পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : মায়ের দিকে তাকিয়ে নিজের জন্য দোয়ার আকুতি জানায় বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় আহত তাসমিয়া। তার মা অশ্রুসিক্ত চোখে বলছেন, তোমার জন্য আমরা সবাই দোয়া করছি। শুধু আমরা নয়, পুরো দেশের মানুষ তোমার জন্য দোয়া করছে। মা তার সন্তানকে সান্ত্বনা দিলেও চোখের পানি কিছুতেই থামাতে পারছেন না। কারণ মুখে সান্ত্বনার কথা বললেও তার ভেতরটা পুড়ে যাচ্ছিল। তাসমিয়ার শরীরের ৩৫ শতাংশ পুড়ে গেছে দুর্ঘটনায়। তাই তাকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়ার সময় এভাবেই স্বজনরা সাহস দিচ্ছিলেন। এই শিশু শিক্ষার্থীর পুরো শরীরজুড়ে ব্যান্ডেজ। হাত-পা নড়াচড়া করতে পারছে না সে। শুধু মুখ খোলা রয়েছে। জোরে কথা বলতে না পারলেও ফিসফিস করে জানাচ্ছিল নিজের কথাগুলো। তাসমিয়া মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের সপ্তম শ্রেণীর শিক্ষার্থী।
অন্য দিকে ২০১৫ সালে বাবা মারা যায় মাইলস্টোন স্কুলের সপ্তম শ্রেণীর শিক্ষার্থী কাব্যের। তার মা অনেক কষ্টে জীবন পার করলেও কাব্যকে ভালো পড়াশোনার জন্য ভর্তি করান মাইলস্টোন স্কুলে। কিন্তু তার সব স্বপ্ন শেষ হয়ে যায় বিমান বিধ্বস্তের ঘটনার মাধ্যমে। সেদিন কাব্য মারাত্মকভাবে দগ্ধ হয়। তার পেট, পিঠ, বাম হাত ও বাম পা আগুনে পুড়ে যায়। ডাক্তাররা জানিয়েছে তার ৩০ শতাংশ শরীর পুড়ে গেছে। তার অবস্থাও আশানুরূপ ভালো নয়। এ ঘটনায় কাব্যের মা একেবারে পাগলপ্রায়। একমাত্র ছেলের এই অবস্থা কিছুতেই মানতে পারছেন না তিনি। ছেলের কথা মনে হলেই কান্নায় ভেঙে পড়েন। সন্তানের সাথে থাকতে না পারলেও ওয়ার্ডের বাইরে অপেক্ষা করছেন তিনি। আর একটু পর পর গিয়ে দেখে আসেন প্রিয় সন্তানকে।
এ ছাড়াও ওয়ার্ডের বাইরে বসে মেয়ের জন্য কাঁদছেন মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের চতুর্থ শ্রেণীর এক শিক্ষার্থীর মা। তিনি জানান, আমার সন্তান স্কুলে থাকার কথা ছিল। কিন্তু আজকে সে হাসপাতালের বেডে কাতরাচ্ছে। সন্তানকে নিয়ে আমাদের অনেক আশা ছিল। একটি দুর্ঘটনা সব কিছু শেষ করে দিয়েছে। ডাক্তাররা বলেছে আমার মেয়ের ১০ শতাংশ পুড়ে গেছে। তবে তার অবস্থা ততটা ভালো না। তাকে দেখলেই আমার ভেতরটা কষ্টে ফেটে যায়। আমার ফুটফুটে মেয়ের চেহারাটা ঝলসে গেছে। কিছুতেই তা মানতে পারছি না। সে আবারো স্কুলে যাক সেটাই চাই, কিন্তু ভালো হতে কত দিন লাগবে আল্লাহ ভালো জানেন।
এসব ঘটনা ছাড়াও পুরো বার্ন ইনস্টিটিউটজুড়ে একই দৃশ্য দেখা গেছে। হাসপাতালের শয্যায় কারো সন্তান, কারো বোন, কারো ভাতিজা, ভাগনে-ভাগনি কিংবা কারো আত্মীয় আগুনে পোড়া শরীর নিয়ে মরণ যন্ত্রণায় ছটফট করছেন। এসব আহতদের অধিকাংশই শিশু। আহতদের যন্ত্রণার চিৎকারে স্বজনরা দিশেহারা হয়ে পড়ছেন। স্বজনদের আহাজারি ছড়িয়ে আছে পুরো হাসপাতালেই। স্বজনদের সাথে কথা বলে জানা যায়, আহতদের অধিকাংশের অবস্থা ভালো নয়। অনেকেরই পুরো শরীর ব্যন্ডেজে মোড়ানো। এতে তারা নড়াচড়া করতে পারছে না। আর এসব পোড়ার যন্ত্রণা সইতে না পেরে তারাও অস্থির হয়ে উঠছে। আমাদেরকে সব সময় ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না। ফলে তাদের পাশে থাকাও সম্ভব হচ্ছে না।
সরেজমিন দেখা যায়, জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের ৫ম তলায় আহতদের স্বজনদের উপস্থিতি ছিল লক্ষ করার মতো। তবে কাউকে বিনা অনুমতি ছাড়া ভেতরে ঢুকতে দেয়া হয় না। দেখা যায়, ওয়ার্ডের দরজায় থাকা আনসার সদস্য কিছুক্ষণ পর পর রোগীর নাম ধরে তার স্বজনদের ডাকছেন। আর তখনই তারা ঢুকতে পারেন। বাকিদের বাইরে অপেক্ষা করতে হয়। তা ছাড়া হাসপাতালের নিচ থেকে পঞ্চমতলা পর্যন্ত প্রতিটি ওয়ার্ডের সামনে কিংবা হাসপাতালের বাইরে উদ্বিগ্ন হয়ে সেই অগ্নিদগ্ধদের মা-বাবা, ভাইবোনসহ স্বজনরা উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় সময় পার করছেন।
আরো দেখা যায়, বিমান দুর্ঘটনায় আহতদের স্বজনদের কারো চোখ ভেজা, কারো চোখ স্তব্ধ, শূন্য। তাদের কেউ কেউকে ওয়ার্ডগুলোর সামনে কান্নায় ভেঙে পড়তে দেখা গেছে। আবার কেউ কেউ মেঝে, বারান্দায়, করিডোরে কিংবা সিঁড়ির মধ্যে অপেক্ষা করছেন। শুয়ে-বসে সময় কাটাচ্ছেন। এই পরিস্থিতিতে তাদের চেহারার দিকে তাকানো যাচ্ছিল না। আবার কেউ কেউ দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলতে বলতে কেঁদে কেঁদে স্বজনদের জানাচ্ছিলেন রোগীদের সবশেষ অবস্থা। প্রত্যেক অভিভাবক ও স্বজনের চোখে-মুখে উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা। কেউ কেউ দরজার ফাঁক দিয়ে একবার চোখ মেলে প্রিয়জনকে দেখার আকুতি জানাচ্ছেন।
হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানান, আহতদের কেউ ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ, আবার কারো ২০ থেকে ৬০ শতাংশ পুড়ে গেছে। আবার অনেকের তার চেয়ে কম বা বেশি দগ্ধ হয়েছে। তাদের মধ্যে অনেকের আবার শ্বাসনালী মারাত্মকভাবে পুড়ে গেছে। ফলে অনেক রোগীর অবস্থা আশঙ্কাজনক। আর যাদের শরীরের বড় অংশ পুড়ে গেছে, তাদের অবস্থা খুবই খারাপ। আমরা আমাদের সাধ্যমতো সেবা দেয়ার চেষ্টা করছি।
বার্ন ইনস্টিটিউটে সংবাদ সম্মেলন : গতকাল বৃহস্পতিবার ব্রিফিংয়ে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক অধ্যাপক ডা: নাসির উদ্দিন বলেন, আমাদের কাছে কিছু ভালো খবর যেমন আছে তেমনি খারাপ খবরও আছে। এই মুহূর্তে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ৪২ জন চিকিৎসাধীন অবস্থায় রয়েছেন। তা ছাড়া আইসিইউতে রয়েছে আটজন। এরমধ্যে খুবই আশঙ্কাজনক অবস্থায় আছে ছয়জন। এই ছয়জনের মধ্যে তিনজন তুলনামূলক কিছুটা ভালো আছে। তা ছাড়া আরো দু’জন নিহত হয়েছেন। এখন পর্যন্ত বার্ন ইনস্টিটিউটে মোট ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া ভালো খবর হলো দুই দিনে আমাদের ১৩ জন রোগীকে কেবিনে স্থানান্তর করতে পেরেছি। তাদের অনেককেই আগামী দুই-এক দিনের মধ্যে হয়তো বাসায় পাঠাতে পারবো।
বিদেশী চিকিৎসকদের বিষয়ে তিনি বলেন, সিঙ্গাপুরের চিকিৎসকদের সাথে আমাদের আলোচনা হয়েছে। মাল্টি ডিসিপ্লিনের সাথে কাজ করা হচ্ছে। তা ছাড়া ভারত থেকে ইতোমধ্যে প্রতিনিধিদল চলে এসেছে। তারা আমাদের বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছেন। চীন থেকে চিকিৎসক দল এখনো আসেনি। আশা করছি আজ রাতের (গতকাল) মধ্যে পাঁচ জনের একটি বিশেষজ্ঞ দল চলে আসবে। তারা যদি কোনো সহযোগিতা করতে চান তাহলে আমরা তা গ্রহণ করব।
অধ্যাপক ডা: নাসির উদ্দিন আরো বলেন, আমাদের এই মুহূর্তে রক্তের কোনো প্রয়োজন নেই। আমাদের কাছে চামড়ার দানের জন্য অনেকে আসছেন কিন্তু আমরা এখন তা নিচ্ছি না। আমাদের সংগ্রহে চামড়া আছে যদি লাগে তাহলে সেখান থেকে ব্যবহার করতে পারবো। অনেকে আমাদের কাছে বিকাশ, নগদ বা বিভিন্নভাবে টাকা পাঠাতে চাচ্ছেন। এসবের কোনো প্রয়োজন নেই, কারণ সরকার থেকে আমাদের সব ধরনের সহায়তা করা হচ্ছে।


