খোশ আমদেদ মাহে রমযান

খোশ আমদেদ মাহে রমযান

আদিল মাহমুদ : আকাশে যখন সিয়ামের চাঁদ ওঠে তখন থেকেই আল্লাহ পাক বান্দার প্রতি বিশেষ দৃষ্টি দেন। রহমতের দৃষ্টিতে দৃষ্টিপাত করেন তিনি মানবকূলের দিকে। মাহে রমজানে আল্লাহ তাআলা এত অধিক রহমত-বরকত নাজিল করেন যে এতে বান্দার কৃত গুনাহ ও পাপ জ্বলে-পুড়ে ছাই হয়ে যায়। এ মাসে আল্লাহর সব সৃষ্টি তাঁর অশেষ রহমতে ধন্য হয়। এ নিয়ামতপূর্ণ মোবারকময় মাসে পরম করুণাময়ের অপার রহমতের দরজা তাঁর বান্দাদের জন্য খুলে যায়।

পুণ্যময় এ মাসের জন্য মুমিনরা বহু আশায় দিন কাটান, আবেগ ও ভালোবাসায় ‘ওয়া বাল্লিগনা রমাজানা’ উচ্চারিত হয় মুখে মুখে। আবেগঘন মোনাজাত করেন তারা। হে আল্লাহ! আপনি রমজান পর্যন্ত হায়াতে বরকত দিন পৃথিবীর সব মুমিনকে। যারা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য মাহে রমজানের পূর্ণ একটি মাস রোজা পালন করে, ইবাদত-বন্দেগিতে নিয়োজিত থাকে, এমন রোজাদার ব্যক্তিরাই দুনিয়া ও আখেরাতে সফলকাম। তারা আল্লাহর কাছ থেকে লাভ করেন অসীম রহমত।

রমজান মাসে প্রাপ্তবয়স্ক, স্বাধীন, জ্ঞানসম্পন্ন সুস্থ-সবল মুসলিম নর-নারীর ওপর রোজা রাখা ফরজ। অবশ্য রোজা পালনে অক্ষম, অসুস্থ, বোধহীন, মুসাফির বা পর্যটক ব্যক্তিদের পরবর্তী সময়ে সুযোগমতো রোজা পালনের সুযোগ দিয়েছে ইসলাম।
আল কুরআনের ভাষায় – ‘তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি রমজান মাসে উপস্থিত হয় সে যেন রোজা রাখে। আর যে ব্যক্তি অসুস্থ হয় অথবা সফরে থাকে সে যেন পরবর্তী দিনগুলোতে তা আদায় করে’ (বাকারা-১৮৬)।

রোজার প্রতিদান সরাসরি মহান আল্লাহ দেবেন। তাই মানুষের আগ্রহও এর প্রতি অনেক। এক হাদিসে আছে- হজরত সাহল ইবনে সাদ (রা.) বর্ণনা করেন, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, বেহেশতে আটটি দরজা রয়েছে। একটি দরজার নাম ‘রাইয়্যান’। রোজাদার ব্যতীত ওই দরজা দিয়ে আর কেউ বেহেশতে প্রবেশ করতে পারবে না। (সহিহ বুখারী ও মুসলিম)।

আল্লাহপাক তার আসামীন গ্রন্থ পবিত্র আল কুরআনকে পাঠালেন যে মাসটিতে সে মাসের নাম রমজান। রমজান মাস কুরআন নাজিলের মাস। যে রাতটিতে কুরআন নাজিল করেছেন, সেই রাত্রির মর্যাদা আল্লাহ পাক এত বেশি গৌরবময় করেছেন, তা অন্য কোন রাত্রির নেই। আল্লাহ বলেনঃ আমি এই কুরআনকে কদরের রাতে নাজিল করেছি, তুমি কি জানো কদরের রাত কী? কদরের রাত সে রাত যে রাত হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। (সূরা কদর: ১-৩)।

রাসূল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি কদরের রাতে ঈমান ও ইহতিসাবের (সাওয়াবের নিয়তে) ইবাদত করবে আল্লাহ তার পূর্বের সকল গোনাহ মাফ করে দিবেন। (বুখারী)।

যে রাতে কুরআন নাজিল করেছেন, সে রাত হাজার মাসের রাতের চেয়েও অধিক উত্তম। পৃথিবীর ইতিহাসে এ রাতের চেয়ে মর্যাদাময় আর কোন রাত নেই। এ রাতের ইবাদত থেকে কেউ বঞ্চিত হলে সে সকল কল্যাণ থেকেই বঞ্চিত হলো। (নাসাঈ ও আহমদ)।
পবিত্র এ মাসের ফজিলত সম্পর্কে অনেক হাদিস আমরা দেখতে পাই। যেমন এক হাদিসে প্রিয় নবী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন, রোজা ছাড়া আদম সন্তানের প্রত্যেকটি কাজই তার নিজের জন্য। তবে রোজা আমার জন্য। আমি নিজেই এর পুরস্কার দেব। রোজা (জাহান্নামের আজাব থেকে বাঁচার জন্য) ঢাল স্বরূপ। তোমাদের কেউ রোজা রেখে অশ্লীল কথাবার্তায় ও ঝগড়া বিবাদে যেন লিপ্ত না হয়। কেউ গালমন্দ বা ঝগড়া বিবাদ করলে শুধু বলবে, আমি রোজাদার। সেই মহান সত্ত্বার কসম যার করতলগত মুহাম্মদের জীবন, আল্লাহর নিকট রোজাদারের মুখের গন্ধ কস্তুরির সুঘ্রান হতেও উম। রোজাদারের খুশির বিষয় দুটি। যখন সে ইফতার করে তখন একবার খুশির কারণ হয়। আর একবার যখন সে তার রবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে রোজার বিনিময় লাভ করবে তখন খুশির কারণ হবে। (সহিহ বুখারী)।

বিখ্যাত হাদিস বিশারদ সাহাবী হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে ও সওয়াবের নিয়তে রমজান মাসের রোজা রাখবে তার পূর্বের গুনাহসমূহ মাফ করে দেওয়া হবে। যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে ও সওয়াবের নিয়তে রমজান মাসের রাত্রিতে এবাদত করবে তার পূর্বের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে। যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে ও সওয়াবের নিয়তে কদরের রাত্রি এবাদতে কাটাবে তার পূর্বের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে। (সহিহ বুখারী ও মুসলিম)।
প্রকৃত ও খাঁটি রোজাদারেরা রমজান মাসে অবগাহন করে এগারো মাসের পুঞ্জীভূত পাপ-পঙ্কিলতা ও কলুষ-কালিমা থেকে পরিশুদ্ধ ও পূতপবিত্র হয়ে যায়। রমজান মাসে পুণ্য ব্যতীত কোনো মুহূর্ত নেই। রমজান মাস হলো ইবাদাতের বসন্তকাল। সেহরি, সালাত, কোরআন তেলাওয়াত, ইফতার, তারাবি, কিয়ামুল লাইলসহ নানা রকম পুণ্যময় আমলেই ডুবে থাকে মুমিন। এজন্যই মাহে রমজানকে বলা হয় পুণ্যের মাস।

আবারও মুসলিম উম্মাহর কাছে রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের অমিয় বার্তা নিয়ে এবং দীর্ঘ এগারোটি মাসের পাপ থেকে মুক্ত হওয়ার অপূর্ব সুযোগ নিয়ে আসছে মাহে রমজান। অতীতে রহমত কুঁড়িয়ে নিতে ব্যর্থ হয়েছি আমরা, তাই এখন রিক্ত হস্ত অর্পণ করেছি প্রভূ তোমার দারে, তুমি রমজানের পরিপূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে আমাদেরকে রমজান পর্যন্ত হায়াত দান করে, রমজানের পরিপূর্ণ ফজিলত দান করে, গোনাহের আধিক্য থেকে কলবের কালচে ভাব দূর করে, রহমতের বারিধারায় সিক্ত হওয়ার সুযোগ দান করুন৷

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *