চালকের বিচক্ষণতায় রক্ষা পেল হাতির পাল

চালকের বিচক্ষণতায় রক্ষা পেল হাতির পাল

পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে আসছিল সৈকত এক্সপ্রেস। পথে চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য এলাকায় দেখা মিলে হাতির পাল। হাতি দেখে ট্রেন থামান চালক। হুইসেল দেওয়ার পর রেললাইন থেকে সরে পড়ে হাতির পাল। কিন্তু এরপরই একটি হাতি ট্রেনের বগিতে আক্রমণ শুরু করে। এতে যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। মঙ্গলবার (২২ জুলাই) রাত সাড়ে ১০টার দিকে এই ঘটনা ঘটে।

রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়,মঙ্গলবার রাত পৌনে ৯টার দিকে অন্তত ৫০০ যাত্রী নিয়ে কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা দেয় সৈকত এক্সপ্রেস। ট্রেনটি ১০টা ২৫ মিনিটের দিকে লোহাগাড়ার অভয়ারণ্যে পৌঁছে। এ সময় নিয়মানুযায়ী ওই এলাকায় ট্রেনের গতি ছিল ২০ কিলোমিটার। হঠাৎ চালক রেললাইনে হাতি দেখতে পান। সঙ্গে সঙ্গে তিনি গতি কমানো শুরু করেন। এক পর্যায়ে জরুরি ব্রেকে চাপ দেন। এতে করে হাতির কাছাকাছি পৌঁছালে ট্রেনটি থেমে যায়। সেখানে ৪ থেকে ৫টি হাতও ছিল বলে ধারণা ট্রেন চালকের।

এদিকে মঙ্গলবার রাতের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে ট্রেনচালক আবদুল আউয়াল বলেন, রাত আটটায় কক্সবাজার থেকে ছাড়ার নির্ধারিত সময় ছিল সৈকত এক্সপ্রেসের। কিন্তু ট্রেন ছাড়তে ছাড়তে প্রায় ৫০ মিনিট দেরি হয়ে যায়। ট্রেনে নিয়ে আসার পথে হারবাং-লোহাগাড়া সেকশনের চুনতি অভয়ারণ্যে রেললাইনের ওপর একটি হাতি চোখে পড়ে। ওই এলাকায় চার কিলোমিটার পথে ট্রেনের গতি থাকে ২০ কিলোমিটার।

ট্রেনচালক বলেন, ধীরগতিতে চালানোর কারণে এবং ট্রেনের হেডলাইটের আলোতে রেলপথের ওপর হাতিকে দেখতে পান। কিছুটা বিচলিত হয়ে পড়েছিলেন। তবে দেখার সঙ্গে সঙ্গে ‘ব্রেক’ চাপতে থাকেন। এক পর্যায়ে জরুরি ব্রেকে চাপ দেন। এতে কাজ হয়। হাতি যেখানে অবস্থান করছিলো, তার ঠিক আগে গিয়ে ট্রেন থামে। হাতির কোনো বিপদ না হওয়ায় স্বস্তি পান। এরপর হাতি যাতে সরে যায় এ জন্য ঘনঘন হুইসেল দিতে থাকেন। এতে হাতি নিচে নেমে যায়।

এদিকে হাতি নেমে যাওয়ার পর ১-২ মিনিট পর ট্রেনের গার্ড সাখাওয়াত হোসেন ফোনে করে জানান, হাতির পাল ট্রেনের বগিতে ধাক্কা দিচ্ছে। এ সময় কিছুটা বিচলিত হয়ে পড়েছিলেন আবদুল আউয়াল। তিনি বলেন, এর মধ্যে তাৎক্ষণিকভাবে ট্রেন ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিই। দ্রুত ট্রেন চালিয়ে এলাকা ত্যাগ করি। কক্সবাজার থেকে আসা সৈকত এক্সপ্রেস চট্টগ্রাম স্টেশনে এসে পৌঁছায় রাত একটায়।

ট্রেনচালক আবদুল আউয়াল বলেন, এই রেলপথে কিন্তু আগেও ট্রেনের ধাক্কায় হাতি মারা গিয়েছিল। আবার একই ধরনের ঘটনা ঘটতে যাচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত কিছু হয়নি। পরবর্তী সময়ে আবার ঘটতে পারে। তাই এ ধরনের ঘটনা যাতে না ঘটে, হাতির ক্ষতি না হয়, সে জন্য পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।

এদিকে বিচক্ষণতার সঙ্গে ট্রেন থামানো এবং এতে হাতি রক্ষা পাওয়ায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তাদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন বলে জানান ট্রেনচালক আবদুল আউয়াল।

সৈকত এক্সপ্রেসের যাত্রী সাতকানিয়া উপজেলার কালিয়াইশ ইউনিয়নের বাসিন্দা আবির হাসান বলেন, চুনতি বন্য প্রাণী অভয়ারণ্যে হঠাৎ ট্রেনটি থেমে যায়। ট্রেন থেমে যাওয়ার পর যাত্রীরা রেললাইনের পশ্চিম পাশে ব্যারিয়ারের ভেতর একটি হাতি দেখতে পান। তখন হাতিটি রেললাইনের নিচে ছিল। যাত্রীদের কেউ কেউ হাতি দেখে আতঙ্কে চিৎকার করতে থাকেন। পরে হাতিটি কাছে এসে ট্রেনের একপাশে ধাক্কা দিতে থাকে। এ সময় দৃশ্যটি যাত্রীদের কেউ কেউ নিজেদের মুঠোফোনে ছবি ও ভিডিও ধারণ করেন। পাঁচ মিনিট পর ট্রেনটি চুনতি অভয়ারণ্য এলাকা ত্যাগ করে।

এ বিষয়ে বুধবার সকালে চুনতি বন্য প্রাণী অভয়ারণ্য রেঞ্জ কর্মকর্তা গাজী বাহার উদ্দিন বলেন, অভয়ারণ্য রেঞ্জ কার্যালয়ের উত্তর পাশে রেললাইনের উভয় পাশে থাকা ব্যারিয়ারের ভেতর হাতির পায়ের ছাপ দেখা গেছে। রেঞ্জ কার্যালয়ের ৫০০ মিটার উত্তরে রেললাইনে ব্যারিয়ার নেই। সম্ভবত হাতিটি ওই এলাকা দিয়ে ঢুকে কিছুটা দক্ষিণে চলে আসে। অভয়ারণ্য এলাকায় ২০ কিলোমিটার গতিতে ট্রেন চলাচল করে। চালক দূর থেকে হাতি দেখতে পেয়ে গতি আরও কমিয়ে দেন। হাতির কাছাকাছি এসে ট্রেন থেমে যায়। এরপর হাতিটি ট্রেনে ধাক্কা দেয়। ট্রেন ঘটনাস্থল ত্যাগ করার পর হাতিটি রেঞ্জ কর্মকর্তার কার্যালয়ের সঙ্গে লাগোয়া আন্ডারপাসের লোহার বেষ্টনী ভেঙে পূর্ব দিকে চলে যায়।

প্রসঙ্গত, গত বছরের ১৩ অক্টোবর রাত সাড়ে আটটার দিকে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথের চুনতি বন্য প্রাণী অভয়ারণ্যে কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশে ছেড়ে আসা ঈদ স্পেশাল-১০ ট্রেনের ধাক্কায় একটি বন্য হাতি আহত হয়। দুর্ঘটনার দুই দিন পর ১৫ অক্টোবর বিকেল পৌনে পাঁচটার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হাতিটির মৃত্যু হয়।

Related Articles