পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : গাজায় মানবিক সহায়তা পৌঁছাতে কিছু এলাকায় প্রতিদিন ১০ ঘণ্টা হামলায় ‘বিরতি’ দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে ইসরাইলি বাহিনী। কিন্তু এই ঘোষণার পরও ইসরাইলের আগ্রাসনে গাজাজুড়ে কমপক্ষে ৬৩ জন নিহত হয়েছে। আল জাজিরার এক খবরে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
স্থানীয় সময় রোববার ইসরাইলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত মধ্য ও উত্তর গাজার আল-মাওয়াসি, দেইর এল-বালাহ এবং গাজা সিটিতে সামরিক তৎপরতা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখবে। তারা সকাল ৬টা থেকে রাত ১১টার মধ্যে খাদ্য ও চিকিৎসা কনভয়ের জন্য নির্ধারিত সাহায্য করিডোর খোলা রাখার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে।
কিন্তু ‘মানবিক বিরতির’ প্রথম দিনের কয়েক ঘণ্টা পরই ইসরাইলি বিমান হামলা আবার শুরু হয়। দেইর এল-বালাহ থেকে আল জাজিরার হিন্দ খোদারি জানিয়েছেন, গাজা সিটিতে বিমান হামলা চালানো হয়েছে এবং এটি এমন একটি এলাকা যাকে নিরাপদ এলাকা হিসেবে মনোনীত করা হয়েছিল এবং সেখানে ইসরাইলি বাহিনী তাদের সামরিক অভিযান বন্ধ করতে চলেছে। ওই এলাকার ফিলিস্তিনিরা জানিয়েছে, একটি বেকারি টার্গেট করে এই হামলা চালানো হয়েছে। এর আগে আন্তর্জাতিক চাপের কারণে গাজায় ত্রাণ সরবরাহের অনুমতি দেয় ইসরাইল। অবরুদ্ধ এই উপত্যকায় ত্রাণ সরবরাহের অংশ হিসেবে আকাশপথে খাদ্য ও ওষুধ পাঠানোর ঘোষণা দেয় ইসরাইল। পাশাপাশি, অঞ্চলটিতে নির্দিষ্ট মানবিক করিডোর খোলা হবে বলেও জানায় তারা। গাজায় দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতি গভীরতর হওয়ায় বিশ্বব্যাপী সমালোচনার মুখে এমন পদক্ষেপ নিয়েছে তেলআবিব। গত ২ মার্চ যুদ্ধবিরতি আলোচনা ভেঙে পড়ার পর ইসরাইল গাজায় পূর্ণ অবরোধ আরোপ করে। তবে মে মাসের শেষ দিকে সীমিত আকারে ত্রাণ প্রবেশের অনুমতি দেয়।
একদিনে অনাহারে প্রাণ গেল ১৪ ফিলিস্তিনির : ইসরাইলের টানা অবরোধের ফলে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ২৪ ঘণ্টায় আরো অন্তত ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে দুই শিশুও রয়েছে বলে গতকাল সোমবার জানিয়েছে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। খবর আনাদোলু এজেন্সির।
এক বিবৃতিতে মন্ত্রণালয় জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় গাজার বিভিন্ন হাসপাতালে অনাহার ও অপুষ্টিজনিত কারণে নতুন করে ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে দুজন শিশু ক্ষুধায় মারা গেছে। এ সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত গাজায় অনাহারে মারা যাওয়াদের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৪৭ জনে, যার মধ্যে ৮৮ জনই শিশু। ইসরাইল গত ১৮ বছর ধরে গাজা উপত্যকার ওপর অবরোধ আরোপ করে রেখেছে। চলতি বছরের ২ মার্চ থেকে তারা গাজার সব সীমান্তপথ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দিয়েছে, যা মানবিক পরিস্থিতিকে আরো ভয়াবহ করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের যুদ্ধবিরতির আহ্বান উপেক্ষা করে ইসরাইল ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে গাজায় ভয়াবহ আগ্রাসন চালিয়ে যাচ্ছে। এখন পর্যন্ত প্রায় ৬০ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের বেশির ভাগই নারী ও শিশু। টানা বোমাবর্ষণ এবং অবরোধে গাজার অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে গেছে এবং খাবার, পানি ও ওষুধের মারাত্মক সঙ্কট তৈরি হয়েছে।
২০২৩ সালের নভেম্বরে আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালত (আইসিসি) গাজায় যুদ্ধাপরাধ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে। এ ছাড়াও গাজায় গণহত্যার অভিযোগে ইসরাইল বর্তমানে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) বিচারের মুখোমুখি রয়েছে।
গাজা সত্যিকারে খাদ্য সঙ্কটে ভুগছে : ট্রাম্প
গাজায় ইসরাইলি বাহিনীর টানা অভিযান এবং ত্রাণবাহী ট্রাক প্রবেশ করতে না দেয়ায় সেখানে যে অবর্ণনীয় ক্ষুধা সঙ্কট দেখা দিয়েছে, অবশেষে তা স্বীকার করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গতকাল সোমবার ব্রিটেনের স্কটল্যান্ড সফরে গিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। সেখানে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের সাথে বৈঠকের আগে সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময় করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট এবং এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “কিছু দিন আগে টেলিভিশন সংবাদে আমি গাজার একদল শিশুকে দেখলাম। তাদের খুবই ক্ষুধার্ত দেখাচ্ছিল। গাজায় সত্যিকারের খাদ্য সঙ্কট শুরু হয়েছে এবং আপনি একে কোনোভাবেই ভুয়া বলে উড়িয়ে দিতে পারবেন না।”
চলতি মাসের শুরুতে গাজায় দুই মাসের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। সেই প্রস্তাব নিয়ে দুই যুদ্ধরত পক্ষ ইসরাইল ও হামাস নিজেদের মধ্যে আলোচনাও করেছে। কিন্তু গত সপ্তাহে হামাস জানিয়েছে গাজায় সঙ্ঘাত স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে পারে- এমন নিশ্চয়তা না থাকলে কোনো অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি তারা মেনে নেবে না।
ট্রাম্প বলেন, “সবচেয়ে বড় কথা হলো- এটা (গাজায় সঙ্ঘাত) এখন শেষ হওয়া উচিত। হামাসকে শেষ করার জন্য ইসরাইল আরো কঠোর লড়াই করতে পারে, তবে গাজা এখন ভয়াবহ বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে এবং সেখানকার বাসিন্দাদের জন্য খাদ্য ও নিরাপত্তা এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি।”
অনাহারে গাজাবাসীদের মৃত্যু রোধে অবিলম্বে পদক্ষেপের আহ্বান ওবামার
গাজায় চলমান মানবিক সঙ্কটের বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। স্থানীয় সময় সোমবার এক্স-এ (সাবেক টুইটার) দেয়া একটি পোস্টে তিনি ‘প্রতিরোধযোগ্য’ দুর্ভিক্ষ বন্ধে অবিলম্বে পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানান। সূত্র আল-জাজিরা ও আনাদোলু এজেন্সি।
একটি মার্কিন সংবাদমাধ্যমের খবরের বরাত দিয়ে ওবামা লেখেন, যদিও গাজা সঙ্কটের স্থায়ী সমাধানের জন্য সব ইসরাইলি বন্দীর মুক্তি এবং ইসরাইলি সামরিক অভিযান বন্ধ করা আবশ্যক, এই নিবন্ধগুলো নিরীহ মানুষের মৃত্যু রোধে অবিলম্বে পদক্ষেপ নেয়ার প্রয়োজনীয়তাকে আরো স্পষ্ট করে তুলেছে। তিনি আরো বলেন, গাজা উপত্যকার মানুষের কাছে মানবিক সহায়তা পৌঁছাতে দিতে হবে। বেসামরিক মানুষদের কাছ থেকে খাবার ও পানি দূরে রাখার কোনো যুক্তি থাকতে পারে না।
ফিলিস্তিনিদের চিরতরে উচ্ছেদে নতুন পরিকল্পনা ইসরাইলের
ফিলিস্তিনিদের চিরতরে উচ্ছেদের জন্য ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ অধিকৃত পশ্চিম তীরে অবস্থিত মাআলে আদুমিম বসতিতে তিনটি বড় ধরনের বসতি সম্প্রসারণ প্রকল্প অনুমোদন করেছে। আন্তর্জাতিক মিডল ইস্ট মিডিয়া সেন্টারকে উদ্ধৃত করে এই তথ্য জানিয়েছে ফিলিস্তিনি সরকারের অধীনস্থ কলোনাইজেশন অ্যান্ড ওয়াল রেজিস্ট্যান্স কমিশন। এই পরিকল্পনার আওতায় ৩,১০০-র বেশি নতুন আবাসিক ইউনিট নির্মাণের সম্ভাবনা রয়েছে। এর মাধ্যমে মাআলে আদুমিম এবং এর নিকটবর্তী শিল্প অঞ্চল মিশোর আদুমিমের মধ্যে পূর্ণ ভৌগোলিক সংযোগ স্থাপন করা হবে। দুটি এলাকাই জেরুসালেম, জেরিকো এবং জর্দান ভ্যালির মাঝামাঝি অবস্থিত অধিকৃত পশ্চিম তীরের অংশ। কমিশনের প্রধান ও ফিলিস্তিনি সরকারের মন্ত্রী মোইয়াদ শাআবান একে ‘সময়ের বিপরীতে দৌড়’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, এই বসতি সম্প্রসারণ ফিলিস্তিনিদের আশপাশের এলাকাগুলোকে আরো বিচ্ছিন্ন করবে এবং পশ্চিম তীরে ইসরাইলের নিয়ন্ত্রণকে আরো পাকাপোক্ত করার বৃহত্তর কৌশলের অংশ।
চাপ না দেয়া দেশগুলোও গাজা হত্যাকাণ্ডে ইসরাইলের সহযোগী
জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার প্রধান ভলকার তুর্ক বলেছেন, যেসব দেশ ইসরাইলের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে না, তারাও হয়তো গাজা হত্যাকাণ্ডে ‘সহযোগী’। এসব দেশ ইসরাইলকে সহযোগিতা করে থাকতে পারে। আলজাজিরার খবরে এ তথ্য জানানো হয়েছে। জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার প্রধান ভলকার তুর্ক নিউ ইয়র্কে আসন্ন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা বিষয়ক সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীদের গাজায় ‘হত্যাকাণ্ড’ বন্ধ করার জন্য ইসরাইলের ওপর চাপ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, আমরা গাজা এবং পশ্চিম তীরে ভয়াবহ ও হতাশাজনক, অবর্ণনীয় ট্র্যাজেডি দেখছি। আমি বিভিন্ন দেশের সরকারকে এই সম্মেলনের সুযোগ কাজে লাগিয়ে গাজায় হত্যাকাণ্ড স্থায়ীভাবে বন্ধ করার জন্য ইসরাইলি সরকারের ওপর সম্ভাব্য সব চাপ প্রয়োগের জন্য দৃঢ় পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। তিনি বলেন, যেসব দেশ তাদের ক্ষমতা ব্যবহার করতে ব্যর্থ হয় তারা আন্তর্জাতিক অপরাধে জড়িত হতে পারে। ফ্রান্স এবং সৌদি আরবের যৌথ সভাপতিত্বে এই সম্মেলন সোমবার নিউ ইয়র্কে শুরু হবে এবং বুধবার পর্যন্ত চলবে।
যুদ্ধবিরতির প্রথম দিনে গাজায় ১২০ ট্রাক ত্রাণ পৌঁছেছে : ইসরাইল
ইসরাইল সোমবার জানিয়েছে, যুদ্ধে আংশিক বিরতির প্রথম দিনে জাতিসঙ্ঘ ও সহায়তা সংস্থাগুলো গাজা উপত্যকায় ১২০টিরও বেশি ট্রাক ভর্তি খাদ্যসহায়তা বিতরণ করেছে। জেরুসালেম থেকে এএফপি এ খবর জানায়। ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে বেসামরিক বিষয় তত্ত্বাবধানকারী ইসরাইলি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংস্থা কো-অর্ডিনেটর অব গভর্নমেন্ট অ্যাক্টিভিটিজ ইন দ্য টেরিটোরিস (কোগ্যাট) সোমবার এক্স-এ এক পোস্টে জানিয়েছে, জাতিসঙ্ঘ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো ১২০ ট্রাকেরও বেশি ত্রাণ সংগ্রহ এবং বিতরণ করেছে’।


