পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : থার্টি ফার্স্ট নাইট অর্থাৎ ৩১ ডিসেম্বরের রাত, যাকে অনেকেই নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর রাত হিসেবে উদ্যাপন করে থাকেন। এই উদ্যাপন আধুনিক বিশ্বের একটি বৈশ্বিক সংস্কৃতি হলেও এর ঐতিহাসিক শিকড় রয়েছে রোমান সভ্যতার সঙ্গে। ইসলামের আলোকে এই উৎসব পালন সম্পর্কে বিশদ আলোচনা নিম্নে উপস্থাপন করা হলো।
থার্টি ফার্স্ট নাইটের ঐতিহাসিক পটভূমি
১. জুলিয়ান ক্যালেন্ডার:
প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যের সময় জুলিয়ান ক্যালেন্ডারে ১ জানুয়ারি নতুন বছরের প্রথম দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়। এই দিনটি রোমানদের দ্বিমুখী দেবতা জানুসের (Janus) প্রতি উৎসর্গ করা হতো। জানুস অতীত ও ভবিষ্যতের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হতো।
২. রোমানদের উৎসব:
থার্টি ফার্স্ট নাইটের উৎস রোমানদের সাটার্নালিয়া উৎসব থেকে এসেছে বলে ধারণা করা হয়। এই উৎসবটি শীতকালীন সময়ে দেবতা স্যাটার্ন-এর সম্মানে উদ্যাপন করা হতো। এতে আনন্দ-উল্লাস, ভোজ এবং উপহার বিনিময়ের মাধ্যমে সময় কাটানো হতো।
ইসলামের দৃষ্টিকোণ:
ইসলামে একমাত্র আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো সত্তার প্রতি কোনো কিছু উৎসর্গ করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। এসব উৎসবের মূল ভিত্তি যদি শিরক বা বিজাতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়, তবে তা ইসলামী বিশ্বাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
থার্টি ফার্স্ট নাইটের বর্তমান চিত্র
বর্তমানে থার্টি ফার্স্ট নাইট উদ্যাপন শুধু আনন্দ-উৎসব নয়, বরং এটি অনেক অশালীন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে পালিত হয়। উদাহরণস্বরূপ:
– গান-বাজনা ও অশ্লীলতা
– মদ্যপান এবং নেশাদ্রব্যের ব্যবহার
– আতশবাজি ও উচ্চশব্দে শব্দদূষণ
– জিনা-ব্যভিচার এবং অন্যান্য নৈতিক অবক্ষয়
এই ধরনের কর্মকাণ্ড কেবল ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেই নিষিদ্ধ নয়, বরং সামাজিক এবং নৈতিক মূল্যবোধের বিরুদ্ধেও।
ইসলামের বিধান
১. বিজাতীয় সংস্কৃতির অনুসরণ নিষিদ্ধ:
ইসলামে বিজাতীয় সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:
“যে ব্যক্তি কোনো জাতির অনুকরণ করে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত।”
(সুনানে আবু দাউদ: ৪০৩১)
২. গান-বাজনা ও অশ্লীলতা:
হজরত আবু মালেক আশআরী (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
“আমার উম্মতের মধ্যে এমন কিছু লোক আসবে, যারা ব্যভিচার, রেশম, মদ এবং গান-বাজনাকে হালাল মনে করবে।”
(সহিহ বুখারি: ৫৫৯০)
৩. হারাম কাজকে হালাল মনে করা:
যে ব্যক্তি হারাম কাজকে হালাল মনে করে, তার ঈমান নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:
“তোমরা সত্যকে মিথ্যার সঙ্গে মিশ্রিত করো না এবং জেনে শুনে সত্যকে গোপন করো না।”
(সূরা আল-বাকারা: ৪২)
৪. আতশবাজি ও শব্দদূষণ:
ইসলামে অন্যের কষ্টের কারণ হওয়া নিষিদ্ধ। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
“একজন প্রকৃত মুসলিম সেই ব্যক্তি, যার হাত এবং জিহ্বা থেকে অন্য মুসলিম নিরাপদ থাকে।”
(সহিহ বুখারি: ১০)
ইসলামের নির্দেশনা
১. উৎসব পালনের ইসলামী পদ্ধতি:
ইসলামে উৎসব পালনের জন্য ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা নির্ধারিত আছে। এসব উৎসব সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন ও আনন্দের প্রকাশের মাধ্যম।
২. অশালীনতা থেকে বেঁচে থাকা:
কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:
“তোমরা যিনা-ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না। এটি অশ্লীল কাজ এবং খুবই খারাপ পথ।”**
(সূরা আল-ইসরা: ৩২)
৩. সঠিক পথে থাকার অনুপ্রেরণা:
রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:
“দুনিয়া হলো একজন মুমিনের জন্য পরীক্ষার স্থান এবং কাফেরের জন্য আনন্দের স্থান।”
(মুসলিম: ২৯৫৬)
বর্তমান প্রেক্ষাপটে করণীয়
১. শিক্ষা ও সচেতনতা:
থার্টি ফার্স্ট নাইট উদ্যাপনের পেছনের ইতিহাস এবং এর ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সমাজে সচেতনতা বৃদ্ধি করা।
২. সামাজিক আন্দোলন:
সামাজিক ও ধর্মীয় সংগঠনগুলোকে এই ধরনের সংস্কৃতি বর্জনে ভূমিকা রাখতে হবে।
৩. ইসলামের শিক্ষার প্রচার:
যুবসমাজকে ইসলামের আদর্শ ও সঠিক পথে পরিচালিত করার জন্য পরিবার এবং সমাজকে উদ্যোগী হতে হবে।
থার্টি ফার্স্ট নাইট উদ্যাপন একটি বিজাতীয় সংস্কৃতি, যা ইসলামী বিশ্বাস ও মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এর সঙ্গে যুক্ত অশালীন কর্মকাণ্ড কেবল ধর্মীয় নয়, বরং সামাজিক এবং নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও নিন্দনীয়। মুসলিমদের উচিত এই ধরনের সংস্কৃতি থেকে দূরে থাকা এবং ইসলামের আদর্শ অনুযায়ী নিজেদের জীবন পরিচালনা করা।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিক বুঝ দান করুন এবং ইসলামের সুমহান আদর্শে জীবনযাপন করার তাওফিক দান করুন। আমিন।


