প্রিয় উস্তাদ মুফতী সাঈদ আহমাদ পালনপুরি রহ. স্মরণে
মুফতী সায়্যিদ সালমান মানসুরপুরী :: ১৪৪১ হিজরীর ২৫ রমযান, ২০২০ সালের ১৯ মে, মঙ্গলবার। আমরা ও আমাদের মত অন্যান্য হাজারো মানুষের জন্য মর্মান্তিক দুঃখঘন একটি দিন ছিল। পূবাকাশে আলো ফোটার কালে আমাদের বড় প্রিয়, সম্মানিত, মুশফিক উস্তাদ, ওয়ালি উল্লাহি চিন্তা-দর্শনের মুখপাত্র, নানুতুবির জ্ঞানভা-ারের ধারক, দারুল উলুম দেওবন্দের শায়খুল হাদীস ও সদরুল মুদাররিসীন, জগদ্বিখ্যাত মুহাদ্দিস হযরত মাওলানা সাঈদ আহমদ পালনপুরী মুম্বাইয়ের একটি হাসপাতালে নিজের রব ও মালিকের পরম আরাধ্য সান্নিধ্যে পাড়ি জমিয়েছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজেঊন।
পৃথিবী আসা-যাওয়ার জায়গা এতো সত্য। যে আসবে যেতে তাকে হবেই। তা সত্ত্বেও কারও কারও প্রস্থানে তার স্মৃতিময়তা মনোজগতে দগদগে আঁচড় কেটে যায়। তার অভাববোধে হৃদয় পীড়িত হয় বছরের পর বছর। বিশেষতঃ কোনো আলেমে রব্বানির পৃথিবী থেকে প্রস্থান এমন অপূরণীয় ক্ষতি কিয়ামত অবধি যার কোনো ক্ষতিপূরণ হয় না। কোন হৃদয় চায় না মেনে নিতে। আমিরুল মুমিনীন, চতুর্থ খলিফা হযরত আলী রা. বলেন, ‘যখন কোন আলেম ইন্তেকাল করেন, পৃথিবী এমন অপূরণীয় ক্ষতির শিকার হয়; কোন কিছুই যা পূরণ করতে পারে না।’ (কাশফুল খফা। খ-: ১, পৃষ্ঠা: ৮৭)
পৃথিবীর প্রতি প্রত্যেক আলেমের-ই একটি বিশেষ অবদান থাকে। তার মৃত্যুর সাথে সাথে তার কর্মের ধারাবাহিকতা থেমে যায়। বাহ্যিকভাবে সবকিছু স্বাভাবিক দৃষ্টিগোচর হলেও পদে পদে তার শূণ্যতা অনুভূত হয়। আমাদের উস্তাদ, উস্তাদুল আসাতিযা মুফতী সাঈদ আহমদ পালনপুরী রহ. ছিলেন সেই পর্যায়ের একজন আলেমে রব্বানী।
সৌর বছর অনুযায়ী ৭৮ ও চন্দ্র বছর অনুযায়ী ৮০ বছর আয়ু পেয়েছিলেন তিনি। অর্ধ শতাব্দিকাল দারুল উলুম দেওবন্দের শিক্ষকতার আসন অলঙ্কৃত করেছেন। নববি জ্ঞানের অমীয় সুধার নির্মল ঝর্ণাধারায় সিক্ত করেছেন হাজার হাজার তৃষ্ণার্ত ব্যাকুল ছাত্রদের জ্ঞানতৃষ্ণা। কেবল এই শিক্ষকতা নয়; অসংখ্য উপকারবহুল ব্যাখ্যাগ্রন্থ, মৌলিক কিতাবাদি রচনা করে বড় এহসান করেছেন উম্মতের উপর। তাঁর এসব অবদানে তিনি সকলের মনে চির অমর হয়ে থাকবেন। জাতির জন্য নিদর্শন হিসেবে থাকবেন চিরকাল।
দুজাহানের সর্দার জনাব রাসূল সা. এরশাদ করেন, ‘মানুষ যখন মৃত্যুবরণ করে তিনটি বিষয় ব্যতিরেকে বাদবাকি সব আমল তার থেমে যায়। এক. সদকায়ে জারিয়া। দুই. উপাকারি ইলম। তিন. সুসন্তান। যে তার জন্য দোআ করে।’
