এক পা এগিয়ে । আমিনুল ইসলাম কাসেমী
জীবন সায়াহ্নে স্বজনদের রাক্ষুসীরূপ
মানুষের জীবনের অন্তিম সময়গুলো অনেক ব্যাথাতুর। বেদনাদায়ক। যে সময়ে মানুষকে পরনির্ভরশীল হয়ে থাকতে হয়। নিজের চলার সক্ষমতা হারিয়ে অন্যের কাঁধে ভর করে চলতে হয়। আর এটাই চলে আসছে পৃথিবীর শুরু লগ্ন থেকে। জাতি ধর্ম- বর্ণ, সব সেক্টরে চলে আসছে এই প্রথা বা নিয়ম। কোন ধর্ম বা বর্ণের কেউ কিন্তু খালি নেই এই সমস্যা থেকে।
আগে সমাজের জাহেল ফ্যামিলীতে এটার এক বড় সমস্যা দেখা যেত। সাধারণত দুনিয়াবী শিক্ষায় শিক্ষিত ছেলে- মেয়েরা বৃদ্ধ বাবা- মায়ের সাথে অমানবিক আচরণ করতেন। বৃদ্ধ বাবা – মাকে খেদমত করতে অনিহা প্রকাশ করত। তাদেরকে পরিবার থেকে বের করে ভিন্ন জায়গায় বসবাসের ব্যবস্হা করা হত। কাউকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠায়ে দিতেন। কাউকে কোন প্রকার ব্যবস্থা না করে রাস্তায় বা জঙ্গলে ফেলে রাখেন। যে সব অমানবিক চিত্রগুলো বারবার আমাদের সামনে আজো ভেসে ওঠে। বিষয়টা লোমহর্ষক, বেদনাদায়ক, যা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
আরো বেশী স্পর্শকাতর বিষয় হলো, জীবনের এই শেষ সময়গুলোতে স্বজনদের অনিহার পাত্র বা বোঝা হয়ে দাঁড়ানোর পাশাপাশি নিজের আপনজনদের রাক্ষুসী চেহারা বৃদ্ধ মানুষটিকে বেশী কাবু করে ফেলে। যেহেতু অন্তিম সময়গুলোতে স্বজনদের উপর নির্ভর করে চলতে হয়, তাইতো সে সময়ে তারা যদি রাক্ষুসী ভাব করে, তখন নিরুপায় হয়ে সব কিছু মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় থাকে না।
এজন্য শেষ সময়ে ছেলেরা বা মেয়েরা বৃদ্ধকে বেকায়দায় ফেলে জমি লিখে নেয়। অন্য কাউকে বঞ্চিত করে যারা সব সময় আশে পাশে থাকে, তারা সব সম্পদ লিখে নিয়ে অন্যদের মাহরুম করে থাকে।
ঠিক জাহেল পরিবারদের কায়দা বা সিষ্টেম আমাদের আলেম ফ্যামিলীর ভিতরে ঢুকে পড়েছে। ওরা যেমন বৃদ্ধ বাবাকে রাক্ষুসী চেহারা দেখায়ে জমি-জমা লিখে নেয়, আমাদের হুজুরদের দের ছেলেরা ওসব থেকেও জঘন্যতম কাজের অবতারণা ঘটায়ে চলেছে। রাতারাতি বহু অনৈতিক কাজের জন্ম তারা দিয়ে থাকেন। একটা সমাজ, একটা জাতিকে মিসগাইড করে ফেলে। বাবাকে কৌশলে বিভিন্ন কায়দা অবলম্বন করে বেচা- কেনা করে ফেলে।
আমরা বর্তমানে হাটহাজারী হুজুরকে কেন্দ্র করে অনেক কিছু দেখছি। সাহেবজাদার দৌরাত্মা চোখে পড়ছে সকলের। বিশেষ করে ফেসবুক , ইন্টারনেটের মাধ্যমে খুব সহজে কুকীর্তিগুলো ভেসে ওঠছে। কিন্তু যখন ফেসবুক, ইন্টারনেট ছিল না, তখন কিন্তু এর থেকে ন্যাক্কারজনক অধ্যায়ের সুচনা হয়েছিল। পুরো জাতি তখন ছি: ছি: করেছিল, সে ইতিহাস সকলের জানা আছে।
এখনকার সাহেবজাদা তো শতগুণে ভাল। কিন্তু হাফেজ্জী হুজুর রহঃ এবং শায়খুল হাদীস আজিজুল হক রহ. এর স্বজনরা যে রাক্ষুসী চেহারা তখন দেখায়েছিল, সে পর্যায়ে আনাস মাদানীরা এখনো যেতে পারেন নি। বরং পিছনে পড়ে আছে। হাফেজ্জী হুজুর রহ, এর তাওবার আন্দোলনকে ধ্বংস করে ছিল, তাঁর স্বজনরা। হাফেজ্জীর বার্ধ্যকে পুঁজি করে, আন্দোলন সংগ্রামকে, যার যা ইচ্ছা তাই করেছিল। এদেশের মানুষের প্রাণের সংগঠনকে ধ্বংসের দ্বার প্রান্তে তারাই নিয়েছিল।
আল্লামা আজিজুল হক রহ, যখন অসুস্থ, তাঁর সেই দুর্বলতাকে পুঁজি করে তাঁর সন্তানেরা যা করেছিল, সেটা যদি ফেসবুকের জামানা হত, তাহলে সাধারণ জনতার রোষনলে পড়ে তাদের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যেত। অবশ্য সে আছর কিছু তাদের দলের উপর পড়েছিল, যার কারণে তাদের সংগঠন আজো কোঁমর সোজা করে দাঁড়াতে পারেনি।
দেশব্যাপি সাধারণ মানুষ এবং আলেমগণ ছি: ছি: করেছিল তখন। কেউ সেটাকে ভাল চোখে দেখেনি। আন্দোলন-সংগ্রামকে ভিন্ন খাতে নেওয়া, যাদের সাথে জোট করার চিন্তা কেউ করেন নি, তাদের সাথে জোটবদ্ধ হলেন। রাহমানিয়া মাদ্রাসাকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ত্যাগী আলেমদের বের করে দেওয়াসহ নানান অনৈতিক কাজ- কারবার তখন জাতির সামনে প্রকাশ পেয়েছিল।
কত যে আলেম- উলামা আজীমপুরের বাসা থেকে ফেরত আসতে হয়েছে। হুজুরের সাথে সাক্ষাত করতে দেওয়া হয়নি। হুজৃর সাক্ষাত দিতে চেয়েছেন,কিন্তু স্বজনদের রাক্ষুসীচোখে সব ভেস্তে গেছে।
যাইহোক, সেসব কু-কীর্তিগুলো বয়ান করা মাকসাদ নয়। বর্তমানে আল্লামা আহমাদ শফি হুজুরকে নিয়ে পক্ষ- বিপক্ষ যা কিছু হচ্ছে, এর কোনটা কাম্য নয়। হুজুরের প্রতি রাক্ষুসীচোখ দেখায়ে যেমন এদেশের আলেম সমাজকে মিসগাইড করা ঠিক নয়, তেমনী তাঁকে মা’যুর আখ্যা দিয়ে নিজেদের স্বার্থ আদায় করাও সমিচীন হবে না।
আল্লামা আহমাদ শফি সাহেব মা’যুর ঠিক আছে, তবে পরিপুর্ণ সুস্থ কে? আমরা আরেকজনকে নিয়ে নাচানাচি করছি, তিনি কতদুর ফিট?
তবে কথা হল, বার্ধ্যক্যে যিনি পৌছাবেন, তিনি আমাদের ছারে তাজ। তাঁকে অবজ্ঞা,অবহেলা আমরা আশা করি না। সকলকেই ভক্তি ভালবাসার নজরে দেখা চাই। যতদিন বেঁচে থাকবেন, তাঁকে আমরা সম্মান দেখাব। ভালবাসব। তাইবলে তাঁদের অসুস্থতা পুঁজি করে আমরা জাতিকে ভুল মেসেজ দিব না। জাতির এই ক্রান্তিকালে আমরা তাদের আমানত মনে করব। জাতির কল্যাণে মুরুব্বীদের অপব্যহার করা মোটেও কামনা করি না।
যেরূপ হাফেজ্জী হুজুর রহ, এবং শায়খুল হাদীস রহ, কে রাক্ষুসী চোখ দেখানো হয়েছিল। তাঁদের স্বজনদের সে লালচক্ষুতে অনেক এলোমেলো হয়েছিল এদেশে। ঐ রকম রাক্ষুসীচোখ যেন আর কোন মুরুব্বীদের উপর না পড়ে। আমাদের মুরুব্বীগণ হেফাজতে থাকুন।ভাল থাকুন। আল্লাহ তাঁদের দুনিয়া-আখেরাতে কল্যাণ দান করুন। আমিন।
শিক্ষক ও কলামিস্ট


