দিশেহারা পঞ্চগড়ের চাষিরা

দিশেহারা পঞ্চগড়ের চাষিরা

পঞ্চগড় প্রতিনিধি : ‘এ্যালাতো বইষ্যাকাল নাহায়। তাহো বইষ্যার মতন জমিলা ডুবে গেইছে। কয়দিন আগত খুব পানি হইছে। জমি খানত পানি লাগেহেনে বাদামলা পচে যাছে। যে কয়ডা আছে, ওইলার তানে উঠাছু। আর কুনও দিন বাদাম করিবানাহু’। এবার এলাকায় বাদাম চাষ কেমন হয়েছে, এমন প্রশ্নের জবাবে হতাশা নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন হিরণ বালা। পঞ্চগড় সদর উপজেলার চাঁনপাড়া গ্রামের বাঘালু বর্ম্মণের স্ত্রী ষাটোর্ধ হিরণ বালা আরও বলেন, ‘ভুট্টা কইল্লে দুইডা পাইসা পানু হয়। এইবার হামারতি পানি লাগে হেনে অনেকলা হাইবিট বাড়ি (খেত) নষ্ট হইচে। মোর মতো সবারে বাদাম গাছ নষ্ট হইচে।

হিরণ বালা স্থানীয় একজন নারী কৃষি শ্রমিক। এবার তিনি প্রতিবেশীর এক বিঘা জমি বর্গা নিয়ে নিজেই বাদাম চাষ করেছেন। কিন্তু অকাল বৃষ্টি তার স্বপ্ন কেড়ে নিয়েছে। খেতের বাদাম খেতেই নষ্ট হয়েছে। হিরণ বালার মতো ওই এলাকার অনেক কৃষকের ফসল খেতেই নষ্ট হয়েছে অকাল বর্ষায়। অসময়ে আকস্মিক অতিবৃষ্টি এবং জমে থাকা পানির কারণে ফসলের ক্ষেতে গাছের গোড়ায় পচন ধরে। পানি শুকিয়ে এক পর্যায়ে গাছও মরে যায়। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলেই জেলার বিভিন্ন এলাকার কৃষি জমিতে এমন বিরুপ প্রভাব পড়েছে বলে জানায় কৃষি বিভাগসহ সংশ্লিষ্টরা।

সুজলা-সুফলা ষড়ঋতুর প্রিয় বাংলাদেশে বৈশাখ ও জৈষ্ঠ্য মাস গ্রীষ্মকাল। আর আষাঢ় ও শ্রাবণ মাসজুড়ে ধরা হয় বর্ষাকাল। কিন্তু এ বছর বৈশাখ আর জৈষ্ঠ্য মাসেই জেলার পাঁচ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় শুরু হয় ভারি বৃষ্টিপাত। অসময়ে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়েছে আটোয়ারী উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে। এখানকার গড় বৃষ্টিপাত বর্ষাকালকেও ছাড়িয়ে গেছে। অতিরিক্ত জ্বালানি খরচে সেচ দিতে হয়নি স্থানীয় বোরো ক্ষেতে। গ্রীষ্ম মৌসুমে আলোয়াখওয়া ইউনিয়নের সরদারপাড়া এলাকার বিভিন্ন ক্ষেত ডুবে ছিল বর্ষার পানিতে। জমে থাকা পানিতে ক্ষতি হয়েছে টমেটো, ভুট্টা, ডাল, মরিচসহ সবজি ক্ষেতের। অসময়ে অতিবৃষ্টিসহ এলোমেলো আবহাওয়া কারণে কৃষি জমিতে এই বিপর্যয় দেখা দেয়। শনিবার সরেজমিনে সদর উপজেলার বলেয়া পাড়া, চাঁনপাড়াসহ হাফিজাবাদ ও হাড়িভাসা ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, অকাল বর্ষায় এসব এলাকার অধিকাংশ কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। কয়েক বছর ধরে স্থানীয় কৃষকরা আগাম উন্নত জাতের টমেটো আবাদ করে অধিক লাভ করছিলেন। উৎপাদন খরচও বেশি হলেও অসময়ে আবাদকৃত গ্রীষ্মকালীন টমেটো বেশ লাভজনক। গত বছর আগাম বৃষ্টিতে ক্ষেতে পানি জমে যাওয়ায় লোকসান গুনেন টমেটো চাষিরা।

কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, জেলার বিভিন্ন এলাকার জমিতে বালুর পরিমাণ বেশি। অধিকাংশ কৃষি জমির পাণির ধারণক্ষমতা খুবই কম। এজন্য অল্প পানি দিয়ে যেসব আবাদ হয়, সেদিকেই নজর দেন কৃষকরা। লাভজনক ফসল বাদ দিয়ে বেশি বিনিয়োগ করে তারা বোরো আবাদ করেন। জুনের শুরুতে প্রচুর বৃষ্টিপাতে বিভিন্ন এলাকার নিচু জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। ফলে ভুট্টা, টমেটো ও মরিচ ক্ষেতে পানি জমে গাছ মরে যাচ্ছে।

সদর উপজেলার হাফিজাবাদ ইউনিয়নের পাঠানপাড়া গ্রামের উন্নত জাতের টমেটো চাষি করিমুল ইসলাম বলেন, প্রয়োজনের সময় বৃষ্টি হয় না। অসময়ের বৃষ্টিতে এলাকার অনেক ক্ষেত ডুবে গেছে। টমেটো, তরমুজ ও ভুট্টা ক্ষেত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জমে থাকা পানি গরম হয়ে ক্ষেতের গাছ মরে যাচ্ছে। আমার দুই বিঘা টমেটো খেত নষ্ট হয়েছে। সদর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মো. রুবেল হুসেন বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে এখানকার কৃষিতে বিরূপ প্রভাব পড়েছে। এরবারও বর্ষার আগে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বৃষ্টির কারণে কৃষকের উঠতি ফসল জমিতেই নষ্ট হয়েছে।

______________

patheo24/105

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *