খাবার অপ্রতুল, লোকালয়ে হানা দিচ্ছে বাঘ

খাবার অপ্রতুল, লোকালয়ে হানা দিচ্ছে বাঘ

বাগেরহাট প্রতিনিধি ● বাঘ আতঙ্কে সুন্দরবন উপকূলের কয়েক গ্রামের মানুষ এখন নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন। বনের পাশে বসতি গড়া এই বাসিন্দাদের এখন এ আতঙ্ক মাথায় নিয়েই দিন পার করতে হচ্ছে। রাত জেগে তারা এখন বাঘ ঠেকাতে গ্রাম পাহারা দিচ্ছেন। এ অবস্থা সুন্দরবনের কাছের জনপদ মোংলা উপজেলার চিলা ইউনিয়নের জয়মনি, বৌদ্ধমারী, কচুবুনিয়া, মোড়েলগঞ্জের গুলশাখালী, নিশানবাড়িয়া, আমুর বুনিয়া ও বলইবুনিয়া গ্রামের। স্থানীয়রা বলছেন, মূলত খাদ্যের অভাবে বাঘ লোকালয়ে আসছে।

গত রোববার জয়মনি গ্রামে গিয়ে কথা হয় শুকুর আলী, জহুর গাজী ও আসমা বেগমের সঙ্গে। তারা জানান, ৩৫ বছর ধরে সুন্দরবনের পাশেই তাদের বসবাস। অতি সম্প্রতি লোকালয়ে বাঘের আনাগোনায় শুরু হওয়ায় তাদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। বাঘ ঠেকাতে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন তারা।

রয়েল বেঙ্গল টাইগারহঠাৎ বাঘ কেন লোকালয়ে-এমন প্রশ্নে শুকুর আলী বলেন, খাদ্যের অভাবে সুন্দরবন থেকে বাঘ লোকালয়ে চলে আসছে। বনের ভেতরে বাঘের যে খাবার যেমন, হরিণ, শূকর এগুলো বনে কমে এসেছে। চোরা শিকারিরা এগুলো মেরে শেষ করে ফেলছে। তাই খাবার না পেয়ে বাঘ এখন মানুষ আর গবাদি পশুর ওপর হামলে পড়ছে।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আব্দুল্লাহ হারুন চৌধুরী বলেন, এই সময় (শুকনো মৌসুম) বাঘের আবাসন এলাকায় সাধারণ মানুষ অবাধে বিচরণ করে। সুন্দরবন নির্ভরশীল পেশাজীবীরা অবৈধভাবে বনজ সম্পদ আহরণে বনে প্রবেশ করেন। ফলে বাঘ তার স্থান ত্যাগ করে। তিনি বলেন, বাঘ লোকালয়ে আসার জন্য খাদ্য সংকটও বড় কারণ। খাদ্যের সংকট পড়লে বাঘ লোকালয়ে আসে।

এ জন্য একশ্রেণির চোরা শিকারিদের দায়ী করেন তিনি। শিকারিরা হরিণ শিকারের ফাঁদ এবং অস্ত্র নিয়ে বনে ঢুকে। এতে হরিণ বধের পাশাপাশি বনের পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যার প্রভাব পড়ে বাঘের ওপর। এই চোরা শিকারিদের বিরুদ্ধে বন বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে যৌথ অভিযান চালানোর পরামর্শ দেন তিনি।

বাঘ লোকালয়ে ঢুকে পড়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট অ্যান্ড টেকনোলজি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক এ কে ফজলুল হক বলেন, বনের ভেতরে মা বাঘ তার বাচ্চাদের একটা সময় তাড়িয়ে দেয়, তখন ওই বাচ্চার নতুন জায়গা দখলের বিষয় আসে। এক্ষেত্রে বাঘ বন থেকে লোকালয়ে আসতে পারে। তিনি বলেন, আবার চোরা শিকারিরা বাঘের খাবার হরিণ তো মারছেই। এক্ষেত্রে বনে হরিণের সংখ্যা কমলে বাঘ লোকালয়ে আসবেই, এটা অসম্ভব কিছু নয়।

পশ্চিম সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) বশির আল মামুন বাঘ লোকালয়ে আসার কারণ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, সুন্দরবনে প্রতি একশ বর্গকিলোমিটারে চারটি বাঘ থাকতে পারে। এর ভেতরে নতুন কোনও বাঘ জন্ম নিলে ওই জায়গা থেকে বাঘ বেরিয়ে পড়বে। তিনি বলেন, হঠাৎ করে বাঘের সংখ্যা বাড়লেও তারা লোকালয়ে চলে আসে। বিজ্ঞান খাদ্যের অভাবে বাঘ লোকালয়ে আসার তথ্য দেয় না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা (এসিএফ) মো. শাহীন কবির বলেন, খাদ্যের অভাবে বাঘ লোকালয়ে আসছে কিনা জানি না। তবে বনের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ছোট খালের এপারে গাছপালা থাকায় সেটি বন ভেবে বাঘ লোকালয়ে চলে আসতে পারে।

লোকালয়ের বাসিন্দাদের সতর্ক করার পাশাপাশি সুন্দরবনে চোরা শিকারিদের দমনে তারা কাজ করছেন বলেও জানান তিনি।

গত ২৩ জানুয়ারি সুন্দরবন উপকূলের গুলশাখালী গ্রামে বাঘ হত্যার ঘটনায় বনবিভাগের লোকজনকে দায়ী করছেন এলাকাবাসী। বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জ উপজেলার ১৩ নং নিশানবাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আ. রহিম বাচ্চু জানান, ওইদিন সকালে কয়েক জন কৃষক মাঠে কাজ করার সময় একটি বাঘ তাদের ওপর হামলে পড়ে। এতে মাসুম দলাল, মুজিবর সরদার, সগির সরদার, ইউম হাওলাদার, ইয়াছিন হাওলাদার ও আল আমিন নামে ছয় কৃষক আহত হন।

চেয়ারম্যান জানান, পরে স্থানীয়দের সহায়তা নিয়ে ফরেস্টের (বনবিভাগ) লোকজন বাঘটিকে পিটিয়ে হত্যা করে। তবে এ ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান বনবিভাগ সদর সার্কেলের (বাগেরহাট) সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মো. মেহেদীজ্জামান বলেন, চেয়ারম্যানের অভিযোগ সত্য নয়। বাঘটি হত্যা করে তার ইউনিয়ন পরিষদে ঝুলিয়ে রাখার দায় এড়াতে তিনি এখন আমাদের দোষারোপ করছেন। বিষয়টি তদন্ত হচ্ছে।

তিন কার্যদিবসের মধ্যে রিপোর্ট দেওয়ার কথা থাকলেও কেন বিলম্ব হচ্ছে জানতে চাইলে এসিএফ মেহেদী বলেন, অধিকতর তদন্ত হচ্ছে। প্রাথমিক তদন্তে সবকিছু পাওয়া গেছে, শিগগিরই প্রতিবেদন দেওয়া হবে।

পশ্চিম সুন্দরবনের যোগাযোগ শাখার কর্মকর্তা মো. আলী হোসেন জানান, পূর্ব ও পশ্চিম বিভাগে ২০১২ সাল থেকে এ পর্যন্ত ১২টি বাঘ দুর্বৃত্তদের হাতে মারা পড়েছে। এর মধ্যে পর্ব সুন্দরবনে চারটি এবং পশ্চিম সুন্দরবনে আটটি বাঘ মারা পড়ে। এছাড়া, ২০১২ সালে সাতক্ষীরা রেঞ্জের দোবেকি ফরেস্ট ক্যাম্প এলাকায় একটি এবং কৈখালী ক্যাম্পের মাদার নদীর চরে আরও একটি বাঘ বার্ধক্যজনিত কারণে মারা যায়। তবে এ ঘটনার পর বনে এখন কয়টি বাঘ রয়েছে তার তথ্য দিতে পারেনি বনবিভাগ।

বাঘের আক্রমণে সুন্দরবন উপকূলের বিভিন্ন এলাকায় অসংখ্য গবাদি পশুসহ মানুষ মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ২০১২ সাল থেকে এ পর্যন্ত পূর্ব সুন্দরবনের লাউলোবের বানিশান্তা, মোড়েলগঞ্জ এবং মোংলা উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ২৪টি ছাগল, ৪টি ভেড়া ও ৫টি গরু মারা যায়। এছাড়া, বাঘের আক্রমণে ২০১৭ সালে বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জ উপজেলার বলইবুনিয়া ইউনিয়নের মিজানুর রহমান এবং সাতক্ষীরার শ্যামনগর এলাকার রুহুল আমীন নামে দুই ব্যক্তি নিহত হন। মারাত্মক জখম হন অন্তত ৯ জন।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *