গর্ভকালীন উচ্চ রক্তচাপ ও করণীয়

গর্ভকালীন উচ্চ রক্তচাপ ও করণীয়

গর্ভকালীন উচ্চ রক্তচাপ ও করণীয়

ডা. রোকসানা হোসেন জেবা

মাতৃত্ব নারী জীবনের এক অনন্য অভিজ্ঞতা। একটি নবজাতকের আগমন পরিবারের কাঠামোটিকেই যেন বদলে দেয়। আর গর্ভবতী মা যে বিরাট শারীরিক – মানসিক পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে যান তার তো তুলনাই হয় না। তার প্রতিটি পরিবর্তন আরো বেশি গুরুত্ব বহন করে এজন্যে যে তা একই সাথে মা ও গর্ভের সন্তান দু’টো জীবনকে প্রভাবিত করে। তাই গর্ভবতী মায়ের যে কোনো স্বাস্থ্য সমস্যায় বিশেষ দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন।

হরমোনজনিত পরিবর্তনের কারণে গর্ভাবস্থার শুরুর দিকে উচ্চরক্ত চাপ স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা বেড়ে যায়। যাদের আগে থেকেই উচ্চ রক্তচাপ আছে এবং ওষুধ সেবন করেন, তাদের সন্তান ধারনের আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করা উচিত। কারণ উচ্চ রক্তচাপের কিছু ওষুধ গর্ভাবস্থায় খাওয়া যায় না। তাই প্রয়োজনে চিকিৎসক আগে থেকেই ওষুধ পরিবর্তন করে দিতে পারেন। সেই সঙ্গে রক্তচাপ স্বাভাবিক আছে কি না এবং উচ্চ রক্তচাপের কারণে কোনো জটিলতা হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত পরীক্ষা করাতে হবে।

একজন গর্ভবতী মায়ের গর্ভকালীন উচ্চ রক্তচাপ বিভিন্ন কারণে হতে পারে। যেমন গর্ভবতীর অতিরিক্ত ওজন, অপর্যাপ্ত শারীরিক পরিশ্রম, ধূমপান বা এলকোহল গ্রহণ ইত্যাদি অস্বাস্থ্যকর অভ্যাস উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়ায়। এছাড়াও প্রথমবার গর্ভধারণের সময় টুইন প্রেগন্যান্সী, কৃত্তিম উপায়ে গর্ভধারণ (টেস্ট টিউব বেবী) বা পারিবারিক উচ্চ রক্তচাপের ইতিহাস থাকলে, ২০ বছরের কম বা ৪০ বছর এর বেশি বয়সে মা হলে উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বেড়ে যায়। তাই গর্ভাবস্থায় নিয়মিত রক্তচাপ পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

গর্ভকালীন উচ্চ রক্তচাপ মায়েদের এক মারাত্মক স্বাস্থ্য সমস্যা। গর্ভকালীন উচ্চ রক্তচাপ গর্ভবতীর শরীরের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ প্রত্যঙ্গের জন্য ক্ষতিকর। এর ফলে গর্ভবতী মা ছাড়াও ঝুঁকির মধ্যে থাকে তার গর্ভস্থ সন্তান। তাই গর্ভবস্থায় উচ্চ রক্তচাপকে একটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। হঠাৎ করে গর্ভবতীর শরীরে পানি আসতে পারে বা শরীর, পা ফুলে যেতে পারে; প্রচ- মাথাব্যথা হওয়া; চোখে ঝাপসা দেখা; উপরের পেটে প্রচ- ব্যথা; মাথা ভারি লাগা বা মাথা ঝিম ঝিম করা; প্র¯্রাব কমে যাওয়া বা গাঢ় রঙের প্র¯্রাব হওয়া; শ্বাসকষ্ট, হার্ট ফেইলর, রক্তক্ষরণ, খিঁচুনি ইত্যাদি হতে পারে উচ্চ রক্তচাপের কারণে। প্রি-একলাম্পসিয়া ও একলাম্পসিয়ার প্রধান কারণ উচ্চ রক্তচাপ। এছাড়াও গর্ভস্থ শিশুর বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে। যে সব মায়েদের ডায়াবেটিস, কিডনি রোগ, থাইরয়েডের সমস্যা আছে তাদের ঝুঁকি অনেক বেশি।

উচ্চ রক্তচাপের ফলে কিডনি, হৃৎপি-, যকৃত এবং মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহ কমে যেতে পারে। গর্ভস্থ পানির পরিমাণ কমে যাওয়া; সময়ের পূর্বে বাচ্চা প্রসব; কম ওজনের শিশু প্রসব; গর্ভের শিশু তার প্রয়োজনীয় পুষ্টি থেকে বঞ্চিত হয়, ফলে গর্ভাবস্থায় শিশুর বৃদ্ধি কমে যাওয়া। গর্ভফুল জরায়ু থেকে পৃথক হয়ে যাবার ফলে গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হয়ে মায়ের মৃত্যু হতে পারে।

গর্ভধারনের পাঁচ মাস অতিক্রম করার পর যদি গর্ভকালীন সিস্টোলিক রক্ত চাপ ১৪০ মি.মি পারদের সমান বা বেশি অথবা ডায়াস্টলিক রক্তচাপ ৯০ মি.মি পারদ-এর সমান বা বেশি হয় তাকে গর্ভকালীন উচ্চ রক্তচাপ বলে। এ অবস্থায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া প্রয়োজন। যথাযথ চিকিৎসার মাধ্যমে উচ্চ রক্তচাপ বা এর থেকে সৃষ্টি ‘প্রি-একলাম্পসিয়া’ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। তবে বাচ্চা ডেলিভারির ৬ সপ্তাহ পর এ উচ্চ রক্তচাপ অনেক ক্ষেত্রে এমনি ভালো হয়ে যায়।

প্রজননক্ষম বয়সের নারীদের প্রায় ১০ ভাগ গর্ভবতী নারী উচ্চ রক্তচাপজনিত নানা সমস্যায় আক্রান্ত হন। বাসায় নিয়মিত প্রেসার মাপার ব্যবস্থা করতে পারলে সবচেয়ে ভালো। আর তা না হলেও নিয়মিত রক্তচাপের ওঠানামা পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে। তবেই সুস্থ থাকবেন গর্ভবতী মা, আর জন্ম দেবেন সুস্থ শিশু।

গর্ভকালীন উচ্চ রক্তচাপকে নীরব ঘাতক বলা হয়। অনেকের ক্ষেত্রে এই রোগ খুব সহজে ধরা যায় না। আবার ধরা পড়ার পর এর সঠিক চিকিৎসা না হলে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে না থাকলে তা অনেক রোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে ভালো উপায় হলো জীবনযাত্রার পরিবর্তন করা। নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ বা ওষুধ গ্রহণের পাশাপাশি নিচের বিষয়গুলো গুরুত্বের সাথে বিচার করা। যেমন : অতিরিক্ত ওজন নিয়ন্ত্রণ করা; নিয়মিত ব্যায়াম করা; ঘুমের পরিমাণ সঠিক হওয়া, রাতে ৮ ঘন্টা এবং দিতে ২ ঘন্টা; অতিরিক্ত মানসিক চাপ এড়িয়ে চলা; ধূমপান থেকে বিরত থাকা। উচ্চ রক্তচাপের রোগীকে খাদ্যের ক্যালরি যথাযথভাবে মেনে চলতে হয়। এ ক্ষেত্রে ফ্যাট বা চর্বিজাতীয় খাদ্য অবশ্যই কম গ্রহণ করতে হবে। চিনি, ভাত, আলু, মিষ্টিসহ শর্করাযুক্ত খাবার কম খেতে হবে।

