মুহাম্মাদ আইয়ুব ❑ আজকাল বাতাসে কান পাতলেই শোনা যায় ডিজে সহ হরেক রকম বাদ্য যন্ত্রে উথাল পাথাল গান। বিয়ে, খৎনা, গায়ে হলুদ, জন্মদিন, পুতুলের বিয়ে সহ নানান দিবসে নানান রকম গান ডিজিটাল এই যুগে গান বাজনা ছাড়া উৎসব মানে মরা বাড়ির হাউমাউ কান্না।
একসময় গ্রামগঞ্জে মৃদুস্বরে গান বাজনা হলেও এখন রীতিমতো নর্তকীরা এসে নৃত্যের তালে তালে নববী মধুময় পরিবেশকে বিষাদময় করে তোলে। আজ পঞ্চায়েত আর মুরব্বিদের শাসন নিভৃতে কাঁদে। যুবক-তরুণদের কাছে মুরব্বি বাবারা জিম্মি নয় বরং নাচের পুতুল।
আজকের গান অধ্যুষিত সমাজ আমাদের মনে করিয়ে দেয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সেই ভবিষ্যদ্বাণীর কথা যেখানে তিনি আমাদের এই কলুষিত সমাজ ব্যবস্থা সম্পর্কে বলেছেন, ‘শেষ যুগে এই উম্মতের এক সম্প্রদায়কে বানর ও শূকরে বিকৃত করে দেওয়া হবে।’ সাহাবিরা বললো, ‘হে আল্লাহর রাসুল, তারা কি আল্লাহ এক ও মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসুল হওয়ার সাক্ষ্য দেয় না?’ নবিজি (সা.) বললেন, ‘হ্যাঁ তারা রোজা রাখে, নামাজ পড়ে এবং হজও আদায় করে।’ সাহাবিরা বললো, ‘তাহলে তাদের অপরাধ কী?’ নবিজি (সা.) বললেন, ‘তারা ঢাকঢোল, বাদ্যযন্ত্র ও গায়িকা মহিলা বরণ করবে। এই লোকগুলো আমোদ-প্রমোদ ও মদ্যপানে মত্ত অবস্থায় রাত কাটাবে। সকালে দেখা যাবে, তাদের বানর ও শূকরে বিকৃত করে দেওয়া হয়েছে।’ (আসবাহানি, হিলয়াতুল আউলিয়া : ৩/১১৯-১২০)
অন্য হাদীসে হযরত সাহল বিন সা’দ (রা.) থেকে বর্ণিত। নবিজি (সা.) বলেছেন, ‘আমার উম্মতের মাঝে ধ্বংস, পাথরবৃষ্টি এবং চেহারা বিকৃতকরণ শাস্তি আসবে।’ সাহাবায়ে কেরাম বললো, ‘হে রাসূল! কবে এই আজাব আসবে?’ নবিজি (সা.) বললেন, ‘যখন বাদ্যযন্ত্র ও গায়িকা মহিলাদের খুব বিস্তার ঘটবে আর মদকে হালাল মনে করা হবে।’ (তাবারানি, আলমুজামুল কাবির : ৬/১৫০; তিরমিযি, আসসুনান : ২২১৩; সনদ হাসান)
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন যে, ‘যখন কেউ উচ্চস্বরে গান ধরে, আল্লাহ তায়ালা তার কাছে দুইটা শয়তান পাঠান, যারা তার দুই কাঁধে বসে সে গান থেকে বিরত হওয়া পর্যন্ত তার বুকে আঘাত করতে থাকে।’ (ইবনু হাযম, আলমুহাল্লা : ৯/৫৮)
যারা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে, যাকাত দেয়, হজ্জ করে, তাবলীগ করে, পীর সাহেবের দরবারে ঢুঁ মারে তারাও বিয়ে শাদিতে হুঁশ হারিয়ে ফেলেন।
পাঠক! আজকের যুগই কিন্তু গান বাজনার উৎকর্ষতার যুগ। ঢোল তবলার যুগকে দাফন দিয়ে আজ নিত্য নতুন বাদ্যযন্ত্র মার্কেট দখল করে নিয়েছে। বর্তমান অনুষ্ঠান মানেই জোরসে বাজাও। বাজনা নেই তো অতিথি নেই। যত বড় অনুষ্ঠান তত বড় ‘মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা’ সংস্কৃতির নামে বিদেশী অশ্লীল অপসংস্কৃতির অবাধ বিচরণ। যারা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে, যাকাত দেয়, হজ্জ করে, তাবলীগ করে, পীর সাহেবের দরবারে ঢুঁ মারে তারাও বিয়ে শাদিতে হুঁশ হারিয়ে ফেলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভবিষ্যদ্বাণী বাস্তবায়নে কোমরে গামছা বেঁধে ময়দানে নেমে পড়েছে।
আজ সারা বিশ্ব একযোগে গান বাজনার মূর্ছনায় মেতে উঠেছে। ইসলামি শরীয়ার কোন তোয়াক্কা না করে নির্দ্ধিধায় প্রবৃত্তির তাড়নায় বিভোর। অথচ আল্লাহ পাক আল কুরআনের বিভিন্ন সুরায় কড়া ভাষায় গান বাজনার ভয়াবহতা ও শাস্তির কথা তুলে ধরেছেন এবং সুস্পষ্ট ভাবে বলে দিয়েছেন যে, ‘যারা ঈমানদারদের মধ্যে অশ্লীলতার প্রসার পছন্দ করে, তাদের জন্য ইহকাল ও পরকালে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি রয়েছে। আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না।’ (সুরা : নুর, আয়াত: ১৯) ‘আর মানুষের মধ্যে থেকে কেউ কেউ অজ্ঞতাবশত আল্লাহর পথ থেকে মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য ‘বেহুদা কথা’ ক্রয় করে, আর তারা সেগুলো নিয়ে হাসি-ঠাট্টায় লিপ্ত হয়। তাদের জন্য রয়েছে লজ্জাজনক আযাব।’ (সুরা লুকমান, ৩১ : ৬)
এবং হাদীসেও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ সম্পর্কে ইরশাদ করেন, ‘তোমরা গায়িকা (দাসী) ক্রয়-বিক্রয় কর না এবং তাদেরকে গান শিক্ষা দিও না। আর এসবের ব্যবসায় কোনো কল্যাণ নেই। জেনে রেখ, এর প্রাপ্ত মূল্য হারাম।’ (জামে তিরমিযী হাদীস : ১২৮২; ইবনে মাজাহ হাদীস : ২১৬৮)
বর্তমান তো গান ও বাদ্যযন্ত্রের বিশাল বাজার তৈরি হয়েছে যাতে কোটি কোটি টাকা ইনভেস্ট করা হচ্ছে। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, এর সকল উপার্জন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাদীস অনুযায়ী সম্পূর্ণ হারাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও ইরশাদ করেন, আমার উম্মতের কিছু লোক মদের নাম পরিবর্তন করে তা পান করবে। আর তাদের মাথার উপর বাদ্যযন্ত্র ও গায়িকা রমনীদের গান বাজতে থাকবে। আল্লাহ তাআলা তাদেরকে যমীনে ধ্বসিয়ে দিবেন। (সুনানে ইবনে মাজাহ হাদীস : ৪০২০; সহীহ ইবনে হিব্বান হাদীস : ৬৭৫৮)
সুন্নাহ আঁকড়ে জীবনটা অতিবাহিত করা অধিক শ্রেয় ও বুদ্ধিমানের কাজ।
তাই আজ একজন মুসলিম হিসেবে আমার জন্য এই ভবিষ্যদ্বানী থেকে কতিপয় করনীয় থেকেই যায়। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেন, পানি যেমন (ভূমিতে) তৃণলতা উৎপন্ন করে তেমনি গান মানুষের অন্তরে নিফাক সৃষ্টি করে। (ইগাছাতুল লাহফান ১/১৯৩; তাফসীরে কুরতুবী ১৪/৫২) একারণেই আজ আমরা আমাদের কোন ইবাদাতেই মহান মাওলাকে দেখার ও পাওয়ার কোন স্বাদ পাই না।
প্রিয় পাঠক! আল্লাহ পাক যখন মুসলমান হিসেবে দুনিয়াতে প্রেরণ করেছেন তখন তাঁর অনুগত হয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ আঁকড়ে জীবনটা অতিবাহিত করা অধিক শ্রেয় ও বুদ্ধিমানের কাজ। ইসলামে যেহুতু গান বাজনা সম্পূর্ণ হারাম। সুতরাং মুসলিম হয়ে এখানে গা ভাসিয়ে দেওয়ার কোন মানে নেই। হাফ মুসলমান হাফ মুনাফিক হয়ে উভয় জাহানে ভবঘুরে জীবন কাটানোর কোন অর্থ হয় না।
সুতরাং আসুন প্রবৃত্তির অনুসরণে জীবনটাকে রঙহীন না করে আল্লাহর রঙে রঙীন হই। নিষ্পাপ এক জীবন গড়ে শয়তানকে তাক লাগিয়ে দিই। জীবন থেকে দুষ্টটাকে গুডবাই জানাই।
লেখক : খতিব, শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক
![]()


