় অগ্রগামী হই, আর সিয়ামের আধ্যাত্মিক আলোকে জীবন আলোকিত করি।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সহীহ নিয়তে, সহীহ পদ্ধতিতে রোযা পালনের তাওফীক দান করুন; রাইয়ানের দরজা দিয়ে জান্নাতে প্রবেশের সৌভাগ্য নসীব করুন।

আমীন, ইয়া রব্বাল আলামীন।

Related Articles