নতুন সিম বিক্রিতে ভ্যাট ফাঁকির তদন্তে এনবিআর

নতুন সিম বিক্রিতে ভ্যাট ফাঁকির তদন্তে এনবিআর

নিজস্ব প্রতিবেদক ● মোবাইল ফোনের সিম পরিবর্তনের নামে নতুন সিম বিক্রির মাধ্যমে চারটি মোবাইল কোম্পানি মোটা অংকের মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ফাঁকি দিয়েছে। আর ফাঁকি দেয়া টাকার পরিমাণ প্রায় ১২শ কোটি টাকা। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে মাঠে নেমেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) উচ্চ পযায়ের কমিটি। ভ্যাট ফাঁকি দেয়া মোবাইল কোম্পানিগুলো হলো গ্রামীণফোন, বাংলালিংক, এয়ারটেল ও রবি (বর্তমানে রবি ও এয়ারটেল একীভূত হয়ে রবি নামে চালু আছে)। ইতোপূর্বে একই কায়দায় ওই কোম্পানিগুলো প্রায় ২ হাজার ৪৮ কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকির ঘটনা চিহ্নিত করেছে এনবিআর। সুদসহ তার পরিমাণ প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা। ওই ইস্যুটি হাইকোর্ট ঘুরে বর্তমানে এনবিআরের ভ্যাট আপিলাত ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন। এনবিআর সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সূত্র মতে, এনবিআরের পক্ষ থেকে নতুন করে ৪টি মোবাইল কোম্পানির ৫ বছরের সিম পরিবতনের তথ্য পরীক্ষার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তাতে ওই কোম্পানিগুলোর মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। আগের বিরোধ নিষ্পত্তি হওয়ার আগেই নতুন এমন উদ্যোগে কোম্পানিগুলো প্রশ্ন তুলেছে। এমনকি ওই তদন্ত প্রক্রিয়া স্থগিত রাখতে বিভিন্ন মহলে চেষ্টা-তদবিরও চালাচ্ছে। তাছাড়া ওই চারটি কোম্পানির বাইরে আরো কয়েকটি মোবাইল ফোন কোম্পানির আয়কর ও শুল্ক বিষয়েও মোটা অঙ্কের রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ রয়েছে। এরকম বেশকিছু বিরোধ বর্তমানে এনবিআরের আপিলাত ট্রাইব্যুনাল ছাড়াও আদালতে বিচারাধীন। মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলো মোটা অঙ্কের ব্যবসা করলেও সরকারের প্রযোজ্য রাজস্ব দেয়ার ক্ষেত্রে অনিয়ম করছে। প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও লোকবলের অভাবে এনবিআরের পক্ষে সব অনিয়ম ধরা যাচ্ছে না। সে সুযোগে কোম্পানিগুলো বছরের পর বছর ধরে কৌশলে রাজস্ব ফাঁকির কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। আবার যতোটুকু ধরা পড়ছে তাও কোম্পানিগুলো মামলায় আটকে রাখার কৌশল নিচ্ছে।

সূত্র জানায়, মোবাইল ফোনের সিম হারিয়ে গেলে, চুরি বা নষ্ট হয়ে গেলে একই গ্রাহকের জন্য সিম পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে। সেক্ষেত্রে গ্রাহকের উপর নতুন করে ভ্যাট-ট্যাক্স আরোপ হয় না। কিন্তু নতুন করে সিম কিনতে গেলে গ্রাহককে ভ্যাট-ট্যাক্স দিতে হয়। বর্তমানে ওই কর প্রতি সিমে ১শ টাকা হলেও আগে তা ৩শ টাকা থেকে ৬শ টাকা পর্যন্ত ছিল। মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলো নতুন সিম বিক্রি করে ভ্যাট-ট্যাক্স ফাঁকি দেয়ার জন্য সেগুলো সিম পরিবর্তন বা রিপ্লেসমেন্ট হিসেবে দেখিয়েছে। ইতিপূবে ২০০৭ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরের সিম পরিবর্তনের তথ্য দৈবচয়নের ভিত্তিতে পরীক্ষা করে এনবিআর। পরীক্ষায় মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলোর সরবরাহ করা সিম পরিবর্তনের বেশিরভাগ তথ্যই সঠিক না থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়। এবারও এনবিআর একই পদ্ধতিতে সিম পরীক্ষা করতে চাইছে। কিন্তু মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলো তাতে একমত নয়।

সূত্র আরও জানায়, সিম পরিবর্তনসংক্রান্ত সব নথি পরীক্ষা করা কার্যত অসম্ভব। তবে সেক্ষেত্রে ২০০৫ সালের এনবিআরের একটি আদেশে বলা হয়েছে, যে কোনো কারণে মোবাইল ফোনের নম্বর অপরিবর্তিত রেখে সিম পরিবর্তন করতে হলে তার তথ্য-প্রমাণাদি প্রতি মাসে এনবিআরকে দিতে হবে। সেটি হলো মোবাইল সেবা গ্রহণকারীর সাথে কোম্পানির চুক্তিপত্র/এসএএফ ও সিম পরিবর্তন সংক্রান্ত তথ্য বা এসআরএফ। কিন্তু ফোন সেবাদাতা কোম্পানিগুলো তা আমলে নেয়নি। সে কারণে এনবিআর ওই আদেশের বলে দৈবচয়নের ভিত্তিতে পরীক্ষা করলেও তা আইনগতভাবে সিদ্ধ। একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক নথিপত্র দৈবচয়নের ভিত্তিতে নিয়ে তা পরীক্ষা করা হবে। তার মধ্যে যতোগুলো ভুল পাওয়া যাবে তার উপর শতকরা হিসাবে এনবিআরের দাবি প্রতিষ্ঠিত হবে।

এ প্রসঙ্গে এনবিআরের বৃহৎ করদাতা ইউনিটের (এলটিইউ) ভ্যাট কমিশনার মতিউর রহমান জানান, এই পর্যন্ত এনবিআর যতো দাবিনামা জারি করেছে চূড়ান্ত নিষ্পত্তিতে তার প্রায় শতভাগই পক্ষে এসেছে। অথচ দাবিনামা জারি করা হলেই মোবাইল কোম্পানিগুলো হাইকোর্টে রিট করে। সেখানে হেরে গেলে আপিলাত ট্রাইব্যুনালে আসে। সেখানে হেরে গেলে আপিল বিভাগে যায়। সেখানে হেরে যাওয়ার পর অর্থ পরিশোধ করে। ইতোমধ্যে বছরের পর বছর সময় চলে যায়।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *