পুনর্জাগরণের আলো ও প্রতিরোধের শিকড়

পুনর্জাগরণের আলো ও প্রতিরোধের শিকড়

ফিলিস্তিন : ইতিহাসের মাটি, প্রতিরোধের শিকড় | পর্ব–২

  • নাইম ইসলাম

ফিলিস্তিন—যে ভূমির বুকে ইতিহাস একাধিকবার রক্তে স্নাত হয়েছে, আবার সেই একই মাটিতেই জন্ম নিয়েছে প্রার্থনা, প্রেম ও প্রতিরোধের বীজ। প্রথম পর্বে আমরা দেখেছি এই ভূমির সভ্যতার প্রাচীন রূপ, কৃষি ও সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা। এবার আমরা প্রবেশ করব সেই সময়ের দিকে, যখন ইতিহাসের পাতা জ্বলতে শুরু করেছিল নতুন এক রাজনীতির আগুনে।

ওসমানীয় শাসন থেকে আধুনিক বিভাজন

উনিশ শতকের শেষভাগে ওসমানীয় শাসনের অধীনে ফিলিস্তিন ছিল শান্ত অথচ ব্যস্ত এক প্রদেশ। জলপাই বাগানের গন্ধে ভরপুর সকাল, দারুল-উলুমে শিশুরা কোরআন তেলাওয়াত করছে, বণিকেরা যাত্রা করছে ইয়াফা বন্দরের পথে—জীবনের নিজস্ব ছন্দ ছিল সেখানে। কিন্তু বিশ্ব রাজনীতির দাবায় তখন শুরু হয়েছে নতুন খেলা। ইউরোপীয় শক্তিগুলোর সাম্রাজ্যবাদী তৃষ্ণা মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রকে নতুন করে আঁকছিল।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ওসমানীয় সাম্রাজ্যের পতন ও ব্রিটিশ ম্যান্ডেটের আগমন যেন এক নতুন যুগের সূচনা করল—যুগটি আর স্থিতিশীলতার ছিল না। ব্রিটিশ প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের ছায়ায় শুরু হলো ভূমি অধিগ্রহণ, জনসংখ্যার পরিবর্তন, এবং ধীরে ধীরে জন্ম নিল সেই রাজনৈতিক বীজ, যা পরবর্তীকালে ‘ইসরায়েল’ নামের রাষ্ট্রে রূপ নেয়।

১৯৪৮ সালে ঘোষিত সেই রাষ্ট্রের জন্ম ছিল এক জাতির ‘স্বাধীনতা’, কিন্তু একই সঙ্গে ছিল অন্য জাতির ‘নাকবা’—মহা বিপর্যয়। লক্ষাধিক ফিলিস্তিনি তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে ছিন্নমূল হলো। বাগানগুলোর জলপাইগাছ শুকিয়ে গেল, শহরগুলোতে নেমে এল শোকের ছায়া।

নির্বাসন, স্মৃতি ও কবিতার প্রতিরোধ

কিন্তু ফিলিস্তিনিরা হার মানেনি। তারা জানত—যে মাটি তারা হারিয়েছে, তার গন্ধ তাদের শরীরে এখনো লেগে আছে। শরণার্থী শিবিরের ঘিঞ্জি তাঁবুতেও তারা তৈরি করেছে ঘর, রুটি, গান, গল্প। কবি মাহমুদ দারবিশ লিখেছেন—

“আমরা একদিন ফিরে যাবো,
জলপাই গাছের তলায় আবার জন্ম নেবে শান্তি।”

এই কবিতাই হয়ে উঠেছে এক জাতির হৃদয়ের ভাষা। দারবিশ, গাসান কানাফানি, সামিহ আল-কাসিম—এরা কেবল সাহিত্যিক নন; তারা এক জাতির আত্মার কণ্ঠস্বর। তাদের কবিতা ও উপন্যাসে ফিলিস্তিন বেঁচে আছে এক জীবন্ত স্বপ্ন হিসেবে।

এই শিল্প ও সাহিত্যই প্রতিরোধের ধারাকে রক্তের মতো বয়ে নিয়ে গেছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। মা তার সন্তানকে ঘুম পাড়ানোর আগে বলে—“এই মাটিই তোমার ঠিকানা।” আর শিশুটি চোখ বন্ধ করে কল্পনা করে—তার দাদা-দাদীর বাগানের জলপাই এখনো সবুজ হয়ে আছে।

শহর, ধর্ম ও সংস্কৃতির সহাবস্থান

ফিলিস্তিনের শহরগুলো শুধু মানচিত্রের বিন্দু নয়—এগুলো মানব সভ্যতার সাক্ষী।
জেরুজালেম—যেখানে একই আকাশের নিচে ইহুদি, খ্রিষ্টান ও মুসলমানেরা শতাব্দীর পর শতাব্দী প্রার্থনা করেছে।
বেতলেহেম—যেখানে নবী ঈসা (আঃ)-এর জন্মস্থল, আজও বিশ্বাসীদের অশ্রু ও প্রার্থনায় ভিজে থাকে।
হেবরন—ইব্রাহিম (আঃ)-এর স্মৃতি বহন করে, যেখানে প্রতিটি পাথর যেন বলে ওঠে: “আমিই ইতিহাসের সাক্ষী।”

এইসব শহরই প্রমাণ করে, ফিলিস্তিন কখনো কেবল এক জাতির নয়; বরং এক বহুজাতি, বহুসংস্কৃতির আলোকিত সেতুবন্ধন।

আধুনিক ফিলিস্তিন : অস্তিত্বের লড়াই

আজকের ফিলিস্তিন এক গভীর সংকটের নাম। গাজায় একদিকে ধ্বংস, অন্যদিকে পুনর্গঠনের স্বপ্ন। শিশুরা খেলার মাঠে খেলছে ধ্বংসস্তূপের পাশে, কিন্তু তাদের চোখে ভয় নেই—শুধু অদম্য ইচ্ছা। শিক্ষকরা ক্লাস নিচ্ছেন অস্থায়ী তাঁবুতে, কৃষকরা শুকনো জমিতে এখনো নতুন চারা রোপণ করছেন।

এই দৃশ্যগুলো এক নতুন ইতিহাস লিখছে—যেখানে প্রতিরোধ কেবল অস্ত্র নয়, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও মানবিক সহমর্মিতাও এক বিশাল শক্তি।

এক জনগোষ্ঠীর অমর প্রতিজ্ঞা

ফিলিস্তিনের গল্প আজও অসমাপ্ত। এই জাতি তাদের হারানো ঘর, মাটি, মর্যাদা ফিরিয়ে আনতে লড়ছে—কখনো রক্তে, কখনো কলমে। কিন্তু তাদের মূলে যে বিশ্বাস—একদিন আবার ফিরে পাওয়া যাবে সেই ভূমি, যেখানে শিশুরা শান্তিতে ঘুমাবে, যেখানে জলপাইগাছের নিচে বসে মানুষ গল্প করবে নবী ও কবিতার।

ইতিহাস আমাদের শেখায়—মাটি কেবল ভৌগোলিক সীমানা নয়; এটি স্মৃতি, এটি আত্মা। ফিলিস্তিন সেই আত্মারই নাম—যে আত্মা শত আঘাতেও মরে না, বরং পুনর্জন্ম নেয় প্রতিটি প্রার্থনায়, প্রতিটি কবিতায়, প্রতিটি শিশুর হাসিতে।

চলবে…
লেখক: সহকারী সম্পাদক, পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম

Related Articles