জামালপুর প্রতিনিধি : ‘৩০ ট্যাহা ইউনিট দিয়া আমরা চইলবার পামু না, আমাগরে পোসাবো না। এরচে আমাগরে সোলারই ভালা। অন্য চরের কথা কবার পামু না আমাগরে মন্নিয়ার চরে পত্যেকের ঘরত সোলার আছে। এ্যাহন তো হাট বাজারোত্তনে সোলার কিনব্যার পাই আবার কিস্তিতেও কিনুন যায়।’ জামালপুরের ইসলামপুরে যমুনার দুর্গম অঞ্চল মন্নিয়ারচরে বাসিন্দা ৮৫ বছর বয়সী শুকুর আলী এসব কথা বলেন।
একই চরের ব্যবসায়ী শহিদুর রহমান বলেন, ‘আমাগরে বাড়িত আগেত্তনেই সোলার আছে, ৩০ ট্যাহা ইনিটে সোলার বিদ্যুৎ কিনমু কে? এরপরেও দেহি দোকানোত ফ্রিজ চালাবার জন্যে এ্যাডা লাইন নেয়ার চিন্তা করতাছি। কিন্তু ট্যাহা বলে আগেই দিয়ুন নাগে। এ্যাডা কিবে কতা- ট্যাহা শেষ কারেন বদ্দ অবো।’
চরবাসীদের বিদ্যুতের আলোয় আলোকিত করতে জামালপুরের ইসলামপুরে যমুনার দুর্গম অঞ্চল মন্নিয়ারচরে বাণিজ্যিকভাবে সৌর বিদ্যুৎ বিতরণ শুরু হয়েছে। প্রতি ইউনিট ৩০ টাকা হওয়ায় বিদ্যুৎ সংযোগ নিতে নিরুৎসাহী চরবাসীরা। তবে এ বিদ্যুৎ ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করতে চরবাসীদের প্রতিনিয়ত প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
সরেজমিন গিয়ে জানা গেছে, জেলার ইসলামপুর উপজেলার বেলগাছা ইউনিয়নের মন্নিয়ার চরের বাসিন্দা প্রায় ২০ হাজার। এ চরের চারপাশে যমুনা নদী। মন্নিয়ার চরে গ্রামগুলো হচ্ছে বরুল, সিন্দুরতলি, মন্নিয়ারচর ও পশ্চিম মন্নিয়ার চর।
মন্নিয়ার চরেই ১৬৫ শতাংশ (৫ বিঘা) জমির ওপর স্থাপিত হয়েছে ভিনসেন জিটেক লিমিটেড ২৪৯.৬ কিলোওয়াট পিক সোলার মিনি গ্রীড বিদ্যুৎ কেন্দ্র। ১৭ কিলোমিটার সঞ্চালন লাইনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সুবিধা পাবেন ৭০০ জন গ্রাহক। এসব গ্রাহকরা বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হলে আরো কিছু গ্রাহক বাড়ানো যাবে। এ বিদ্যুৎ কেন্দ্রে সোলার প্যানেল রয়েছে ২৬০ ওয়াটের ৯৬০টি, ব্যাটারী ২৩৬টি (প্রতিটি ৬২৫ এমপিআর ২ ভোন্ট) এবং জেনারেটর একটি। এ বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ব্যয় হয়েছে আট কোটি ৮১ লাখ ২৩ হাজার ৭৭২ টাকা। এই প্রকল্পের মেয়াদ ২০ বছর। ২০১৭ সালের ২০ ডিসেম্বর থেকে বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া হচ্ছে। সম্পূর্ণ অটোমেটিক ত্রিমাত্রিক সিস্টেমে এ বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি চলছে। এ বিদ্যুৎ কেন্দ্রে দৈনিক বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে ২৪৯ দশমিক ৬ কিলোওয়াট। ইতোমধ্যে বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া হয়েছি ১০০টি। এর মধ্যে আবাসিক ৫৫টি, সেচ পাম্প ১টি, কমার্সিয়াল ৪৩টি ও লেড মেশিনের গ্রাহক ১টি। চুক্তি ফরমে স্বাক্ষর করে পাঁচ হাজার টাকার বিনিময়ে যেকোন ব্যক্তি এ বিদ্যুৎ সংযোগ পেতে পারেন। সংযোগে সময় প্রতি গ্রাহককে দেয়া হয় সার্ভিস তার ও প্রিপেইড মিটার। মাসিক গ্রাহক চার্জ ৭০ টাকা। এদিকে সৌর বিদ্যুৎ ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করতে এবং এর ব্যবহার সম্পর্কে সোলার মিনি গ্রিডের আওতাধীন ৫৮০ জন চরবাসীকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক গ্রাহক বলেন, ট্যাহা আগে দিউন নাগে। খরচ বেশি। এখন আর কী করমু। কয়ডা মাস দেহি। পরে নগদ ট্যাহায় নইলে কিস্তিতে সোলার কিনমু। মাসে মাসে ট্যাহা দিবের পামু না।
এ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্লান্ট ম্যানেজার ইসরাফিল ইসলাম বায়জিত বলেন, এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ হচ্ছে ৬২ টাকা। ৩২ টাকা ভর্তুকি দিয়ে প্রতি ইউনিট ৩০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। তবে এলইডি লাইট ব্যবহার করলে মাসিক খরচ খুবই কম হবে। এজন্য সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য আমরা প্রতিনিয়ত গ্রাহকদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছি।
ইনফ্রাস্ট্রক্চার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানী লিমিটেডের (ইডকল) ডিভিশনাল ম্যানেজার নূরুল হুদা বলেন, সোলার বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন এবং সৌর বিদ্যুৎ ব্যবহারের জন্য ইডকল আর্থিকভাবে সহযোগিতা করে থাকে।
জিটেক সোলার কোম্পানীর সিনিয়র এইচআর এন্ড এডমিন অফিসার আবু রায়হান বলেন, সরকারের পাশাপাশি ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার অংশ হিসেবে চরবাসীদের সুবিধার্থে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন মোস্তফা আল মাহমুদ স্যার।
ভিনসেন জিটেক লিমিটেডের চেয়ারম্যান মোস্তফা আল মাহমুদ বলেন, বিদ্যুৎবিহীন জীবন অন্ধকার। দীর্ঘদিন চেষ্টা করে সরকারের সহযোগিতায় এ বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। প্রফিটের চিন্তা করে এ বিনিয়োগ নয়। মানুষের উপকারের জন্যই এ বিনিয়োগ। শুধু সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে চরবাসীকে নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুতের আলোয় আলোকিত করতেই এই উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।