আল্লাহ তায়ালা হযরতকে উপরোক্ত তিনটি বিষয়-ই দান করেছেন। সদকায়ে জারিয়া, উপকারী ইলম ও সুসন্তান যার সবকয়টি হযরতের জন্য পৃথিবীতে আমলনামা ভারি করে তোলা আর কিয়ামতের ময়দানে তার মাকামকে উন্নত স্তরে নিয়ে যাওয়ার মাধ্যম হতে থাকবে ইনশা আল্লাহ।
রাসূল সা. আরও এরশাদ করেছেন, ‘তোমরা তোমদের মৃতদের ভালো কর্মগুলো নিয়ে আলোচনা কর।’ (সুনানে আবু দাউদ। হাদিস নং : ৪৯০০) বিশেষত, এইসব মনীষা ব্যক্তিত্ব যাদের কর্ম ভবিষ্যত প্রজন্মকে পথের দিশা জোগাবে, যাদের ব্যক্তিত্ব তাদের জন্য অনন্য আদর্শ হয়ে উঠবে; সেসব মনীষীর অনুসরণীয় কর্ম-কর্মপন্থা সামনে নিয়ে আসা, আলোচনা করা উপকারি বিষয় বৈ কি?
এজন্য, হযরত রহ. এর কিছু আদর্শ গুণাবলী নিয়ে সংক্ষিপ্তাকারে আজ আলোচনা করব, আমাদের পঙ্কিলতায় পিচ্ছিল জীবনে সেসব গুণাবলী বাস্তবায়নের জযবা যাতে আমাদের হৃদয়ে তৈরি হয়। আল্লাহ তায়ালা তাওফিক দান করুন।
এক. সময়ের মূল্যায়ন
হযরত রহ. এর জীবনের অন্যতম একটি উজ্জ্বল দিক ছিল সময়ের মূল্যায়ন। মূল্যবান জীবনের ক্ষণিক সময়ও তিনি নষ্ট হতে দেন নি। ইলমের পথে প্রতিন্ধকতা ও আঁড় সৃষ্টি করে এজাতীয় যাবতীয় বিষয় থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখেছেন সবসময়। যারা তাকে খুব কাছে থেকে দেখেছেন তারা একবাক্যে এ কথার স্বীকৃতি দিবেন, প্রাকৃতিক ও নুন্যতম যে পার্থিব চাহিদা তা ব্যতিরেকে বাদবাকি সময় কোন না কোন কল্যাণ ও উপকারবহুল কাজে তিনি ডুবে থাকতেন।
মাদ্রাসার সময়টা অধ্যাপনা বা প্রয়োজনানুসারে শিক্ষা-ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে কোন মশওয়ারায় অংশগ্রহণে পার করতেন। বাড়িতে থাকাকালীন সেই দরসের প্রস্তুতি, মুতালাআ, লেখালেখিতে দীর্ঘক্ষণ বুঁদ হয়ে রইতেন। ফাঁকেতালে সময় পেলে ঘরের বাচ্চাদের কোন কিতাব পড়াতেন। দেখিয়ে দিতেন। মোটকথা, নিজের জীবনকে এমন দারুণ রুটিনে সাজিয়ে তুলেছিলেন, সামান্য সময়ও তার নষ্ট হওয়ার মত ছিল না। এরই ফলপ্রসূতায়, এরই বরকতে আল্লাহ তায়ালা তার মাধ্যমে এমন বিশাল বিশাল কাজ করিয়েছেন, যার প্রস্তুতিতেই এক একটা একাডেমি লেগে যাওয়ার কথা।
হযরত পালনপুরী রহ. এর জীবন আমাদের সামনে এই আদর্শ মেলে ধরে, নিজ জীবনের লক্ষ্যপূরণে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হয়ে সম্পূর্ণ মনোযোগকে একদিকে নিবদ্ধ করে, যে ব্যক্তি ছঁককষা একটি রুটিন মাফিক জীবনকে পরিচালিত করবে সাফল্য তার মুঠোয় ধরা দেবেই। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে নিজেদের সময় ও খোদাপ্রদত্ত যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়ন করার তাওফিক দান করুন।
দুই. অপরিসীম যোগ্যতার আধার
আল্লাহ তায়ালা হযরত মুফতি পালনপুরী রহ. কে নানামুখি যোগ্যতার চূড়ান্ত পরাকাষ্ঠা প্রদান করেছিলেন। নাহু-সরফ থেকে শুরু করে ফিকাহ-হাদিস-তাফসির সর্ববিধ বিষয়ে তার যোগ্যতার সরব পদচারণা ছিল। জায়গা বুঝে প্রয়োজানুনাসারে গোযামিল রক্ষা করে এসবের বিন্যাস প্রদানেরও এক অপরিসীম যোগ্যতা ছিল তাঁর। আর এ কথা বলার অপেক্ষা থাকে না, এই যোগ্যতা একদিনে অর্জন হবার নয় মোটেও। দীর্ঘদিনের পরিশ্রম-চেষ্টা ও সাধনা ব্যতিরেকে এ হয় না।
নিজের এই যোগ্যতা অর্জনের উপায়-উপকরণ সম্বন্ধে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি শাহী মুরাদাবাদ মাদ্রাসার দস্তারবন্দি অনুষ্ঠানে (মঙ্গলবার, ০৪ জুন, ২০১৩) বলেন, ‘মাদ্রাসাতে খালি পড়লেই ইলম অর্জন হয় না। কেবল পরীক্ষা দিলেই ইলম অর্জন হয় না। আপনারা বলবেন, ‘আমি তো পড়ছি, পরীক্ষা দিচ্ছি!’
আসল কথা হল, পড়া দুই কিসিমের। এক. বাবার দিকে তাকিয়ে পড়া। দুই. নিজের জন্য পড়া। বাবার দিকে তাকিয়ে পড়লে আর যাই হোক ইলম অর্জন হবে না। আমি ‘চাহারম’ পর্যন্ত বাবার দিকে তাকিয়েই পড়াশোনা করেছি। শরহে জামিতে এসে আমি সাহারানপুরে ভর্তি হই। সাহারানপুরের এমন কোনো গলি ছিল না যেখানে আমি তখন সাইকেল চালাই নি। ইত্ববসরে হঠাৎ টাইফয়েডে আক্রান্ত হলাম। টেলিগ্রাম করলে বাবা এসে আমাকে বাড়িতে নিয়ে গেলেন। এইটা জানা থাকা দরকার যে, আমি খুবই দরিদ্র পরিবার থেকে এসেছিলাম। একদিন শুনলাম বাবা দাদিকে বলছেন, ‘এই ছেলেটাকে এখন আর পড়াতে পারব কিনা! অসুস্থ হয়ে পড়ল, নিয়ে আসলাম তারপর অষুধ-পানিতে এই একগাদা খরচের ধাক্কা তারপর আবার যদি পাঠাই তো সেই খরচ অনেক হয়ে যাবে। এদিকে পড়াশোনা করে না কিছুই।’
দাদির কাছে কোন উত্তর ছিল না এ কথার। আমি সব কথা শুনছিলাম। ভেতরে তখন বোধ জাগ্রত হল, ‘আমাকে পড়তেই হবে।’ সারারাত আমি এপাশ-ওপাশ করে কাটালাম। আলো ফুটতেই দাদির কাছে গিয়ে বললাম, ‘আমার মাল-সামানা গুছিয়ে দেন’ আর চলে এলাম মাদ্রাসায়।’ সেই দিন থেকে আজ এই ৭২ বছর বয়সেও আমি নিজের জন্য পড়ছি।’
হযরতের এই বক্তব্যে ইলম অর্জনের প্রতি তাঁর দৃঢ় সংকল্পবদ্ধতা, হিম্মত এবং শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত সেই সংকল্পে অটল অটুট থাকার বিষয়টি সহজেই অনুমেয়। আমাদের প্রত্যেকের জন্য অবশ্যই এটা একটা উত্তম আদর্শ।
