জিতেছি একবার; হেরেছি বহুবার
মাওলানা আরিফ বিল্লাহ ❑ মহিমান্বিত মাস রমজান মাস। এ মাস মুমিনের ফসল ঘরে তোলার মাস। এ মাসে বড় বড় দুটি ইবাদাত হলো দিনের বেলায় রোজা রাখা এবং রাতের বেলায় তারাবীর নামাজ পড়া। সক্ষম হলে খতমে তারাবি নামাজ পড়া। স্বাধীনতার পর দেশের অবস্থা এমন ছিলো যে, পুরো ইউনিয়ন জুড়ে কোন মসজিদে খতমে তারাবির নামাজ হতো না। কদাচ কোন গ্রামে মৌলভী থাকলে তাঁর নেতৃত্বে এলাকার বড় কোন মসজিদে হায়ার করা হাফেজ দিয়ে খতমে তারাবি পড়ানো হতো। এখনতো মাশাআল্লাহ মসজিদে মসজিদে খতমে তারাবির নামাজ হচ্ছে। দেশের প্রায় স্তরেই একজন হাফেজ তৈরী হচ্ছে। মসজিদের পাশাপাশি বাড়ির ওঠোনে বা ছাদের আঙ্গিনাতেও খতমে তারাবির জামাত হচ্ছে।
গ্রামের সরল মুসল্লীরাও খতমে তারাবিতে ধীরে ধীরে অভ্যস্থ হয়ে যাচ্ছেন। অনেকে হাফেজ সাহেবের ওয়াকফের জায়গায় ইমামের আগেই রুকুতে চলে যাচ্ছেন। ইমামের আগে আগে নামাজের রুকন আদায় করলে মুক্তাদির নামাজ অশুদ্ধ হবে এ কথা মুসল্লী নিজেও যানে, তবু সে খুশদিলে আবেগে রুকুতে চলে যাচ্ছে।
তেমনিভাবে আমাদের সম্মানিত ইমাম ও খতিবগণ করোনাউত্তর সময় থেকেই মুসল্লীদের বুঝাতে চেষ্টা করে যাচ্ছেন- ঘরেই থাকুন, ঘরেই নামাজ পড়ুন, নিরাপদে থাকুন। মহামারীর সময় হাদিসের নির্দেশ মেনে চলুন। কিন্তু কে শুনে কার কথা! ঈমান থাকতে মাসজিদ ছাড়বোনা, মরতে হলে মাসজিদেই মরবো; খতিব সাহেবকে শুনতে হচ্ছে এ জাতীয় নানা কথা। অথচ করোনাত্তোর ভয়াল সময়ে আপনি ঘরে মারা গেলেও পাবেন শহীদের মর্যাদা; এটা হাদিসের ভাষা। মাগুরার মতো করোনায় মসজিদ আক্রান্ত হলে নিজের জীবনের সাথে পুরো এলাকাবাসীর জীবন বিপন্ন হবে, এ অধিকার আপনাকে কে দিয়েছে?
সাহাবায়ে কেরামও আক্রান্ত হয়েছিলেন খেলাফতে রাশেদার সময়কালে।
আমাদের দেশে রমজানের এক মাস পূর্বে শাবান মাস থেকেই মসজিদগুলোতে রমজান প্রস্তুতি শুরু হয়ে থাকে। যদিও এবারের পরিস্থিতি একটু ভিন্ন। এবার শাবানের আগ থেকেই শুরু হয়েছে করোনার থাবা। জনস্বার্থে সরকার জারি করলো নিষেধাজ্ঞা। নিষিদ্ধ হলো জনসমাগম, সীমিত হলো মসজিদের গমনাগমন। পৃথিবীতে মহামারী অনেক রূপেই আঘাত হেনেছে। সাহাবায়ে কেরামও আক্রান্ত হয়েছিলেন খেলাফতে রাশেদার সময়কালে।
মহামারীর এই বিভীষিকায় হাদিসে রাসূল সা. এর দিকনির্দেশনা হলো আক্রান্ত এলাকার কোন ব্যক্তি সীমানা ক্রস করবেনা এবং তাদের এলাকায় বহিরাগত কেউ আসবেনা। যেহেতু বাংলাদেশে কোভিড-১৯ কমিনিউটি ট্রান্সমিট হয়ে গেছে ফলে আমরা সকলেই ইনফেক্টেড। তাই জনসমাগম এড়িয়ে চলা, মসজিদ বা ইবাদতগাহে ভিড় কম বা না করাই আমাদের কাম্য। মহামারী সম্পর্কে রাসূল সা. এর দিকদর্শন ছিলো জনস্বার্থে বৃহৎ কল্যাণে। তা পালনে অবশ্যই উম্মাহ এর জন্য ইহলৌকিক ও পরলৌকিক সাফল্য রয়েছে। এক্ষেত্রে উদাসিনতা বা অসর্তকতা উম্মাহর মহাক্ষতি ছাড়া কিছুই বয়ে আনবেনা। মাগুরা জেলায় এক ইমামসহ দুজন মুসল্লী করোনায় আক্রান্ত হওয়ায় আমাদের ধার্মিকতায় কতটা নাড়া দিলো তা আমরা এখনো বুঝে উঠতে পারি নাই। ঈমানের বল দেখিয়ে সরকারী নিষেধাজ্ঞাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করলে জাতীয় জীবনে কী দূরাবস্থা নেমে আসতে পারে তার উপমা পেশ করেছে আক্রান্ত মসজিদের জনগণে।
প্রতিটি মানব হৃদয়ে একটা আবেগ বা ইচ্ছাশক্তি লুক্কায়িত থাকে, যার শক্তিতে সকল কাজ সম্পাদিত হয়।
আমার মুহসিন উস্তাদ ঢাকার এক মসজিদের খতিব। তিনি বলেন; মুসল্লীদের ঈমানী শক্তির কাছে আমাদের ঈমানী জোড় দূর্বল মনে হচ্ছে। মুসল্লীদের সতর্ক করা, মহামারীতে আক্রান্ত না হওয়ার পরামর্শ দেওয়া এবং রাসূল সা. এর নিষেধাজ্ঞা বুঝাতে পারা ব্যর্থ হচ্ছেন সম্মানিত খতিব সাহেবরা। এ এক বিদঘুটে আবেগ! না বুঝানো যায়,না মানানো যায়। আবেগ হলো মনের ইচ্ছা। প্রতিটি মানব হৃদয়ে একটা আবেগ বা ইচ্ছাশক্তি লুক্কায়িত থাকে, যার শক্তিতে সকল কাজ সম্পাদিত হয়। ইচ্ছা না হলে সহজ বিষয়টা ভারী মনে হবে। আবার ইচ্ছা জাগলে দূরহ ব্যাপারেও সাহস সঞ্চারিত হয়ে থাকে। এই ইচ্ছা অনিচ্ছার মহানিয়ন্ত্রা হলেন মহান আল্লাহ। তাঁর ইবাদাতেই বান্দার ইচ্ছার পরিবর্তন ঘটে। হযরত ওমর রা. রাগের আবেগে উদ্বেলিত হয়ে পণ করেছিলেন মুহাম্মদ সা. কে হত্যা করবে। কিন্তু আল্লাহ তার আবেগের মোড় ঘুড়িয়ে দিলেন কোরআনের ছন্দে। হেদায়েতের সুরা পানকরে হযরত ওমর রা. নিজেকে সাজিয়ে নিলেন কোরআনের বর্ণে। আত্মার সুপ্ত এই আবেগ এমন এক শক্তি যা মানুষকে সৎ কিংবা অসৎ পথে পরিচালিত করতে পারে।
আবেগহীন জাতি সমাজের উন্নয়নকে স্থবির করে রাখে। আবার অতি আবেগপ্রাণ জাতি সমাজের ক্ষতিও ডেকে আনে। মৌলিকভাবে মানুষের জীবন আবেগ ও ভাবাবেগে ঘূর্ণন হতে থাকে। হরমুনের ক্ষার কমবেশি হলে মানবহৃদয়ে আবেগের জোয়াড়-ভাটা নামে, চিকিৎসা বিজ্ঞান এমনটাই বলে থাকে। ইসলামেও রাসূল সা. আবেগের দিকনির্দেশনা দিয়েছেন, এবং সাহাবায়ে কেরাম রাযি. আনহুমকে শিক্ষা দিয়েছেন। কোরআনুল কারীমে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘আল্লাহ কোন জাতির অবস্থা উন্নত করেন না যতক্ষণ না তারা উন্নতির ইচ্ছা না করে।’ (সূরা রাদ: ১১)
‘আর যারা সচেষ্ট হয় কোন বিষয়ে আমি অবশ্যই তাদেরকে পথ প্রদর্শন করি।’ (সূরা রুম: ৬৯)
হাদিসে রাসূলে আরাবি সা. বলেন, ‘কোন ব্যক্তি পূর্ণমুমিন হতে পারবেনা যতক্ষণা সে নিজের সম্পদ-সন্তান এমনকি নিজের জীবন থেকেও আমাকে ভালোনাবাসবে।’ (সহীহ বুখারী) সুনিয়ন্ত্রিত আবেগ সুন্দর চরিত্রের আয়না স্বরুপ। আবেগকে বেঁধে রাখার মানদন্ড হলো আদর্শ। আর আদর্শের মডেল হলেন মুহাম্মদ সা.। আল্লাহ তা‘য়ালা ইরশাদ করেন, ‘তোমাদের জন্য রয়েছে রাসূল সা. এর মাঝে উত্তম আদর্শ।’ (সূরা আহকাফ: ২১)
আমাদের আখলাক দিয়ে ইসলামের প্রসার ঘটাতে পারিনি, কারণ ধর্মের ক্ষেত্রে আমাদের আমলের চেয়ে আবেগের ঠায় বেশি।
