নগরে নগরে স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ছন্দপতন
নিম্নচাপে দুর্ভোগে উপকূলবাসী
পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট গভীর নিম্নচাপের প্রভাবে দেশের উপকূলীয় জেলাগুলোতে বৈরী আবহাওয়া বিরাজ করছে। দুর্যোগ মোকাবেলায় জেলা প্রশাসন বিভিন্ন প্রস্তুতি নিলেও টানা বৃষ্টিতে দুর্ভোগে পড়েছে সাধারণ মানুষ। জেলা প্রতিনিধিদের পাঠানো সংবাদে এমনটাই জানা গেছে।
পটুয়াখালী : নিম্নচাপের প্রভাবে পটুয়াখালীতে কখনও ভারী আবার কখনও গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে। বুধবার মধ্যরাত থেকে টানা বর্ষণের ফলে শহরের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। এতে বিপাকে পড়েছেন জেলার শ্রমজীবী ও নিম্ন আয়ের মানুষ।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোল্লা এমদাদুল্লাহ্ বলেন, সাগরে কোনো মাছ ধরার ট্রলার নেই। নদীতে দুই একটি থাকতে পারে। ইলিশ অভিযান অব্যাহত রয়েছে। বৃষ্টির পানিতে যাতে মাছের ঘের ভেসে না যায় সেজন্য চাষিদের ঘরে জাল দিয়ে রাখতে পরামর্শ দেয়া হয়েছে।
পটুয়াখালী আবহাওয়া অফিসের পর্যবেক্ষক কাজী কেরামত বলেন, বৃহস্পতিবার সকাল ৬টা থেকে শুক্রবার সকাল ৬টা পর্যন্ত ১৮৯.৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। যা পটুয়াখালীর গত ৪ বছরের সর্বোচ্চ রেকর্ড।
বরগুনায় টানা তিনদিনের বৃষ্টিতে পানি বেড়েছে জেলার প্রধান নদ-নদীর। তলিয়ে গেছে ফসলের ক্ষেতসহ শত শত মাছের ঘের।
একনাগাড়ে বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত বরগুনা জেলা শহর থেকে শুরু করে ছয়টি উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকা। বিস্তীর্ণ এলাকায় পানি জমেছে। জলমগ্ন জেলার সিংহভাগ অংশ।
গত বুধবার দিবাগত মধ্যরাত থেকে বৃষ্টি শুরু হয়ে এখনও পর্যন্ত অব্যহত রয়েছে। তিনদিনের লাগাতার বৃষ্টিতে মাঠে-ঘাটে থইথই করছে পানি। পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল আকার ধারণ করছে। বরগুনার উপর দিয়ে প্রবাহিত পায়রা-বলেশ্বর ও বিষখালি তিনটি নদীরই জোয়ারের পানির উচ্চতা বেড়েছে।
বরগুনা পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নি¤œচাপ ও ভারি বর্ষণের ফলে নদীর পানি তিনফুট পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। যার ফলে উপকূলের নিম্নাঞ্চলগুলো প্লাবিত হয়েছে।
বরগুনা পাউবোর পানি পরিমাপক মাহতাব হোসেন জানান, সবশেষ জোয়ারে বরগুনার তিনটি নদীর পানিই স্বাভাবিকের চেয়ে তিনফুট বেড়েছে।
জেলা কৃষি বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, আমনের মৌসুমে ধানে শীষ ধরেছে। এমন ভারী বর্ষণে জেলার কয়েক লাখ হেক্টর আবাদি আমনের ফলন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এছাড়াও শীতের আগাম সবজি চাষও চরম ক্ষতির মুখে পড়েছে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ বলেন, গত তিনদিনের টানা বৃষ্টিতে বরগুনায় মৎস্যখাত সবথেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শত শত মাছের ঘের ইতোমধ্যেই পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। আমরা তালিকা তৈরি করার কাজ শুরু করেছি।
জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী কায়সার আলম বলেন, জেলায় এখন পর্যন্ত কোথাও বেড়িবাঁধ ভেঙে যাওয়ার খবর আমরা পাইনি। তবে বেশ কিছু স্থানে ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ আছে। এরকম টানা বৃষ্টি থাকলে সেগুলো ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই আমরা প্রস্তুত রয়েছি।
এ বিষয়ে বরগুনা জেলা প্রশাসক মোস্তাইন বিল্লাহ বলেন, সমুদ্রে সৃষ্ট নি¤œচাপের প্রভাবে টানা তিন দিনের ভারি বর্ষণে বরগুনার জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। টানা বৃষ্টিতে ঘর থেকে বের হতে পারছে না সাধারণ মানুষ। এতে সব থেকে বেশি বিপাকে পড়েছেন নিম্ন আয়ের মানুষ।
বাগেরহাটে গত দুই দিন ধরে বৃষ্টি অব্যাহত রয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। শুক্রবার সকাল থেকে শুরু হয়েছে ভারী বর্ষণ।
মোংলা সমুদ্র বন্দরে এই মুহূর্তে ১১টি দেশি বিদেশি জাহাজ অবস্থান করছে। তবে বন্দরে ৪ নম্বর হুঁশিয়ারি সংকেত থাকলেও স্বাভাবিক কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের ডেপুটি হারবার মাস্টার ক্যাপ্টেন মো. শাহাদাত হোসেন জানান, মোংলা বন্দরে ১১টি দেশি বিদেশি জাহাজ রয়েছে। শুক্রবারের ভারি বর্ষণের মধ্যেও বন্দরের সকল কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে।
গভীর নি¤œচাপের ফলে বাগেরহাটসহ উপকূলীয় অঞ্চলে শনিবার সকাল পর্যন্ত এই বৃষ্টির ধারা বিরজমান থাকবে বলে জানিয়েছেন মোংলা আবহাওয়া অফিসের পর্যবেক্ষক মোহাম্মাদ আলী।
নোয়াখালী : উপকুলীয় জেলা নোয়াখালীতে নদী উত্তাল থাকায় বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার সঙ্গে মূল ভূখ-ের সব ধরনের নৌ-যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছে প্রশাসন। শুক্রবার সকাল থেকে পরবর্তী নির্দেশ নাা দেয়া পর্যন্ত এ সিদ্ধান্ত মানতে হবে সবাইকে।
সকাল থেকে মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। আকাশ মেঘলা ও বৃষ্টির কারণে রাস্তাঘাটে জনচলাচল অন্য সময়ের চেয়ে কমে গেছে। কমে গেছে বিভিন্ন ধরনের যানবাহন চলাচলও।
বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ায় ১৭৭টি ইউনিটে তিন হাজার ৫৪০ জন স্বেচ্ছাসেবককে সব সময় প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে। এছাড়া ঘূর্ণিঝড়ের আশঙ্কা থাকায় জনগণকে সতর্ক থাকার জন্য বলা হচ্ছে ও সিগনাল পতাকা উত্তোলন করা হয়েছে।
হাতিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইমরান হোসেন জানান, আবহাওয়া স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত হাতিয়ার সঙ্গে নৌ যোগাযোগ বন্ধ থাকবে। এছাড়া উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ১১টি ইউনিয়নের চেয়ারম্যানদেরকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ খোরশেদ আলম খান জানান, উপকূলীয় উপজেলাগুলোতে বিভিন্ন ধরনের শুকনো খাবার পৌঁছে দেয়া হয়েছে। দুর্যোগ মোকাবেলায় সব ধরনের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে।
সাতক্ষীরা : সাতক্ষীরায় নিন্মচাপের প্রভাবে প্রচুর বৃষ্টিপাত ও ৫০-৬০ কিলোমিটার গতিবেগে বইছে ঝড়ো হাওয়া। বৃষ্টিপাত সন্ধ্যা পর্যন্ত বলে আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে।
সাতক্ষীরা আবহাওয়া অধিদফতরের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জুলফিকার আলী জানান, দেশের সকল উপকূলজুড়ে চার নম্বর সতর্কতা সংকেত জারি করা হয়েছে। গভীর নি¤œচাপের প্রভাবে শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত থেমে থেমে এভাবে প্রচুর বৃষ্টিপাত চলবে। সেই সঙ্গে থাকবে ৫০-৬০ কিলোমিটার গতিবেগে ঝড়ো হাওয়া। সন্ধ্যার দিকে আবহাওয়া ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হবে।
