খোশ আমদেদ মাহে রামাদান
মুফতী তামীমুল ইসলাম ফরিদী ❑ আত্মশুদ্ধি, সংযম ও সিয়াম সাধনার বার্তা নিয়ে বিশ্ব মুসলিমের কাছে ফিরে এসেছে পবিত্র মাহে রামাদান। রহমত, মাগফেরাত ও নাজাতের বার্তা নিয়ে এসেছে এই মাহে রামাদান।
আগামি ২৪ এপ্রিল শুক্রবার দিবাগত সন্ধ্যায় পবিত্র রামাদান মাসের চাঁদ দেখা গেলে শনিবার থেকে দেশবাসী সিয়াম পালন শুরু করবে।ইসলামী বিধান অনুযায়ী হিজরী সনের নবম মাস হলো মাহে রামাদান। সিয়াম এর আভিধানিক অর্থ হচ্ছে বিরত থাকা। আর শরয়ী অর্থ বর্ণনা করে ফতোয়ায় আলমগিরীতে বলা হয়েছে, মুসলিম নর নারীগণ সুবহে সাদেক থেকে সুর্য্যাস্তের পর পর্যন্ত ইবাদতের নিয়তে পানাহার ও যৌনপ্রবৃত্তি থেকে বিরত থাকাই হচ্ছে সিয়াম। হাদিস শরীফে বর্ণিত আছে, মহানবী (সা.) এরশাদ করেছেন, ‘আরবী মাস উনত্রিশ দিনেও হয় বিধায় চাঁদ দেখে সিয়াম শুরু কর এবং চাঁদ দেখে সিয়াম ভঙ্গ কর।’
‘রামাদান’ শব্দটির মধ্যে এ মাসের মহান তাৎপর্য লুকায়িত। রমাদান শব্দটি এসেছে ‘রা,মিম, দ্বোয়াদ’ দিয়ে গঠিত শব্দ থেকে। এর দুটি অর্থ- একটি জ্বালিয়ে দেয়া, পুড়িয়ে দেয়া, অন্যটি হলো মরুদ্যানের আকস্মিক বৃষ্টিপাত হওয়া। শব্দটির প্রথম অর্থ যদি আমরা পর্যালোচনা করি তাহলে এভাবে বলা যায়, রামাদানের সিয়াম সাধনা, ও ইবাদত বন্দেগীর মাধ্যমে মুমিন বান্দা তার চরিত্রের অবাঞ্ছিত দিককে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে নিজেকে একজন খাঁটি বান্দা হিসেবে রূপান্তরিত করে।
ঈমান ও যিকিরের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা মানুষের দিলকে সাফ করেন। নামাযের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা বান্দার দিলে ইবাদতের চাহিদা পয়দা করেন।
একইভাবে দ্বিতীয় অর্থ পর্যালোচনা করলে দেখা যায় মরুদ্যানের আকস্মিক বৃষ্টি যেমন মরুভুমির মানুষের দৈহিক ও আত্মিক প্রশান্তি প্রদানসহ সার্বিক পরিবেশকে সজীব করে তোলে ঠিক তেমনি রামাদানের সিয়াম পালন ও পাপ-পঙ্কিলতায় আকণ্ঠ নিমজ্জিত বান্দার জীবনে রহমতের বারি বয়ে আনে আত্মার পরিশুদ্ধি ঘটায়।
আমার শায়খ ও মুর্শিদ হযরত ফেদায়ে মিল্লাত রাহিমাহুল্লাহুর আজাল্লে খালিফা, রাহবারে হক, শাইখুল হাদীস আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসউদ হাফিজাহুল্লাহ বলতেন যে, ঈমান ও যিকিরের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা মানুষের দিলকে সাফ করেন। নামাযের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা বান্দার দিলে ইবাদতের চাহিদা পয়দা করেন। হজ্বের মাধ্যমে আল্লাহ তা’আলা মানুষকে মু’য়াশারাহ তথা আচার-আচরণ সহী করার তৌফিক দেন। যাকাত আদায়ের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা মানুষের মু’আমালাত তথা লেনদেন সহি করার তৌফিক দেন। আর সিয়াম সাধনার মাধ্যমে আল্লাহ তা’আলা মানুষের মধ্যে এখলাছ ও পরিশুদ্ধতা পয়দা করেন। রমজান সম্পর্কে হযরত ওয়ালা আরো বলতেন,যে প্রত্যেকটা ফল-ফসলের তেমন একেকটা নির্দিষ্ট মৌসুম থাকে। ঠিক তেমনিভাবে মুমিনের জন্য মাহে রামাদান হলো নেকি অর্জনের মৌসুম। তাই একজন মালি ও কৃষক যেমন তার ফল-ফসলের মৌসুমে অধিক লাভবান হওয়ার জন্য বিভিন্ন রকম ভাবে প্রস্তুতি নেয়। ঠিক তেমনি ভাবে একজন মুমিনকেও এই রমজান মাসের রহমত, বরকত, মাগফিরাতের ও নাজাত হাসিলের অভিপ্রায়ে ইবাদত বন্দেগীর পূর্ণপ্রস্তুতি নেওয়া অপরিহার্য।
ইসলামের মূল স্তম্ভ হচ্ছে পাঁচটি। এর মধ্যে অন্যতম এই ‘মাহে রামাদানের রোজা’ তথা সিয়াম সাধনার মাস। এ মাসে সিয়াম পালন করা মুসলমানদের জন্য ফরজ করা হয়েছে এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পবিত্র কোরআনুল করীমে এরশাদ করেছেন- ‘হে ইমানদারগণ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে। যেমনিভাবে তোমাদের পূর্ববর্তীগণের উপর ফরজ করা হয়েছিল। যাতে তোমরা ‘পরহেজগার’ হতে পার।’ (সূরা বাকারা, আয়াত ১৮৩)
আলোচ্য আয়াতের সারমর্ম এটাই যে তাকওয়া কিংবা পরহেজগারিতাই হচ্ছে মাহে রামাদানের আধ্যাত্মিক শিক্ষা। মূলত ‘মুত্তাকি’ বানানোই হচ্ছে সিয়াম সাধনার আসল উদ্দেশ্য। বিশ্ব মুসলিমের কাছে মাহে রামাদানের তাৎপর্য, ফজিলত ও গুরুত্ব অপরিসীম। এ কারণেই এ পবিত্র মাসের সংঙ্গে প্রতিটি মুসলিমে জড়িয়ে আছে অফুরন্ত ভালোবাসা, অবারিত আবেগ ও নিখাদ শ্রদ্ধা।
মাহে রামাদানের কতখানি গুরুত্ব ও তাৎপর্য তা স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা.) হাদিসে পাকের মধ্যে বর্ণনা করেছেন। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘সিয়াম ঢাল স্বরূপ। সূতরাং অশ্লীলতা করবে না এবং মুর্খের মতো কাজ করবে না। যদি কেউ তার (রোজাদারের) সঙ্গে ঝগড়া করতে চায়, তাকে গালি দেয়, তবে সে যেন দুইবার বলে, আমি সিয়াম পালনকারী তথা আমি রোজাদার! আমি রোজাদার। ওই সত্ত্বার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ, অবশ্যই সিয়াম পালনকারির মুখের গন্ধ আল্লাহর নিকট মিশকের ঘ্রাণের চাইতেও উৎকৃষ্ট।’ (বুখারী)
এই রামাদান মাসকে মহানবী (সা.) নিজেই রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস হিসেবে ঘোষণা করেছেন। রমজান মাসের প্রতিটি মুহূর্তই আল্লাহর বিশেষ রহমতে পরিপূর্ণ। ঝরনাধারার মতো আল্লাহর রহমতের বারি রোজাদারদের উপর বর্ষিত হতে থাকে। প্রথম ১০ দিন রহমতে পরিপূর্ণ, দ্বিতীয় ১০ দিন ক্ষমা ও মাগফিরাতে পরিপূর্ণ এবং শেষ ১০ দিন জাহান্নামের শাস্তি থেকে নাজাত ও মুক্তির জন্য নির্ধারিত।
এমাসে শুধু মুসলমানগণ নয়, সকল সৃষ্টিই আল্লাহর খাস রহমত ও বরকত লাভ করে।
এই রমজান মাসে আল্লাহ পাক এতো বেশি রহমত-বরকত নাজিল করেন যাতে বান্দার সকল গুনাহ গুলো মাফ হয়ে যায়। মহান আল্লাহ তার বান্দার জন্য আপন রহমতের দ্বার উন্মুক্ত করে দেন, জান্নাতের আটটি দরজা খুলে দেন। জাহান্নামের সকল দরজা গুলিকে বন্ধ করে দেন। এমাসেই বড় বড় শয়তান ও জিন্নাতদের কে আটকে রাখা হয়। এমাসে শুধু মুসলমানগণ নয়, সকল সৃষ্টিই আল্লাহর খাস রহমত ও বরকত লাভ করে। এমাসেই মানবজাতির মুক্তির একমাত্র সনদ কুরআন করীম অবতীর্ণ হয়। মহান আল্লাহপাক এমাসে বান্দার জন্য লাইলাতুল কদর নামে এমন একটি মোবারক রাত উপহার দিয়েছেন যা এবাদত- বন্দেগীর জন্য হাজার মাসের চেয়েও উত্তম।
রোজা –মূলত আল্লাহ এবং তাঁর বান্দার মধ্যে সেতুবন্ধন করে বান্দাকে মুত্তাকির সর্বোচ্চ আসনে আসীন হতে সর্বতোভাবে সহায়তা করে। আর এটিই রোজার আধ্যাত্মিক আত্মশুদ্ধিময় তাৎপর্য। রামাদানে এই চেতনা ধারণ করে বন্দেগী করলেই কেবল ইহকালীন শান্তি ও পরকালীন মুক্তির রাস্তা সুগম হবে।
মহা বরকত ও কল্যাণময় মাহে রামাদানে বেশি বেশি নফল ইবাদত-বন্দেগি, পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত, দোয়া-দরুদ পাঠ, তওবা-ইস্তেগফার ও রুনাজারির মাধ্যমে দোয়া করা চাই। যারা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য মাহে রামাদানের পূর্ণ একটি মাস সিয়াম পালন করে, ইবাদত-বন্দেগিতে নিয়োজিত থাকে এবং গুনাহ মুক্ত থাকে; এমন ব্যক্তিরা দুনিয়া ও আখেরাতে সফলকাম।
উপসংহার: এবারের রামাদানের সময়টা আমাদের সামনে একটু অন্যরকম। সারা পৃথিবী এই সময়ে এক সঙ্গেই মহামারী ও দুর্যোগের শিকার। এই সময়ে আমাদের সকলকে একাগ্রচিত্তে রহমত বরকত মাগফিরাত ও নাজাতের এই শুভাক্ষণে মহান আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামিনের কাছেই পুরোপুরিভাবে সোপর্দ করতে হবে। খুব বেশি থেকে বেশি দু’য়া রোনাজারির মাধ্যমে আল্লাহর কাছেই ফিরে যেতে হবে। তবেই আমরা আশা রাখতে পারি যে আল্লাহপাক রাব্বুল আলামীন আমাদেরকে মাহে রামাদানের রহমত, বরকত, মাগফিরাত ও নাজাতের মহিমায় মহিমান্বিত করে ভয়াল মহামারী করানো ভাইরাসসহ সকল বালা-মুসিবত থেকে পরিত্রান দিবেন।
পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহ মানুষের প্রতি কোনো অনুগ্রহ উম্মুক্ত করলে কেউ তা বন্ধ করতে পারে না এবং তিনি কিছু বন্ধ করতে চাইলে কেউ তার উন্মুক্তকারী নেই।’ (সূরা আল-ফাতির, আয়াত: ২)
সুতরাং আমাদেরকে মাওলাপাকের কাছেই ফিরতে হবে। তাই আসুন!! আমরা যারা মুমিন মুসলমান দাবিদার পবিত্র মাহে রামাদানে সিয়াম সাধনার মাধ্যমে আত্মিকভাবে নিজেদের গড়ে তুলি। আল্লাহ তাআলা পবিত্র মাহে রামাদানে তাঁর যেই রহমতের দরজা অবারিত করে দিয়েছেন তা যেন আমাদের একনিষ্ঠ্য বন্দেগীর মাধ্যমে কাজে লাগাতে পারি আল্লাহপাক রাব্বুল আলামীন আমাদেরকে সেই তৌফিক দান করেন। আমীন।
লেখক: মুহতামীম ও সুবক্তা


