পূর্ব-পাকিস্তানের দিকে এগোয় ভারত, মুক্ত হয় বিভিন্ন অঞ্চল
মানজুম উমায়ের :: ভারতীয় সেনারা সোমবার থেকে পূর্ব-পাকিস্তানের সকল যুদ্ধক্ষেত্রে অগ্রসর হয় এবং পাকিস্তানমুক্ত এলাকাগুলোর প্রশাসন স্বাধীনতাকামী বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করে। ভারতের পক্ষ থেকে এ তথ্য জানানো হয়। উল্লেখ্য, ভারত ৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়। স্বাধীন হওয়ার পর এই প্রথমবারের মত পাকিস্তান ভারতের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে এবং পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ দাবি করে, তাদের সামরিক অবস্থান অক্ষত আছে।
কলকাতায় অবস্থানরত ভারতীয় মুখপাত্র বলেছেন, মুক্তিবাহিনী পাকিস্তানমুক্ত অঞ্চলগুলোর প্রশাসনিক দায়িত্ব বুঝে নিচ্ছে। নয়াদিল্লি হতে বলা হয়েছে, মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় সেনারা যৌথভাবে কাজ করছে। আকাশ ও স্থলপথে ভারত-পশ্চিম পাকিস্তান সীমান্ত অঞ্চল ও পূর্ব-পাকিস্তানে প্রচন্ড যুদ্ধ চলছে, উভয়পক্ষ নিজেদের বিজয় দাবি করেছে। এদিকে পূর্ব-পাকিস্তানে ভারতীয় সেনারা সকল ফ্রন্টে অগ্রসর হয়েছে বলে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ দাবি করে। ভারতীয় মুখপাত্র বলেছেন, ভারতীয় সেনারা পূর্ব-পাকিস্তানের দক্ষিণ-পূর্বের গুরুত্বপূর্ণ ফেনী শহর অধিকার করেছে। পশ্চিমে যশোরে পাঁচ হাজার পাকিস্তানি সেনাদের চারদিক থেকে ঘিরে ফেলা হয়েছে এবং আকাশপথে ভারতীয়রা কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে।
এদিকে পূর্ব-পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলগুলোতে ভারতীয় সেনাদের অগ্রসর হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু রেডিও পাকিস্তান ঢাকায় অবস্থানরত পাকিস্তানি সেনাদের একটি আনুষ্ঠানিক বার্তা প্রচার করেছে, যাতে দাবি করা হয়েছে, পূর্ব-পাকিস্তানে পাকিস্তানি সেনাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। শুধুমাত্র কিছু এলাকা বিদ্রোহী বাংলাদেশি ও ভারতীয়দের অধিকারে রয়েছে। ভারতীয় একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, পশ্চিম পাকিস্তান যুদ্ধক্ষেত্রে কাশ্মীর অঞ্চলে ভারতীয় সেনারা একটি বড় পাকিস্তানি আক্রমণ হটিয়ে দিয়েছে। এতে পাকিস্তানের ২৩টি চাইনিজ টি-৫৯ ট্যাংক ধ্বংস হয়েছে। অপরদিকে রেডিও পাকিস্তান দাবি করছে, ওই অঞ্চলে পাকিস্তানি সেনারা অগ্রসর হচ্ছে।
পাকিস্তানি যুদ্ধবিমান ভারতের অভ্যন্তরে হামলা চালানোর খবর পাওয়া যাচ্ছে। সোমবার রাতে ভারত সংলগ্ন আরব সাগর অঞ্চলে পাকিস্তানি যুদ্ধজেট বিমান দেখা যাওয়ার প্রেক্ষিতে ভারতের সবচেয়ে জনবহুল শহর বোম্বেতে বিমানবিধ্বংসী কামান বসানো হয়েছে। পশ্চিম-পাকিস্তানের পাঁচশ মাইল দক্ষিণে প্রায় পঞ্চাশ লাখ মানুষের এই ভারতীয় শহরে বিমানবিধ্বংসী কামানের শতাধিক শেল নিক্ষেপের খবর পাওয়া গেছে। কিন্তু কর্তৃপক্ষ শহরের কোথায় বা নৌবাহিনীর কোন স্থাপনায় পাকিস্তানি হামলা হয়েছে, সে সম্পর্কে কিছু জানায়নি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, বিমানবিধ্বংসী কামানের শার্পনেলের আঘাতে প্রায় ৭০ জন মানুষ আহত হয়েছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম হতে পাওয়া খবর সূত্রে জানা যায়, সোমবার রাতে ভারতের পশ্চিমাঞ্চলের চারটি রাজ্যে মহারাষ্ট্র (রাজধানী বোম্বে), গুজারাট, পাঞ্জাব ও কাশ্মীর পাকিস্তানি যুদ্ধবিমান দেখা গেছে। ভারতীয় একজন মুখপাত্র বলেছেন, পাকিস্তানি বিমান হামলায় বোম্বের তিনশ মাইল উত্তর-পশ্চিমে কাচ উপসাগরের কাছে যমনাগর বিমানবন্দর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অপরদিকে পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, পাকিস্তানি বিমান কাচ উপসাগরের নিকটর্বতী ওখা’য় অবস্থিত ভারতীয় নৌবাহিনীর মিজাইল বেইজে আক্রমণ করেছে।
ঢাকা থেকে পাওয়া খবরে জানা যায়, সোমবার ভারতীয় যুদ্ধবিমান ঢাকার বিমানবন্দরে তিন দফা হামলা চালিয়েছে, এতে করে দুইশ ৫০ জন বিদেশি নাগরিকের ঢাকা ত্যাগের প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়নি। ইউনাইটেড প্রেস ইন্টারন্যাশনালের একজন প্রতিনিধি জানিয়েছে, বিমান হামলায় বিমান বন্দরের রানওয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সকাল সাড়ে ৯টায় ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধবিরতি হয়েছে ভেবে নারী ও শিশুসহ বিদেশি নাগরিকদের ওই দলটি বিমানবন্দরে গিয়েছিল। কিন্তু সকাল ৯ টা ৪৫ মিনিটে ভারতীয়রা ঢাকার বিমানবন্দরে বিমান হামলা করে। ফলে বিদেশি নাগরিকদের নিতে আসা কানাডিয়ান সি-১৩০ বিমানকে ফেরত যেতে হয়। বিমান হামলায় আটকে পড়া বিদেশিরা কেউই হতাহত হননি।
নয়াদিল্লিতে একজন ভারতীয় মুখপাত্র বলেছেন, পূর্ব-পাকিস্তানে আকাশ যুদ্ধে পাকিস্তানের একটি এফ-৮৬ স্যাবরা যুদ্ধজেট বিমানকে ভারতীয়রা ভূপাতিত করেছে এবং পাকিস্তানিরা আরো একটি বিমান হারিয়েছে। অপরদিকে রেডিও পাকিস্তান বলেছে, পূর্ব-পাকিস্তানের কুমিল্লা জেলার লাকসামে বিমান যুদ্ধে একটি ভারতীয় হান্টার জেট যুদ্ধ বিমান ভূপাতিত হয়েছে। পাকিস্তান দাবি করছে, গত চার দিনের যুদ্ধে তারা ভারতের ৯৫টি বিমান ধ্বংস করেছে। অপরদিকে ভারত বলছে, এই যুদ্ধে পাকিস্তান ৫২টি যুদ্ধ বিমান হারিয়েছে এবং ভারত ১৯টি। ভারতীয় মুখপাত্র জানিয়েছেন, পূর্ব-পাকিস্তানে চট্টগ্রামসহ অন্যান্য বন্দরে অবস্থানরত পাকিস্তানি জাহাজ ও লক্ষ্য বস্তুতে ভারতীয় নৌবাহিনী বিমান হামলা চালিয়েছে এবং চারটি পাকিস্তানি ডেসট্রয়ার জাহাজ ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
নয়াদিল্লিতে ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের মুখপাত্র বলেছেন, পাকিস্তানকে রসদ সরবরাহের সন্দেহে ভারতের দক্ষিণ-পূর্বে মাদ্রাজে এক্সপেডিটর নামে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বাণিজ্যতরীকে আটকে রাখা হয়েছে। এদিকে বাকআই স্টেট নামে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় একটি বাণিজ্যতরীকে হামলা করার যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ ভারতীয় কর্তৃপক্ষ অস্বীকার করেছে।


