নিজস্ব প্রতিবেদক : দেশে গত বছর কোরবানির ঈদে প্রায় ১ কোটি ৫ লাখ পশু জবাই হয়। বন্যা পরিস্থিতি অস্বাভাবিক না হলে চলতি বছর কোরবানি ঈদে পশুর চাহিদা সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পেতে পারে। সে হিসাবে এবার কোরবানির জন্য পশু প্রয়োজন হবে ১ কোটি ২০ লাখ। এ চাহিদার ৯৬ শতাংশই দেশী পশুতে মেটানো সম্ভব হবে বলে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর (ডিএলএস) সূত্রে জানা গেছে।
প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য বলছে, সারা দেশে গরু-মহিষ ও ছাগল-ভেড়া রয়েছে প্রায় পাঁচ কোটি। এর মধ্যে গরু ও মহিষ ২ কোটি ৩৮ লাখ এবং ছাগল-ভেড়া ২ কোটি ৬০ লাখ। আর বর্তমানে দেশের বাজারে কোরবানির ঈদে সরবরাহের জন্য প্রস্তুত রয়েছে ১ কোটি ১৫ লাখ ৫৭ হাজার পশু। এটি কোরবানি ঈদে সম্ভাব্য চাহিদার প্রায় ৯৬ শতাংশ।
চলতি বছর গতবারের চেয়ে চাহিদা না বাড়লে পশুর সংখ্যা উদ্বৃত্ত থেকে যাবে বলে মনে করেন ডিএলএসের মহাপরিচালক ডা. আইনুল হক। তিনি বলেন, গত বছর চাহিদা ও উত্পাদনে কিছুটা ঘাটতি থাকলেও এবারে কোনো ধরনের ঘাটতি হবে না। পর্যাপ্ত সংখ্যক পশু থাকায় আমদানিরও প্রয়োজন নেই। ঈদ সামনে রেখে সব ধরনের পশু স্বাস্থ্যসম্মতভাবে কোরবানির জন্য উপযুক্ত করে তোলা হচ্ছে। এজন্য গ্রাম পর্যায় থেকে শহর সব জায়গাতেই খামারিদের তালিকা করা হয়েছে। সার্বক্ষণিক তাদের পর্যবেক্ষণ ও পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। এছাড়া আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট অন্য সব সংস্থাকেও এ কাজে নিয়োজিত করা হচ্ছে।
মোটাতাজাকরণ ওষুধসহ গবাদিপশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং রোগবালাই রোধে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, মত্স্য ও পশুসম্পদ মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্টদের নিয়ে সমন্বিত পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে জানিয়ে ডিএলএসের মহাপরিচালক বলেন, ঈদের আগে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত গরু মোটাতাজাকরণসহ বিভিন্ন ক্ষতিকারক ওষুধ যাতে প্রেসক্রিপশন ছাড়া বিক্রি না হয়, তা নিশ্চিত করা হয়েছে। কোরবানির অযোগ্য অসুস্থ ও ত্রুটিযুক্ত গবাদিপশু যেন হাটবাজারে বিক্রি না হয়, সে বিষয়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করবে।
ভারত হঠাত্ করেই গরু রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা দেয়ার কারণে ২০১৪ সাল থেকেই কোরবানির পশুর চাহিদা দেশীয়ভাবে মেটাতে বাড়তি পদক্ষেপ নেয় ডিএলএস। এজন্য খামারিদের প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তি সহায়তা দেয়া হয়। দেশের গরু পরিপূর্ণ হতে চার-ছয় বছর সময় নেয়। তাই এ সময় কমিয়ে আনতে ব্রাজিলের বুল আনার উদ্যোগ নেয়া হয়। স্বল্প সময়ে উত্পাদন বাড়াতে ব্রাজিল থেকে প্রযুক্তি এনে তা ব্যবহারের মাধ্যমে দেড়-দুই বছরের মধ্যে গরু জবাইয়ের উপযুক্ত করে তোলা হচ্ছে। সরকার কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও তফসিলি ব্যাংকের মাধ্যমে ৫ শতাংশ সুদে ঋণ দেয়ার ব্যবস্থাও করেছে। এসব পদক্ষেপের ফলশ্রুতিতে এখন অনেকটা দেশী পশুতেই মিটছে কোরবানির চাহিদা।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৫ সালে দেশে কোরবানি উপলক্ষে বিক্রয়যোগ্য পশুর সংখ্যা ছিল ৯৬ লাখ ৩৫ হাজার। গত বছর তা বৃদ্ধি পেয়ে ১ কোটি ৪ লাখে উন্নীত হয়। চলতি বছর এ সংখ্যা আরো বাড়বে। এ বছর কোরবানির জন্য সরবরাহের উপযোগী ১ কোটি ১৫ লাখ ৫৭ হাজার পশুর মধ্যে রয়েছে ৩৩ লাখ ৩০ হাজার গরু, ১১ লাখ ২৭ হাজার মহিষ এবং প্রায় ৭১ লাখ ছাগল ও ভেড়া।
ডিএলএসের পরিচালক (সম্প্রসারণ) ডা. মো. মেহেদী হাসান বলেন, শতভাগ চাহিদা মেটানোর লক্ষ্যে দেশেই উত্পাদন বাড়াতে খামারিদের মধ্যে সহজ শর্তে ঋণ প্রদান করা হচ্ছে। খামারিদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম বাড়ানো হয়েছে। উত্পাদনশীল গাভী ও বকনা বিপণন ও জবাই রোধে আইনি পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। কৃত্রিম প্রজনন বাড়ানো ও বাচ্চার মৃত্যুহার কমিয়ে আনতে মাঠপর্যায়ে পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম বাড়ানো হয়েছে। সেসঙ্গে গো-খাদ্য সহজলভ্য করতেও নেয়া হচ্ছে নানা পদক্ষেপ। সরকারের এসব পদক্ষেপের কারণে দেশে গরু-ছাগলের উত্পাদনও বেড়েছে।
ভোক্তাদের কাছে নিরাপদ মাংস সরবরাহ করতে উত্পাদন ও ভোক্তা পর্যায়ে কাজ করা হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, সুস্থ-সবল গবাদিপশু সরবরাহ নিশ্চিতকরণ এবং অবৈধ মোটাতাজাকরণ প্রতিরোধে সারা দেশের কোরবানির হাটবাজারে ভেটেরিনারি মেডিকেল সাপোর্ট টিম বসানো হবে। রাজধানীতে ২৫টি টিম ছাড়াও সারা দেশে প্রায় ১ হাজার ১০০টির বেশি টিম থাকবে।
এদিকে প্রাণিসম্পদ খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোরবানির চাহিদার শতভাগই দেশে উত্পাদিত পশুর মাধ্যমে পূরণ করা সম্ভব। এজন্য ঋণ ব্যবস্থাকে সহজীকরণ করতে হবে, স্বল্প সুদে ঋণ বিতরণ ও তা তদারকি করতে হবে। গরু উত্পাদন ব্যবস্থায় খামারিদের খরচ কমিয়ে মুনাফা বাড়াতে পদক্ষেপ নিতে হবে। উত্পাদনশীল গরুর জবাই বন্ধে আইন বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। কম সময়ে বা কম খাবারে গরুর মাংস ও দুধ উত্পাদনক্ষমতা যাতে বৃদ্ধি করা যায়, সে লক্ষ্যে দেশে প্রজননের জন্য যে সিমেন আনা হয়েছে, সেগুলো পরিবর্তন করতে হবে। বিশেষ করে বেসরকারি পর্যায়েও সিমেন আমদানির মাধ্যমে গরু উত্পাদনের ব্যবস্থা করতে হবে এবং ২০-৩০ বছর আগের সিমেন দিয়ে গরু উত্পাদন সরকারিভাবে কমিয়ে আনতে হবে। এছাড়া গরু মোটাতাজাকরণ কার্যক্রম আরো বৈজ্ঞানিকভাবে পরিচালনা করতে হবে। গরু মোটাতাজা করতে স্টেরয়েডজাতীয় (ডেকাসন, বেটামেথাসন ও পেরিঅ্যাকটিন), ট্যাবলেট ছাড়াও ইউরিয়া সার খাওয়ানোর পন্থাগুলোকে কঠোর হস্তে বন্ধ করতে হবে।
খামারিদের আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানো এবং প্রাণী পালনে উত্পাদন খরচ কমিয়ে আনতে কার্যকর পদক্ষেপের সুপারিশ করেছেন ডিএলএসের সাবেক পরিচালক ডা. অরবিন্দ কুমার সাহা। তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গরুর ফুড কনভারশন রেশিও (এফসিআর) তিন-চার কেজি হলেও বাংলাদেশে তা আট কেজির বেশি। অর্থাত্ এক কেজি মাংস তৈরিতে প্রায় আট কেজি খাবার দিতে হচ্ছে। এছাড়া ৩৫-৪০ বছরের পুরনো সিমেন দিয়ে প্রজনন করানো হচ্ছে। ফলে উত্পাদন খরচ কমাতে পারছে না খামারিরা। এসব দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারলে খামারিরা আরো বেশি লাভবান হতে পারবেন। প্রাণী পালনকে লাভজনক খাত হিসেবে দাঁড় করাতে হলে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। বাণিজ্যিক খামারকে উত্সাহের পাশাপাশি ক্ষুদ্র খামারিদের স্বার্থ রক্ষা করতে হবে। তাছাড়া বড় প্রতিষ্ঠানগুলোকে এ খাতে বিনিয়োগে আকৃষ্ট করার পদক্ষেপ নিতে হবে।