উম্মতের রাহনুমা হযরত সাহাবায়ে কেরাম নিজেদের আবেগকে পরিচালিত করেছেন আদর্শ দিয়ে। রাগ ও ভাবকে নিয়ন্ত্রণ করেছেন রাসূল সা. এর বাতলানো পথ ও মতে। তাঁরাও জীবন বিলিয়েছেন বিভিন্ন যুদ্ধে, শহীদ হয়েছেন নানা ভাবে। হুদায়বিয়ার সন্ধিতে হযরত ওমর রা. এর মতো ব্যক্তিকেও সংবরণ করতে হয়েছে নিজের জোস বা আবেগ কে। হযরত বিলাল রা. আবেগকে সাজিয়েছিলেন তাওহিদের মলাট দিয়ে। শত নির্যাতনেও তাওহিদের আবেগকে উঁচু রেখেছেন নিজের জীবনকে বিপন্ন করে। কিন্তু আমরা! ঈমানের জোড় দেখিয়ে, সস্তা আবেগ জড়িয়ে ইসলামের অপব্যাখ্যা দিচ্ছি হরহামেশা। মাগুরার মতো নিজেরাই নিজেদের জীবনকে দূর্বিষহ করে তুলছি। হাদিসে রাসূল সা. বলেছেন, মুমিনের পা এক গর্তে দু‘বার পড়ে না। অথচ আমরা বারবার পা ফসকেছি, আমরা ধর্মীয় আবেগের মুযাহারা করেছি বহুবার কিন্তু ইসলামকে বৃক্ষের শিখরে তুলতে পারিনি। শেকড়েই বেঁধে রেখেছি। আমাদের আখলাক দিয়ে ইসলামের প্রসার ঘটাতে পারিনি, কারণ ধর্মের ক্ষেত্রে আমাদের আমলের চেয়ে আবেগের ঠায় বেশি।
সততার মাপকাঠি সাহাবায়ে কেরাম রা. জযবা ও প্রেরণা কিংবা ভাব ও আবেগ ছিলো সমান্তরাল। তাঁরা ঈমাণের জযবা বাস্তবায়ন করেছেন আমলের কষ্টিপাথরে। অথচ আমরা আমলে অবহেলা করছি ঈমানের বলে বলিয়ান হয়ে। মানুষকে জযবার পথে উদ্বুদ্ধ করছি নিজেরা আমলি না হয়ে। মাঠ -ময়দান না পেয়ে হুংকারের ঝংকার তুলছি লাইভে এসে। ইসলাম একটি কর্মমূখি ধর্ম। যার কর্ম নাই, ইসলামে তার কোন ওজন নাই।
ভৌগলিক অবস্থানে আমরা যে স্থানে বাস করি তার নাম বাংলাদেশ। এদেশের মাঠে-ঘাটে বিচরণ করি বলে আমরা বাঙালি। বাঙালি ধর্মে যেমন ভীরু কর্মেও তারা হিরু। তার প্রমাণ ঊনিশ একাত্তর। নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে দেশ স্বাধীন করেছে কর্মের ঔরসে। এই বাঙালি একবারই জিতেছে। হেরেছে বহুবার। একাত্তরের পর বাঙালি কর্মে নিষ্কর্মা হয়ে প্রবাদ বনে গেছেন ‘আমি বাঙালি জিতিতে জিতিতে হেরে গেছি।’ স্বাধীনতা উত্তর পঞ্চাশের সময়ে এসে বাঙালি কর্মের স্পৃহাকে পাশ কাটিয়ে বিশ্বাস জিন্দাবাদের স্লোগান তুলছে। বাঙালির সাহস অমিত । ইচ্ছা করলে বাঙালি জয় ছিনিয়ে আনতে পারে যে কোন সমরযুদ্ধে। এই বিশ্বাসে আমরা বহুবার হুংকার শুনেছি। রাজনীতিবিদ দিয়েছেন মাঠে, আল্লাহ ওয়ালারা দিয়েছেন হুজরাতে বসে। ‘আবার যুদ্ধ হবে’ গজলও শুনেছি । যুদ্ধ আর বাঁধে না, জেতাও হয়না। কারণ আমাদের মাঝে আমলের চেয়ে আবেগের টগবগ বেশি। ফলে শাপলায় হেরেছি, নাসিরনগরে ক্ষুন্ন হয়েছি। ভোলায় দু‘জন শহিদ হয়েছি। ধর্মীয় জ্ঞান আহরণ করেছি বটে বাঙালির স্বভাবটা ছাড়তে পাড়িনি। দ্রুত ঘুমিয়েছি, জেগেই বলেছি- পাঞ্জেরী! রাত পোহাতে কত দেরি!
বর্তমানে ধর্মের বিধান অনুযায়ী আমলের প্রভাব না থাকায় অতি ধার্মিকতা আমাদের জীবনাচারকে প্রশ্ন বিদ্ধ করে তুলছে। তাই আমাদের পণ হোক আমলের। আমাদের দিন শুরু হোক আবেগ ঝেড়ে ফজরের সালাত দিয়ে। ক্বারীর কণ্ঠে না মজে এই রমজানে কোরআন তেলাওয়াত করে। করোনার এই বিপদসংকুল সময়ে রাসুল সা.এর সুন্নাত পালন করে। জিদের বসে মসজিদে ভিড় না করে নির্জনে ঘরের কোনে ইবাদতে মশগুল থেকে।
লেখক: শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক


