পাথেয় ডেস্ক : পেরুর আন্দিজ পর্বতমালার গা ঘেঁষে ছোট শহর ইসকুচাকা। শহরটিতে সারি সারি একতলা ঘর ঘিরে রয়েছে ইউক্যালিপটাস আর পাইন গাছ। সেখানে একটি ঘরে জড়ো হয়েছেন একদল নারী, যাদের সবার গল্প কিছুটা একই রকম। মিথ্যা তথ্য দিয়ে তাদের বন্ধ্যা করে দেওয়া হয়েছে।
ওই নারীদের একজন হোসেফিনা খিসফে। তিনি বলেন, ‘একদিন সকালে আমি রান্নাঘরে রান্না করছিলাম। দুজন নার্স আমার দরজায় এলো। ওরা আমাকে বলল, তুমি আমাদের ক্লিনিকে একটু আসবে? তোমার সঙ্গে আমাদের কিছু কথা আছে।’
হোসেফিনা সেই ঘটনার বর্ণনা করে আরও বলেন, ‘ওরা আমাকে একটি ঘরে নিয়ে জিজ্ঞেস করল, আমার কয়টা বাচ্চা। আমি বললাম, পাঁচ। ওরা আমাকে বলল, আর কতকাল তুমি শূকরের মতো এমন বাচ্চা পয়দা করবে? আমি কাঁদতে আরম্ভ করলাম। কয়েকজন নার্স মিলে জোর করে আমার কাপড় খুলে আমাকে সাদা একটা পোশাক পরিয়ে দিলো।’
হোসেফিনাকে একটি ইনজেকশন দেওয়া হয়েছিল। জ্ঞান ফেরার পরও তিনি বুঝতে পারেননি, আসলে তার সাথে কী অন্যায় হয়ে গেছে। শুধু এই এলাকাতেই দুই হাজার নারীকে এভাবে কায়দা করে বন্ধ্যা করে দেওয়া হয়েছে।
পেরুর সাবেক প্রেসিডেন্ট আলবার্তো ফুজিমোরির শাসনামলে ১৯৯০ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত প্রায় তিন লাখ নারীকে জোর করে বন্ধ্যা করা হয়েছে, যা স্বেচ্ছায় হওয়ার কথা ছিল।
অনেক নারীই অভিযোগ করছেন, তারা এ সম্পর্কে কিছুই জানতেন না। এমন ঘটনা শিকার মূলত গ্রামীণ নারীরা।
তাদের একটি বড় অংশ আদিবাসী। তাদের একজন কনসেপসিওন কনটয়। তিনি গিয়েছিলেন স্থানীয় হাসপাতালে সন্তান প্রসব করতে।
ওই নারী তার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, ‘ছেলেটা জন্ম হওয়ার পর আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেললাম। আমার জ্ঞান ফিরল পরের দিন সকাল সাতটার দিকে। আমি টের পেলাম, আমার পেটে একটা অংশ কাটা।
আমার স্বামী আমাকে দেখতে এলো। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ওরা আমার কী করেছে। আমার পেট কাটা কেন? আমার স্বামী ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করতে গেলে, ওরা তাকে বলল, তোমার স্ত্রীর ভিটামিন দরকার। এখন তাড়াতাড়ি এই কাগজটায় সই করো।’
পেরুর আদিবাসীরা মূলত কেচুয়া ভাষায় কথা বলেন। স্প্যানিশ ভাষায় লেখা কাগজে লেখা সেটি না বুঝেই সই দিয়েছিলেন কনসেপসিওনের স্বামী। তিনি জানতেও পারেননি, তিনি আসলে বন্ধ্যাকরণের কাগজে সই করছেন।
আলবার্তো ফুজিমোরির শাসনামলে জোর করে নারীদের বন্ধ্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ।
পেরুতে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন হাজার হাজার নারীকে এভাবে জোরপূর্বক বন্ধ্যাকরণের জন্য সাবেক প্রেসিডেন্ট আলবার্তো ফুজিমোরির বিচার হবে কি না।
এপ্রিলে আলবার্তোর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করেছেন রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি।
পেরুতে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের নির্বাহী পরিচালক মারিনা নাভারো। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘যেসব নারীকে জোর করে বন্ধ্যা করা হয়েছে, তাদের প্রতি যে অবিচার হয়েছে, তার বিচারের প্রথম ধাপ হলো আলবার্তো ফুজিমোরির বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের।’
কিন্তু হাজার হাজার নারীর ক্ষতিপূরণের কথাও মনে করিয়ে দিলেন মারিনা। এত কিছুর পরও পেরুতে এমন অনেকেই রয়েছেন, যারা মনে করেন না, এখানে কোনো অন্যায় হয়েছে।
এমন একজন ফুজিমোরির কংগ্রেসম্যান কার্লোস টুবিনো। তিনি বলেন, ‘ফুজিমোরি যখন ক্ষমতায় ছিলেন, তখন সরকার এমন কোনো আদেশ জারি করেনি। কাউকে যদি বন্ধ্যা করা হয়, তাহলে তা তাদের ইচ্ছাতেই করা হয়েছে। আর কাউকে যদি জোর করে বন্ধ্যা করা হয়, তার জন্য একটি দেশের রাষ্ট্রপতি দায়ী নন।’
সাবেক প্রেসিডেন্ট আলবার্তো ফুজিমোরি এখন মৃত্যুপথযাত্রী। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের হলে তার বিচার হয়তো হবে না। কিন্তু অন্তত অভিযোগ যে দায়ের হয়েছে, তাতে আশার সঞ্চার হয়েছে হাজার হাজার নারীর মনে।