উল্লেখ্য, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট গভীর নি¤œচাপের প্রভাবে উপকূল, অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরসমূহে স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে ৩ থেকে ৪ ফুট অধিক উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসের আশঙ্কা রয়েছে। শুক্রবার সকালে আবহাওয়ার অধিদফতরের ৪ নম্বর বিশেষ বিজ্ঞপ্তিতে এ কথা বলা হয়েছে।
এদিকে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট গভীর নিম্নচাপের কারণে রাজধানী ঢাকাতেও বিরুপ প্রভাব পড়েছে। বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) রাত থেকে থেমে থেকে বৃষ্টিপাতের কারণে নগরবাসীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ছন্দপতন ঘটেছে।
শুক্রবার ছুটির দিনে সকাল ৯টার আগ পর্যন্ত নগরীর পাড়া-মহল্লা থেকে শুরু করে বিভিন্ন এলাকার ছোট বড় রাস্তাঘাট ছিল প্রায় ফাঁকা। অন্যান্য দিনে সাপ্তাহিক বাজারের জন্য অনেকেই কাকডাকা ভোরে বাজারে ছুটলেও বৃষ্টি এবং বাতাসের কারণে অনেকেই বেশ বেলা করেই ঘুম থেকে উঠেছেন। বাজারেও তুলনামূলকভাবে ক্রেতার ভিড় ও বেচাকেনা কম ছিল। রাস্তাঘাটে গণপরিবহনেও যাত্রী সংখ্যা ছিল খুবই অল্প। খুব বেশি প্রয়োজন ছাড়া মানুষ বাইরে বের হয়নি।
তবে সকাল ১০টার পর থেকে বৃষ্টি কমলে জীবন ও জীবিকার সন্ধানে বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষ ছাতা কিম্বা রেইনকোট নিয়ে গন্তব্যে ছুটতে শুরু করেন। বিশেষ করে বিভিন্ন শপিংমল ও মার্কেটের মালিক ও কর্মচারীদের দোকান খুলতে ছুটতে দেখা যায়।
মহামারি করোনার কারণে অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাবে ব্যবসা বাণিজ্য আগের মতো নেই বললেই চলে। শুক্রবার ছুটির দিনেও এমনিতেই ক্রেতার ভিড় তুলনামূলক বেশি থাকে। এছাড়া দুর্গাপূজার উৎসবকে কেন্দ্র করে গত কয়েকদিন বেচাকেনা ভালো হচ্ছে। এ কারণে দুর্যোগপূর্ণ আবাহওয়া সত্ত্বেও মার্কেটের দোকানিরা দোকান খুলে বসেন।
সরেজমিনে নিউমার্কেট, গাউছিয়া, চাঁদনিচক, হকার্স মার্কেট, এলিফ্যান্ট রোড, সায়েন্স ল্যাবরেটরি ও ধানমন্ডি এলাকার মার্কেট ঘুরে দেখা গেছে- টিপ টিপ বৃষ্টি থাকা সত্ত্বেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্রেতারা মার্কেটে ঢুঁ মারছেন।
নিউমার্কেট এলাকার ব্যবসায়ী শাহ আলম বলেন, করোনার কারণে ব্যবসা বলতে গেলে লাটে উঠেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে দুর্গা উৎসবের কারণে গত কয়েকদিন বেচাকেনা ভালো হচ্ছিল। শুক্রবার খুব ভালো বিক্রি হবে বলে আশা করেছিলাম। কিন্তু বৃষ্টির কারণে ক্রেতা আশানুরূপ হচ্ছে না। বিকেলের দিকে বেচাকেনা ভালো হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
বৃষ্টির কারণে বিপাকে পড়েছেন এলিফ্যান্ট রোড এলাকার ফুটপাতের শিশু পোশাক বিক্রেতা আফজাল। দুপুর ১২টায় ফুটপাতে পর্দা টানিয়ে মালামাল সাজাতে দেখা যায়। এ প্রতিবেদককে তিনি বলেন, বৃষ্টির কারণে সকালে দোকান খুলিনি। এখন বৃষ্টি কম হওয়ায় দোকান খুলছি। জোরে বৃষ্টি হলে পণ্য সামগ্রী ভিজে যায়। এতে বিক্রি করে যত লাভ হবে তার চেয়ে লোকসান বেশি হবে।