অন্যদিকে ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিডসমৃদ্ধ খাবার উচ্চ রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করে, যেমন : সামদ্রিক মাছ, জলপাইয়ের তেল, ফুলকপি, বাদাম ইত্যাদি। পটাশিয়ামযুক্ত খাবার উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য অনেক জরুরি। পটাশিয়াম রক্তের সোডিয়ামের মাত্রা যথাযথভাবে বাড়িয়ে রাখতে সহায়তা করে। ডাবের পানি, কলা, টমেটো, গাঢ় সবুজ শসা, সবজি, অ্যাভোকাডো, পালং শাক, মাশরুম, শশা, ব্রকলি, কমলালেবু, মিষ্টি আলু, সালাদ পটাশিয়ামের ভালো উৎস, যা উচ্চ রক্তচাপ রোগীর খাদ্যতালিকায় থাকা খুবই জরুরি। প্রোটিনজাতীয় খাদ্য উচ্চ রক্তচাপ রোধে সহায়ক। মুরগির মাংস, মাছ, ডিম, টক দই, ডাল ইত্যাদি প্রেটিনের ভালো উৎস। গর্ভাবস্থা নিয়মিত ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ খাবার খেতে হবে। দুধ, দই, পনির, কাঁটাযুক্ত ছোট মাছ, শিম, গাজর ইত্যাদিতে ক্যালসিয়াম পাওয়া যায়। উচ্চ রক্তচাপের ক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকরী একটি খাদ্য হলো রসুন। সকালে খালি পেটে এক কোয়া রসুন চিবিয়ে পানি খেলে রক্তচাপ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে থাকে।

মনে রাখতে হবে গর্ভকালীন নিয়মিত চেক-আপ, বিশুদ্ধ পানি, পুষ্টিকর খাবার, নিয়মিত ওষুধ সেবন এবং লাইফস্টাইল পরিবর্তন সম্পর্কে ধারনা রাখতে হবে আগে থেকেই। প্রয়োজনে স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে। ওজন স্বাভাবিক কি খাবার খেতে হবে এবং কতটুকু পরিশ্রম করতে হবে, কতটুকু বিশ্রাম নিতে হবে তাও জানতে হবে। খাবারে বাড়তি লবণ এড়িয়ে চলতে হবে, দুশ্চিন্তা পরিহার করতে হবে। কারণ এগুলো রক্তচাপ বৃদ্ধির একটি অন্যতম কারণ। বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত মেডিটেশন, বা হালকা ব্যায়াম, ভালো ভালো বই পড়া, গান শোনা এবং মুক্তিচিন্তা চর্চা মানকে প্রফুল্ল রাখতে সহায়তা করে।

করোনার এ সময় সব মানুষই উদ্বেগ উৎকষ্ঠার মধ্য দিয়ে দিন অতিবাহিত করছে। গর্ভবতী মায়েরা বেশি বিষন্নতায় ভোগেন। এ সময় হঠাৎ করেই শারীরিক জটিলতা জটিলতা দেখা দিতে পারে। তাদের দিকে বেশি করে নজর দিতে হবে। খুব বেশি সমস্যা না হলে, হাসপাতালে না গিয়ে জরুরি স্বাস্থ্যসেবা ১৬২৬৩ নম্বরে ফোন করে পরামর্শ নেয়া যায়।

করোনা সংক্রমনের মধ্যেও সরকার ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র, স্যাটেলাইট ক্লিনিক এবং কমিউনিটি ক্লিনিকের স্বাস্থ্যকমীগণ জনগণের স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। এছাড়া সরকারি হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ সব পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র খোলা রযেছে। কমিউনিটি ক্লিনিক ও স্বাস্থসেবা কেন্দ্র থেকে বিনামূল্যে ৩০ প্রকারের ঔষধ সরবরাহ করা হচ্ছে। মোবাইল হট লাইনের মাধ্যমেও গর্ভবতী নারীদের বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ প্রদান করা হচ্ছে। সরকারি স্বাস্থ্যসেবা আপনার সাথেই আছে। প্রয়োজন একটু সচেতন হয়ে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে আসা।

লেখক : কলামিস্ট

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *