ত্রি-রত্ন  সমাচার  আর আমার ক্ষত-বিক্ষত হৃদয়

ত্রি-রত্ন  সমাচার  আর আমার ক্ষত-বিক্ষত হৃদয়

ত্রি-রত্ন  সমাচার  আর আমার ক্ষত-বিক্ষত হৃদয়

মাওলানা আমিনুল ইসলাম : আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসউদ, আল্লামা আবুল ফাতাহ ইয়াহইয়া রহ, মুফতি আব্দুল মালেক তিন জনই দেশ সেরা খ্যাতিমান আলেম।  তবে এই তিনজনের মধ্যে আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসউদ সাহেব বাকি দুজন থেকে সিনিয়র। আবুল ফাতাহ সাহেব তো সরাসরি  ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ সাহেবের ছাত্র। তাও আবার যেন তেন ছাত্র নয়, একদম অনেক কাছের। আল্লামা মাসউদের গন্ধ পাওয়া যেত আবুল ফাতাহ সাহেবের কাছ থেকে। মনে হত উস্তাদের সব কিছু তিনি ধারন করে নিয়েছেন। আবুল ফাতাহ সাহেবের ক্লাস ছিল ফরীদ সাহেবের মত, তার লিখনী, তার বক্তৃতা, তার উপস্হাপনা সব কিছুতেই প্রিয় উস্তাদ ফরীদ উদ্দীন মাসউদকে নকল করে ছিলেন।

আল্লামা মাসউদের কাছে যেমন ছাত্ররা পড়ার পাগল ছিল,  ফরীদ মাসউদ সাহেবের টিচিং ক্যাপাসিটি, অধ্যাপনার নিয়ম- নীতি সব কিছু আয়ত্বে এনে ছিলেন আবুল ফাতাহ সাহেব।

আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ সাহেব সেই স্বাধীনতার পর থেকে  এই বাংলাদেশে একজন উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব। বিশেষ করে আলেম এবং শিক্ষিত মহলে ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ সাহেবের সুনাম সুখ্যাতি। সেই সময়ে নবীন আলেম এবং প্রতিভা সম্পন্ন ব্যক্তি হিসেবে সবার কাছে সমীহ পেতেন। বয়সে তখন ছোট হলেও ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ সাহেবের তুখোড় মেধা এবং তাঁর লিখনী সর্বমহলে প্রশংসিত ছিল।

দারুল উলুম দেওবন্দের এযাবতকালের মেধাবী ছাত্রদের অন্যতম তিনি একজন। যার সুনাম দারুল উলুমে আজো রয়েছে। দারুল উলুম দেওবন্দের উস্তাদগণ ফরীদ সাহেবকে দিয়ে দৃষ্টান্ত দিতেন। ” পড়তে পড়তে তুম ফরীদ বান যাও” এটা তো দারুল উলুমের উস্তাদদের কথা।
এই বাংলাদেশের আলেম সমাজের মধ্যে ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ একজন প্রতিভাবান আলেম হিসেবে পরিচিত। আবার তাঁর লিখনী ,  তাঁর গবেষণা আলেম সমাজ ছাড়াও দেশের শিক্ষিত সমাজের কাছে খুবই জনপ্রিয়।

আবুল ফাতাহ সাহেব ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ সাহেবের খাছ একজন শাগরেদ। উস্তাদের সোহবতে থেকে তিনিও দেশব্যাপী আলো ছড়িয়ে ছিলেন। আবুল ফাতাহ সাহেব হুবহু উস্তাদের মত কলম চালাতেন। তাঁর ও গবেষণামূলক বহু লিখনী। যেটা বাংলাদেশের ঘরে ঘরে পৌছে গিয়েছে। বিশেষ করে কওমী অঙ্গনের প্রতিটি ছাত্র তাকে চিনত তাঁর লিখনীর কারণে।” দেওবন্দ আন্দোলন ঐতিহ্য অবদান” আবার ইসলামী অর্থনীতির উপর লিখিত বই। এমনিভাবে বহু গবেষণামূলক লিখনী আছে আবুল ফাতাহ সাহেবের।

আমি মনে করি, আবুল ফাতাহ সাহেবের এই পরিচিতি, এই গবেষণা, এই লিখনীতে আল্লামা মাসঊদ সাহেবের বড় অবদান। এবং যেটা তিনি স্বীকারও করতেন। আল্লামা মাসঊদ-এর মত মহান ব্যক্তির সংস্পর্শে আবুল ফাতাহ সাহেব এর সুনাম সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল  দেশ থেকে দেশান্তরে।

আশির দশক,  নব্বই দশক, দুই হাজার পরবর্তী সময়গুলোতে আল্লামা মাসঊদ সাহেব এবং তাঁর  বিশেষ বিশেষ শাগরেদ, যেমন আল্লামা আবুল ফাতাহ সাহেব, আল্লামা ইসহাক ফরিদী, আল্লামা ড, মুশতাক আহমাদ, আল্লামা হেমায়েত উদ্দীন, আল্লামা আবুল বাশার মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম -এসব মহারথীগণ এর একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল বলা যায় ইলমী ময়দানে।  এ সমস্ত ব্যক্তিদের লিখনী জাতিকে অনেক অনেক উপকৃত করেছে তাতে কোন সন্দেহ নেই।  এর সব কিছুতে প্রিয় শায়েখ আল্লামা মাসঊদের নেক তাওয়াজ্জুহ রয়েছে, যার দ্বারা তারা অনেক অগ্রসর হতে পেরেছে।

মুফতি আব্দুল মালেক সাহেব দামাত বারাকাতুহুম তিনি মফস্বলে লেখাপড়া করেছেন। মেশকাত জামাত পর্যন্ত পড়ালেখার পরে তিনি পাকিস্তানে পাড়ি জমান, সেখানে আল্লামা তকী উসমানী-এর তত্ত্বাবধানে নিজেকে যোগ্য করে গড়ে তুলেছিলেন। পাকিস্তান থেকে চলে যান সৌদি আরবে। সেখানে বড় শায়েখের অধীনে নিজেকে আরো পোক্ত করেন।

আব্দুল মালেক সাহেব একজন মেধাবী মানুষ। তিনি পাকিস্তান এবং সৌদি আরবের শায়েখদের কাছে অনেক মেধার পরিচয় দিয়েছেন। যার কারণে আল্লামা তকী ওসমানী এবং শায়েখ আবু গোদ্দা থেকে অনেক প্রশংসা কুড়িয়েছেন।

১৯৯৬ সালে মুফতি আব্দুল মালেক সাহেব ঢাকায় আসেন। তাঁর মারকাজুদ দাওয়া প্রতিষ্ঠান করেন। সেই থেকে অদ্যাবধি তিনি তাঁর মিশন অব্যাহত রেখেছেন। আমাদের দেশের উল্লেখযোগ্য একজন ফকীহ তিনি।
মোট কথা, আল্লামা ফরীদ  উদ্দীন মাসঊদ,  আল্লামা আবুল ফাতাহ, মুফতি আব্দুল মালেক সাহেব সকলেই  তারা নিজ নিজ জায়গায় বড় শায়েখ।  সকলেই  অনেক সন্মানী ব্যক্তি। বিশেষ করে আল্লামা মাসঊদ সাহেব তো এখন বিশ্ববিখ্যাত ব্যক্তিত্ব।

যাইহোক, সকলেই যোগ্য ব্যক্তিত্ব। যাকে বলে ত্রি-রত্ন। তিনজনই আমাদের ওলামায়ে দেওবন্দের অহংকার।

আল্লামা আবুল ফাতাহ সাহেব বছর দুই আগে ইন্তেকাল করেছেন। যেটা এ জাতির জন্য অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে।  তাঁর ইন্তেকালের পরে কদিন আগে আবুল ফাতাহ সাহেবের নামে একটি স্মারক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। সেই স্মারকে অনেকের লেখা প্রকাশিত হয়েছে। মুফতি আব্দুল আব্দুল মালেক সাহেবেরও একটি লেখা সেখানে স্থান পেয়েছে।

মুফতি আব্দুল মালেক সাহেব মালিবাগ জামেয়ার ছাত্র নন। উস্তাদও নন। আবার আবুল ফাতাহ সাহেবের ক্লাস মেট নন। এমনকি কোন ঘনিষ্ঠ বন্ধুও ছিলেন না। হ্যাঁ, আবুল ফাতাহ সাহেব একজন তুখোড় আলেম, গবেষক, আবার মুফতি আব্দুল মালেক সাহেব  প্রতিভাবান আলেম, সে হিসেবে তাদের পরিচয় ঘটেছিল ছিল।

মুফতি আব্দুল মালেক সাহেব স্মরকের লিখনীতে কিছুটা বে মানান কথা লিখেছেন। যেটা আবুল ফাতাহ সাহেবের উস্তাদ ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ-এর শানের ওপর আঘাত আসে। ফরীদ সাহেবকে তোহমত দেওয়া হয়। আরো কয়েকজন ফরীদ সাহেবের শাগরেদের নাম তিনি টেনে এনেছেন, যেটার কোন প্রয়োজন ছিল না।

মুফতি আব্দুল মালেক সাহেব অবুঝ শিশু নয়।  উঁচু মানের আলেম। তিনি কিন্তু এসব বিষয় না লিখলে পারতেন। এগুলো লিখে নিজেদের মধ্যে বিতণ্ডার সৃষ্টি করাটা বড় দুঃখজনক।

আমরা মুফতি আব্দুল মালেক সাহেব থেকে এসব বিতর্কিত  ও অমার্জিত লিখনী কামনা করি না। শুনি,  তাঁর লিখনী কে যেন সম্পাদনা করে দেয়। হতে পারে। সবার তো  আর ভাষাগত যোগ্যতা সমান নয়। তবে যেই সম্পাদনা করে দিক, তবে দোষটা উনার ওপরে গিয়ে পড়ছে।

এই লেখা নিয়ে আলোচনা – সমালোচনা হচ্ছে খুব বেশী। আব্দুল মালেক সাহেবের এই অসতর্কতামূলক লিখনী পরিহার করা উচিত। কেননা তিনি সামনে এগোচ্ছেন। এখনই যদি বিতর্কিত হয়ে পড়েন, তবে সেটা হবে দুঃখজনক।

আমি নিজেই অনেক কষ্ট পাচ্ছি। কেননা তিনজনই ওলামায়ে দেওবন্দের সন্তান।  বিশেষ করে কলম যেন এভাবে স্লিপ না করে আমাদের। অনেক ক্ষত- বিক্ষত হৃদয়  নিয়ে লিখলাম। আল্লাহ তুমি আমাদের সকল মুরুব্বীকে কবুল কর। আমিন।
লেখক : শিক্ষক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *