চট্টগ্রাম প্রতিনিধি ● চট্টগ্রাম বন্দর থেকে বিপুলসংখ্যক পণ্যে চালান খালাস করছে না আমদানিকারকরা। অথচ বন্দরে প্রবেশের ৩০ দিনের মধ্যেই জাহাজ থেকে আমদানিকৃত পণ্য খালাসের নিয়ম রয়েছে। আর বন্দরে প্রবেশের ৪ দিন পর থেকে ওসব পণ্যের জন্য প্রতিদিন বাড়তি মাশুল গুনতে হয়। অথচ বছরের পর বছর ধরে বন্দরে পড়ে রয়েছে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার পণ্য নিয়ে ২ হাজার ৩৩৯টি চালান। শুল্ক গোয়েন্দারা আশঙ্কা সরকারি ছুটি ও বিভিন্ন বন্ধের দিনে কাস্টমস কর্মকর্তাদের অনুপস্থিতির সুযোগে ওসব চালান খালাসের মাধ্যমে আমদানি নিষিদ্ধ পণ্যের পাশাপাশি মিথ্যা ঘোষণায় আনা উচ্চ শুল্কযুক্ত পণ্য খালাস করা হতে পারে। কায়িক পরীক্ষা ছাড়া ওসব চালান খালাস হলে রাষ্ট্রের জন্য হুমকিস্বরূপ পণ্য দেশে প্রবেশ করতে পারে। পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারানোর শঙ্কা তো রয়েছেই। সম্প্রতি বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে চট্টগ্রাম কাস্টমসকে এ বিষয়ে অবহিত করা হয়েছে। কাস্টমস বিভাগ সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সূত্র মতে, চট্টগ্রাম বন্দরে আমদানিকৃত পণ্য জাহাজ থেকে নামার ৩০ দিনের মধ্যে খালাস না করলে বন্দর কর্তৃপক্ষ চালানের যাবতীয় নথি কাস্টমস কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করে। পরবর্তী সময়ে আমদানিকারককে পণ্য খালাসের জন্য ১৫ দিনের সময় বেঁধে দিয়ে চিঠি দেয় কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। ওই সময়ের মধ্যে আমদানিকারক পণ্য খালাস না করলে নিয়ম অনুযায়ী তা নিলামে তোলার প্রক্রিয়া শুরু করতে পারে কাস্টমস। কিন্তু ২০১৩ সাল থেকে চলতি বছরের ৯ মে পর্যন্ত ২ হাজার ৩৩৯টি চালান চট্টগ্রাম বন্দরে পড়ে থাকলেও নিলামের কোনো উদ্যোগ নেয়নি কাস্টমস। বরং গত ঈদে সিংহভাগ কাস্টমস কর্মকর্তা ছুটিতে থাকার সুযোগ কাজে লাগিয়ে ওই ধরনের ৭১টি চালান বন্দর থেকে খালাস নিয়ে যান বিভিন্ন আমদানিকারক।
ওই বিষয়ে তদন্তের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হলেও এক বছরেও কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি। ওই সময়ে কাস্টমসে নোটিং (চালান নথিভুক্তকরণ) হওয়ার পর আগামপত্র দাখিল করা হয়নি এমন চালানের সংখ্যা ১ হাজার ৭৮টি। আর আগামপত্র দাখিলের পর খালাস নেয়া হয়নি এমন চালানের সংখ্যা ১ হাজার ২৬১টি। ৪ হাজার কনটেইনারে আটকে থাকা ওসব পণ্যের মূল্য প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা। সাড়ে ৪ বছর ধরে ওসব চালান খালাস না নেয়ায় আমদানিকারকদের এখন কনটেইনার বাবদ প্রতিদিন গড়ে ২৪ ডলার করে বাড়তি মাশুল পরিশোধ করে পণ্য খালাস নিতে হবে। আর তা না হলে ওসব চালান যেকোনো সময়ে নিলামে তুলতে পারবে কাস্টমস। অবশ্য কিছু আমদানিকারক কোনো কারণ ছাড়া দীর্ঘদিন ওসব পণ্য বন্দরে ফেলে রেখে পরবর্তীতে বিপুল পরিমাণ মাশুল পরিশোধ করে খালাস নিচ্ছে। তবে অধিকাংশ সময়েই ওসব চালান খালাস নেয়া হয় কাস্টমসের তদারকির দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে।