নিউমার্কেটের সামনে ভ্যানগাড়ি থামিয়ে তেলের গ্যালন নামাচ্ছিলেন ভ্যানচালক রহিম মিয়া। বৃষ্টিতে ভিজে একাকার হয়েছেন। এ প্রতিবেদককে রহিম মিয়া বলেন, ঝড়-বৃষ্টি যাই হউক, কাজ না করলে না খেয়ে থাকতে হবে। তাই বৃষ্টি মাথায় নিয়েই বেরিয়ে পড়েছেন।
এদিকে আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় রাজধানী ঢাকায় ৪৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়।
তলিয়ে গেছে বরিশাল নগরীর রাস্তাঘাট : বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট গভীর নি¤œচাপের প্রভাবে বরিশালে সকাল থেকেই টানা বৃষ্টি অব্যাহত রয়েছে। ফলে নগরীর অধিকাংশ রাস্তা পানিতে তলিয়ে গেছে। পানি প্রবেশ করেছে অনেক বসতবাড়িতেও। বৃষ্টি আর জলাবদ্ধতার কারণে নগরবাসীর জীবনে দুর্ভোগ নেমে এসেছে।
এদিকে বৈরী আবহাওয়ার কারণে বরিশালের অভ্যন্তরীণ নৌ রুটে লঞ্চ চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। তবে বরিশাল-ঢাকা নৌপথে লঞ্চ চলাচল স্বাভাবিক থাকবে। আবহাওয়া অধিদফতর সমুদ্র বন্দরগুলোকে ৪ নম্বর স্থানীয় হুঁশিয়ারি সংকেত এবং বরিশাল নদী বন্দরে ২ নম্বর সতর্ক সংকেত দেখাতে বলেছে। তাই দুর্ঘটনার আশঙ্কায় শুক্রবার সকাল থেকে অভ্যন্তরীণ রুটে সব ধরনের লঞ্চ চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে।
বরিশাল নদীবন্দরের কর্মকর্তা মো. মোস্তাফিজুর রহমান জানান, নদী বন্দরে ২ নম্বর সতর্ক সংকেত থাকায় বরিশালের অভ্যন্তরীণ রুটে লঞ্চ চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। তাই সকাল থেকে বরিশাল নদীবন্দর থেকে অভ্যন্তরীণ ১২ রুটে কোনো নৌযান ছেড়ে যায়নি। পরবর্তী নির্দেশনা না পাওয়া পর্যন্ত এ নিষেধাজ্ঞা জারি থাকবে। তবে বরিশাল থেকে ঢাকাগামী লঞ্চ চলাচলে কোনো নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়নি। বিশেষ সতর্কতার সঙ্গে বরিশাল-ঢাকা রুটে বড় লঞ্চ চলাচল করতে বলা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
বরিশাল আবহাওয়া অফিসের সিনিয়র অবজারভার মাহফুজুর রহমান জানান, উত্তর বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থানরত নিম্নচাপটি গভীর নিম্নচাপে পরিণত হয়েছে। নিম্নচাপের প্রভাবে দেশের উপকূলীয় এলাকা এবং সমুদ্র বন্দরগুলোর ওপর দিয়ে ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে।
এ কারণে সমুদ্র বন্দরগুলোকে ৪ নম্বর স্থানীয় হুঁশিয়ারি সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি বরিশালসহ নদী বন্দরগুলোকে ২ নম্বর নৌ হুঁশিয়ারি সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারগুলোকে পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত উপকূলের কাছাকাছি থেকে সাবধানে চলাচল করতে বলা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় বরিশালে ১৯০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। এর মধ্যে ১১৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে শুক্রবার সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত। দিনভর বৃষ্টিপাতের একই প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে।
এদিকে সকাল থেকে ছয় ঘণ্টার টানা বর্ষণে নগরীর নিচু এলাকাসহ বিভিন্ন উপজেলার নি¤œাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। একান্ত প্রয়োজন ছাড়া কেউ ঘর থেকে বের হচ্ছেন না। বৃষ্টির কারণে সড়ক ও বাজারে মানুষজনের উপস্থিতি খুব কম দেখা গেছে। অনেক দোকানও বন্ধ দেখা যায়। দিনমজুররা কাজে যেতে পারেননি।
বৃষ্টির কারণে নাকাল নগরবাসী। অনেক বসতবাড়িতে পানি প্রবেশ করেছে। নগরীর নিচু এলাকা হিসেবে পরিচিত কীর্তনখোলার তীরের জনপদ সাগরদী ধান গবেষণা সড়ক, পূর্ব রুপাতলী, জাগুয়া, ভাটিখানা, নিউ ভাটিখানা, আমানতগঞ্জ, রসুলপুর, পলাশপুর, নবগ্রাম রোডের কিছু এলাকাসহ আরও অনেক এলাকায় হাঁটু পানি দেখা গেছে। সবচেয়ে বড় সঙ্কটে পড়েছে কীর্তনখোলা তীর-সংলগ্ন রসুলপুর, কলাপট্টি, পলাশপুর, বরফকল ও স্টেডিয়াম বস্তির বাসিন্দারা। ওই সব এলাকার বাসিন্দাদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
সাগরদী ধান গবেষণা সড়কের একাধিক বাসিন্দা জানান, অল্প বৃষ্টিতেই রাস্তাঘাটে পানি জমে যায়। জোয়ার থাকলে তো ভোগান্তির শেষ থাকে না। অনেক সময় বিল্ডিংয়ের নিচ তলায় পানি ঢোকে। তখন বাসা থেকে বের হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
বরগুনা : বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপের কারণে উপকূলীয় এলাকায় গত দু’দিন ধরে ঝড়ো বৃষ্টি হচ্ছে। এতে দুর্ভোগে পড়েছেন খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ। টানা বর্ষণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মাছের ঘের, মৌসুমী কৃষক ও আমন চাষিরা।
দুই দিনের টানা বর্ষণে বরগুনা পৌরসভাসহ আশপাশের এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। দুর্ভোগে পড়েছেন খেটে খাওয়া লোকজন। দু’দিনের টানা বর্ষণে সদর উপজেলা বরইতলা, পোটকাখালী বা ওয়ালকার খেজুরতলা ব পৌর শহরের কলেজ ব্রাঞ্চ, ডিকেপি রোড, কেজি স্কুল সড়ক এলাকার বিভিন্ন এলাকা পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। তালতলী উপজেলার মালিপাড়া, নয়াপাড়া কাজির খাল, জয়ালভাঙা, ফকিরহাটসহ নি¤œাঞ্চল প্লাবিত। জমির ধান বাতাসে হেলে পড়েছে এবং মাছের ঘের তলিয়ে গেছে।
আমতলী, তালতলী, পাথরঘাটা, বামনা, বেতাগী উপজেলায় ভারী বর্ষণের কারণে প্লাবিত হয়েছে। এছাড়া পায়রা-বলেশ্বর ও বিষখালি প্রধান তিনটি নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। বরগুনা পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিম্নচাপ ও ভারী বর্ষণের ফলে নদীর পানি তিন ফুট পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। যার ফলে উপকূলের নিমাঞ্চলগুলো প্লাবিত হয়েছে।
বরগুনা সদর উপজেলা খাজুরতলা গ্রামের কৃষক রাসেল মিয়া বলেন, অল্প কিছু জমিতে শীতকালের ফসল চাষ করেছিলাম। কিন্তু দুই দিনের টানা বৃষ্টিতে তার সব শেষ হয়ে গেছে আবার পুনরায় ক্ষেত করতে হবে।
তালতলী উপজেলার মালিপাড়া গ্রামের বাসিন্দা শাহাদাত হোসেন বলেন, পুকুরে মাছ ছেড়েছিলাম, বিক্রির উপযোগী হয়ে গেছিল। টানা বৃষ্টিতে আমার সব শেষ হয়ে গেল। এই পুকুর থেকে প্রতিবছর এ আমার এক লাখ টাকার ওপরে আসতো।
একই গ্রামের কৃষক শাহজালাল বলেন, ধান উড়তে বেশি সময় লাগবে না। কিন্তু টানা এই বৃষ্টিতে সব শেষ হয়ে যাবে। এখন এই বীজ থেকে ফসল আশা করা যায় না। দমকা হাওয়ায় ক্ষেতের ধান শুয়ে পড়েছে।
বরগুনার জেলা প্রশাসক মোস্তাইন বিল্লাহ বলেন, টানা বর্ষণে যেসব এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাদেরকে পুনর্বাসনের আওতায় নিয়ে আসা হবে। কৃষি বিভাগ ও মৎস্য বিভাগের সঙ্গে আলোচনা করে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও মাছ চাষিদের সহায়তা করা হবে।
তিনি আরও বলেন, নিম্নচাপের প্রভাবে বৃষ্টি হচ্ছে। এটি ঘূর্ণিঝড়ের রূপ নিলে তা মোকাবিলায় জেলা প্রশাসন প্রস্তুত রয়েছে।