সূত্র জানায়, গতবছরের জুলাইয়ের শুরুতে ঈদের সরকারি ছুটি ছিল ৭ দিন। অবশ্য ওই সময়ে কাস্টমস ও বন্দর সচল ছিল। তবে কাস্টমসের সিংহভাগ কর্মকর্তা ছুটিতে ছিলেন। ওই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ৩ বছরের পুরনোসহ ৭১টি চালান খালাস করে নিয়ে যান আমদানিকারকরা। চট্টগ্রাম বন্দর ও শিপিং এজেন্টকে বিপুল পরিমাণ ডেমারেজ চার্জ (বাড়তি মাশুল) পরিশোধ করে ওসব চালান খালাস নেয়ার ঘটনায় ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়। তা নিয়ে এআইআর শাখার সহকারী কমিশনারকে প্রধান করে ৪ সদস্যের তদন্ত কমিটি করা হলেও বর্তমানে তাদের কেউই এখন আর সংশ্লিষ্ট শাখায় কর্মরত নেই। তাদের সবাই চট্টগ্রাম কাস্টমসের এআইআর শাখা থেকে বদলি হয়ে গেছেন। আর গত ঈদে খালাস হওয়া ৭১টি চালানের মধ্যে তিন বছরের পুরনো বেশ কয়েকটি চালান ছিল, যেগুলো খালাস করতে পণ্যের মূল্যের চেয়ে প্রায় সাত গুণ বেশি অর্থ বন্দর ও শিপিং এজেন্টদের ডেমারেজ চার্জ হিসেবে দিতে হয়েছে।
সূত্র আরও জানায়, চট্টগ্রাম বন্দর থেকে খালাস না নেয়া ২ হাজার ৩৩৯টি চালানে বিভিন্ন বাণিজ্যিক পণ্য, শিল্প ও রাসায়নিক পণ্য, যন্ত্রপাতি ও ব্যাগেজ আকারে গৃহস্থালি পণ্যসামগ্রী রয়েছে। ওসব চালানে আমদানি নিষিদ্ধ, আমদানি নিয়ন্ত্রিত অথবা অধিক শুল্কযুক্ত পণ্য কম শুল্কযুক্ত পণ্যের ঘোষণা দিয়ে খালাসের আশঙ্কা রয়েছে। ওই ব্যাপারে গোপন সংবাদও রয়েছে। ওসব চালান দ্রুততর সময়ে কায়িক পরীক্ষার মাধ্যমে রাজস্ব সুরক্ষার উদ্যোগ নেয়ার কথা জানিয়ে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর ছাড়াও একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়েছে। তাতে ওসব চালানে রাষ্ট্রের জন্য হুমকিস্বরূপ পণ্য থাকার আশঙ্কার কথা জানিয়ে নজরদারি বাড়ানোর কথা বলা হয়।
এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম কাস্টমসের কমিশনার এএফএম আবদুল্লাহ খান জানান, আমদানির পর দেশে পণ্যের মূল্য কমে যাওয়া, আমদানির সপক্ষে মূল দলিলাদি উপস্থাপন করতে না পারা, অনিয়ম ধরা পড়ার পর আমদানিকারক কর্তৃক জরিমানা প্রদানে অস্বীকৃতি জানানো অথবা খালাসে ক্লিয়ারেন্স পারমিট (সিপি) না পাওয়ার কারণে ওসব পণ্য আটকে আছে। কোনো কোনো আমদানিকারক অবৈধ পণ্য বা মিথ্যা ঘোষণায় উচ্চ শুল্কযুক্ত পণ্য আমদানি করে তা খালাসের চেষ্টা করতে পারে। তবে সে বিষয়ে নজরদারি বাড়ানোর জন্য সংশ্লিষ্ট শাখায় নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।