পাশাপাশি বর্তমান বৈশ্বিক পরিম-লের চাহিদাকে সামনে রেখে তিনি গুজরাতি ও ইংলিশেও সমান দক্ষতা অর্জন করেছিলেন। শিক্ষার্থীদেরকেও এর প্রতি প্রতিনিয়ত উৎসাহ প্রদান করে গেছেন।
শাহী মুরাদাবাদ মাদ্রাসার দস্তারবন্দি মজলিসে বক্তব্য দিতে গিয়ে আরও বলেন, ‘শৈশবে গুজরাতি ভাষা আমি একদমই শিখিনি। কখনো ইচ্ছাও ছিল না গুজরাতে বসবাস করব। কিন্তু তকদিরের ফয়সালা আমাকে গুজরাতেই টেনে আনল। আমি ভাবলাম সারাজীবন তো গুজরাতেই থাকতে হবে। তো বাইরের কাজ-কাম চালাতে গুজরাতি ভাষা শেখা লাগবে। রানদিরে অধ্যাপনাকালে এক অমুসলিম মাস্টারকে ডাবল পারিশ্রমিক দিয়ে আমি তখন গুজরাতি ভাষা শিখলাম। এ ভাষাতে আমার ব্যুৎপত্তি এতোটা অর্জিত হয়েছে যে, পাঁচ-পাঁচটা কিতাব আমি গুজরাতি ভাষাতে লিখেছি। এখন তা ছাপার অক্ষরে পাওয়া যাচ্ছে।
এরপর আমার মাথায় এল, আরে ইংলিশও শিখতে হবে। ইংলিশ ছাড়া দুনিয়াতে চলা দায়! সাউথ আফ্রিকান আমার এক ছাত্র ছিল ইংলিশে বেশ পাকা। আমি তাকে বললাম, ‘আহমদ, তুমি আমাকে ইংলিশ শেখাও।’ সে তখন জালালাইনে পড়ে। প্রতিদিন আসরের পর আমাকে ইংলিশ শেখাতে আরম্ভ করল। শিখতে শিখতে আমার নিজের মধ্যে এ পরিমাণ আত্মবিশ্বাস এসে পড়ল ভাবলাম এবার আলিগড়ে গিয়ে পরীক্ষা দিয়ে ডিগ্রিটা নিয়ে আসি। কিন্তু কিছুদিনের মাথায় বাদ দিলাম এই চিন্তা। মনজুড়ে আশংকা দানা বাঁধল, ‘গতিপথ পরিবর্তনের মাধ্যম আবার না হয়ে বসে এটা!’
আলহামদুলিল্লাহ। আজ নিজের প্রয়োজন মেটাতে পারি এতোটুকু ইংলিশ আমার দখলে আছে। তাই আমি বলি কি, নিজেদের মধ্যে যে ঘাটতি আমাদের রয়েছে যদি তা নিজ থেকেই পূরণে সচেষ্ট হয়ে উঠি তবে কেউ আমাদের দিকে আর আঙ্গুল তুলতে পারবে না।’
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য হযরত পালনপুরী রহ. এর এই কর্মপ্রদ্ধতিও একটি উত্তম আদর্শ বটে।
তিন. তুলনাহীন বোঝানোর যোগ্যতা
হযরত মুফতী পালনপুরী রহ. এর এই যোগ্যতা সর্বজনবিদিত ও স্বীকৃত বিষয়। এই ক্ষেত্রে উচ্চতর মর্যাদায় সমাসীন তিনি। তার পাঠদান পদ্ধতি ছিল খুব সুন্দর। অনুপম তুলনাহীন এক প্রতিভা ছিল। অন্যকে কঠিন থেকে কঠিনতর বিষয় যথাযথভাবে বুঝিয়ে একদম গুলিয়ে খাইয়ে দেয়ার বিশেষ এ যোগ্যতা বলে তিনি ছাত্রদের মাঝে খুব জনপ্রিয় এবং ব্যাপকভাবে মাকবুল ছিলেন। হযরতের প্রতিটি দরস নিঃসন্দেহে স্মরণযোগ্য ও নিদারুণ উপভোগ্য দরস ছিল।
মহামহিম আল্লাহর অপার রহমতে ১৪০৭ হিজরী, ১৯৯৭ খৃষ্টাব্দে হযরতের তিরমিযী ও ত্বহাবির দরসে অংশগ্রহণের সৌভাগ্য লাভ হয়। সময়টা ছিল হযরত রহ. এর পরিপূর্ণ ইলমি সময়। সুস্থতা ও শক্তির দিক দিয়ে তিনি তখন পুরো চাঙ্গা। দরসের প্রতি তাঁর গুরুত্ব ছিল এক কথায় বেমেছাল। সারাবছরের হিসাব কষলে এক কি দুদিন মিলবে কোনো ওযরবশত হযরত দরসে আসেননি। অন্যথায় প্রতিদিন শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ইলমি মুক্তো ছড়ানো আলেমানা শানে কোনো ক্লান্তি ও বিরতিবিহীন টানা দুই-আড়াই ঘণ্টার দরস চলত। কঠিন থেকে কঠিন, দুর্বোদ্ধ থেকে দুর্বোদ্ধতর জটিল মারপ্যাচের আলোচনাকে কী সহজ করেই না বলতেন; যেন শ্রোতাকে পানিতে গুলে খাইয়ে দিচ্ছেন। হযরতকে আল্লাহ তায়ালা এ বিশেষ গুণ দান করেছিলেন। একারণে তার দরস নীচু থেকে নীচু পর্যায়ের ছাত্রদেরও প্রচণ্ড হৃদয়গ্রাহী ছিল। দরস আরম্ভ হওয়ার আগেই দাওরা হাদিসের রুম ভরে যেত কানায় কানায়। পরে আসলে বসতে হত দরজাতে।
দরসে তার কথার, আলোচনার ধরণ এতোটাই মধুর ও হৃদয়গ্রাহী ছিল, শুরু থেকে দরসের শেষ অবধি কান তো বটেই শরীরে প্রতিটি রোমকূপও পূর্ণ মনেযোগ নিবদ্ধ করত। গোটা দরসরুমে বিরাজ করত পিনপতন নিরবতা। আইম্মায়ে মুজতাহিদীনের প্রত্যেককে যথাযথ সম্মান দান করে বিরোধপূর্ণ বিষয়ের এমন দারুণ বিশ্লেষণের অবতারণা করতেন, প্রতিটি কথা হৃদয় ছুঁয়ে যেত। শুরু থেকে শেষ দরসের প্রতিটি লহমায় উলুম ও মাআরিফের বারি বর্ষণে প্রতিটি বাঁকে পুলকে সবাই কেঁপে কেঁপে উঠত যেন। হাদিসের অনুবাদের পাশাপাশি প্রাসঙ্গিক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা এতোটা সহজবোধ্য হৃদয়স্পর্শী ঢঙে তুলে ধরতেন, এমনিতেই আত্মস্থ হয়ে যেত সকলের।
এই বৈশিষ্ট্যের কারণেই হযরত রহ. এর দরস অবর্ণনীয় গুরুত্ব ধারণ করত। কেউই তার দরসে অনুপস্থিত থাকতে চাইত না। দরসের মধ্যেই খাতায় নোট টুকে রাখত। ইলমি এই মণিমুক্তোর অনল বর্ষণ যতটুকু সম্ভব কুড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করত সবাই।
হযরতের দরসে ইবারত পাঠকারীরা বছরের শুরুতেই নির্বাচিত হয়ে যেতেন। যারা সহিহ এরাব ও বিশুদ্ধ উচ্চারণে হযরতের মেজায মাফিক কোথায় থামতে হবে বুঝে পাঠ করতেন।
চার. উপকার করার চেষ্টা
হযরত পালনপুরী রহ. জীবনভর ‘খালকে খোদা’, বিশেষত ইলমে নববীর অনুসন্ধানী ছাত্রদের জন্য নিজেকে উপকারী করে গড়ে তুলতে বিরামহীন প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। অধ্যাপনা ও পাঠদানের বিষয়টিতো সকলের সামনেই আছে। এছাড়াও অসংখ্য অমূল্য ব্যখ্যাগ্রন্থ ও কিতাবাদি তিনি রচনা করে গিয়েছেন চিরকাল যেখান থেকে ছাত্র ও শিক্ষকগণ উপকারিতা অর্জন করে যাবেন। হযরতের এই কাজ তার আমলনামায় কিয়ামত পর্যন্ত নেকির পাল্লা ভারি করে যাবে নিঃসন্দেহে।
এমনিতে তো তিনি ছোট-বড় অসংখ্য কিতাব রচনা করেছেন। কিন্তু হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ-এর পাঁচ খ-ের বিরাট পরিসরে উর্দু ব্যাখ্যাগ্রন্থ রহমাতুল্লাহিল ওয়াসিআ খুবই উঁচু দরজার কাজ। আহলে ইলম এ বিষয়ে সম্যক অবগত আছেন যে, হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ কিতাবটি উচ্চতর ইলমি ও দর্শনপূর্ণ আলোচনায় সমৃদ্ধ হওয়ার ফলে সাধারণ মানুষ তো ছার বড় বড় আলেমগণও কুপোকাত হয়েছেন তার মর্মোদ্ধারে। কিতাবটির আলোচনা গভীরতর হওয়া, তার মর্মোদ্ধারে কোনো বিশ্লেষণ সহযোগী না থাকায় ব্যাখ্যাগ্রন্থ রচনার সাহস দেখাননি কেউ।
বিরাট মাপের এই কাজের জন্য আল্লাহ তায়ালা হযরত পালনপুরীকেই নির্বাচন করে রেখেছিলেন। খোদাপ্রদত্ত একান্ত ইলমি যাওকের বহিঃপ্রকাশ দেখিয়ে তিনি নিতান্তই সহজবোধ্য করে কিতাবটির ব্যাখ্যাগ্রন্থ রচনার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন। মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যেই ৩ হাজার ৬শ পৃষ্ঠার এই বিশাল পাঁচ খ-ের ব্যাখ্যাগ্রন্থ পূর্ণ করে তাক লাগিয়ে দেন। এটা যে বর্তমান সময়কালের সবচেয়ে বৃহৎ ইলমি কাজ তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কোনো সন্দেহ নেই দারুল উলুম দেওবন্দের অনন্যতার শীর্ষে থাকা খেদমতের একটি এটি। ওয়ালি উল্লাহের জ্ঞানভা-ারের সহজবোধ্য বিশ্লেষণ সামনে নিয়ে এসে তিনি উলামায়ে হক্বের উপর বিরাট এহসান করেছেন। এ কৃতজ্ঞতার কোনো অন্ত নেই। তার এ কাজ সকলের মনে চির স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
বর্তমানের এই যৌক্তিকতা প্রিয় পৃথিবীতে এ জাতীয় কিতাবের অধ্যয়ন আবশ্যক পর্যায়ের। সমকালীন নানাধরণের উদ্ভূত সন্দেহ-আপত্তিকে উত্তম উপায়ে খ-ন করার যোগ্যতা অর্জনে এ কিতাবের অধ্যয়ন না করলেই নয়।
অনুরূপ হযরত পালনপুরী রহ. এর ‘তাফসীরে হেদায়েতুল কুরআন’ তাফসীর প্রসঙ্গে বৃহৎ একটি কাজ। এখানে বেশ হৃদয়গ্রাহী ঢঙে কুরআনের বিষয়াবলীকে তুলে আনার প্রয়াস পেয়েছেন।
এসব ব্যতিরেকে হযরত রহ. এর পূর্ণ তত্ত্ববধানে বুখারী ও তিরমিযীর দরসি আলোচনা সাহেবজাদা মাওলানা হুসাইন আহমদ পালনপুরী সুবিন্যস্ত আকারে ‘তুহফাতুল কারী’ (১১ খ-), ‘তুহফাতুল আলমায়ী’ (৮ খ-) নামে নিয়ে এসেছেন ছাপার অক্ষরে। এটাও বিশাল পর্যায়ের ইলমি কাজ। এর মাধ্যমে ছাত্র-শিক্ষকগণ প্রতিনিয়ত উপকারিতা লাভ করে চলেছেন। আল্লাহ তায়ালা হযরত মুফতী পালনপুরী রহ. কে এর উত্তম বিনিময় দান করুন। আমিন।
পাঁচ. জ্ঞানীসুলভ গাম্ভীর্য
হযরত রহ. সারাটা জীবন আলেমানা শান ও আত্মমর্যাদাবোধের সাথে অতিবাহিত করেছেন। এবং যে ইলম আল্লাহ তায়ালা তাঁর সিনায় আমানত রেখেছিলেন তার পুরাপুরি মান রেখেছেন। একজন সত্যিকারের আলেমের জীবন যেমন হওয়া উচিত তার নিদর্শন হুজুরের গোটা জীবন যেটা আমরা দেখেছি। আমরা কয়েক বছর হুজুরের বাড়ির কাছে দেওবন্দের মহল্লা ‘বেরুন কোটলা’ থেকেছিলাম এবং একই মসজিদে হযরতের সাথে নামাজ পড়ার সৌভাগ্য হয়েছে। তখন দেখেছি হুজুর নিজ ঘর থেকে পায়ে হেঁটে দারুল উলূম যেতেন। অধিকাংশ সময় মাথায় পাগড়ি আর তার উপর সাদা রুমাল থাকত। অবনত দৃষ্টিতে হাঁটতেন। সামনেই যে-ই পড়ত তাকে আগে সালাম দেওয়ার গুণ ছিল।
এমন ঘটনা খুব কমই ঘটেছে, হুজুরের আগে কেউ তাঁকে সালাম দিতে পেরেছে। আল্লাহ পাক হুজুরকে বিশেষ ভাবগাম্ভীর্য দান করেছিলেন। যে কেউ হুজুরের সাথে হুটহাট কথা বলতে সাহস পেত না। প্রত্যেকদিন হুজুরের বৈঠকখানায় বিশেষ ইলমী মজলিস বসত, যেখানে শুধু ইলমী আলোচনা ও নসিহত হত। অধিকাংশ সময় ছাত্রদেরকে স্বীয় উস্তাদ আল্লামা ইব্রাহিম বালিয়াবী রহঃ এর নসিহতনামা বিশেষভাবে বয়ান করতেন। একবার বললেন,”আমি যখন পড়ানোর জন্য রান্ধির (গুজরাত) রওয়ানা হলাম তখন হযরতুল উস্তাদ আল্লামা ইব্রাহিম বালিয়াবিকে কিছু নসিহত করার অনুরোধ করলাম। হযরত বললেন, ‘মৌলভী সাব! ভোরবেলা এসো।
আমি ভোর চারটায় এলাম। হযরত আগে দাঁড়িয়ে মোয়ানাকা করলেন তারপর বললেন, ‘(এক) ফন দেখে দেখে পড়াবে। ইলম আসবে। অর্থাৎ যদি ফিকহ পড়াও তাহলে পুরো ফিকহের জগত ঘেটে ফেলবে। উপরে বাদায়ে’, শামী পর্যন্ত আর নিচে তা’লিমুল ইসলাম, বেহেশতী জেওর। কেননা কোন কোন সময় তা’লিমুল ইসলাম আর বেহেশতী জেওরে এমন এমন মাসআলা মেলে যেগুলো আমরা অনেক বড় বড় কিতাবাদি ঘাটাঘাটি করেও পাইনা। (দুই) আর বললেন, সুন্নতের অনুসরণ করবে তাহলে মর্যাদা বেড়ে যাবে। (তিন) আরও বললেন, ছাত্রদেরকে নিজের সন্তান মনে করবে।’ (নেদায়ে শাহী ডিসেম্বর ২০০৩)
হযরত মুফতি সাহেব (রহঃ) অধিকাংশ সময় বলতেন, এগুলো হচ্ছে হযরতের মূল্যবান নসিহত যা থেকে আমি অনেক অনেক উপকৃত হয়েছি। আমি হযরতের এ অনুগ্রহের কথা কোনদিন ভুলব না। অনুরূপভাবে অমুখাপেক্ষিতা ও নিজ পায়ে দাঁড়ানো ছিল হুজুরের অনন্য বৈশিষ্ট্য। বারবার বলতেন, ‘কোনো লোকের জন্যই টাকা পয়সার গোলাম হওয়া উচিত নয়, হাদিসেও এর থেকে নিষেধ করা হয়েছে।’
হযরতের কামনা ছিল, মাদ্রাসার ফারেগীনরা সারাজীবন ইলমের মাঝেই নিমগ্ন থাকবে এবং নিজের কর্মকে পরিবর্তন করবে না। অনেকবার হযরতের সামনে আধুনিক শিক্ষাপদ্ধতির এমন কিছু প্রতিষ্ঠানের আলোচনা করা হয় যেখানে মাদ্রাসার ফারেগীনদেরকে সহজে আধুনিক শিক্ষা দেওয়া হয়। তখন হযরত বলতেন, মাদ্রাসায় পড়ুয়া উচ্চ মেধা সম্পন্ন ছাত্ররা যদি এমন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দিকে ঝুঁকে যায় তাহলে দ্বীনের প্রয়োজন কিভাবে পূর্ণ হবে? কেননা আধুনিক শিক্ষা গ্রহণের পর অল্প বেতনের দ্বীনি খেদমতে অটল থাকা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে।’
ছয়. মাযহাবের উপর অটলতা
হযরত রহ. নিজের ফিকহী মাসলাক তথা ফিকহে হানাফির উপর পুরোপুরি অটল ছিলেন এবং কোনো মাসআলাতেই ফিকহী জুযইয়্যাত ও উসুলের উপর প্রশ্ন উত্থাপন সহ্য করতে পারতেন না। অনুরূপভাবে দেওবন্দের আকাবির উলামায়ে কেরামের দৃষ্টিভঙ্গির উপরও হযরতের গভীর দৃষ্টি ছিল। তাঁর কাছে এগুলো থেকেও মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার অনুমতি ছিল না।
তিনি বাতিল মতাদর্শ দ্বারা কখনোই প্রভাবিত হতেন না, বরং যখনই এ বিষয়ে আলোচনা শুরু করতেন তো দলিল প্রমাণাদির আলোকে মজবুত আলোচনা পেশ করতেন। এক্ষেত্রে কারো কোনও নিন্দা বা প্রশংসার তোয়াক্কা করতেন না। নিজের শিষ্যদেরকেও তিনি এভাবে গড়ে তুলতেন যে, তারাও যেন হক্বের উপর অটল অবিচল থাকে এবং উলামায়ে দেওবন্দের পদাঙ্ক অনুসরণ করে। এ ব্যাপারে যখনই কোনও অলসতা দেখতেন সাথে সাথেই সতর্ক করতেন।
এ ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাচারিতা ও সালফে সালেহীনদের মানহাজ থেকে দূরে সরে যাওয়াকে তিনি সমস্ত অনিষ্টের মূল মনে করতেন। এ কারণেই তিনি মাওলানা মওদূদীর ভ্রান্ত চিন্তা-চেতনা এবং গাইরে মুকাল্লিদদের চাল চলন সাংঘাতিক অপছন্দ করতেন। হযরতের সুস্পষ্ট অবস্থান এই ছিল যে, এই বক্র চেতনা মানুষকে আহলুসসুন্নাহ ওয়াল জামাতের গ-ি থেকে বের করে দেয়।
একবার জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের তত্ত্বাবধানে হযরত মাওলানা সাইয়্যেদ আস’আদ মাদানী সাহেবের সভাপতিত্বে দিল্লিতে ‘তাহাফফুজে খতমে নবুওয়াত’ কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়। তো হযরত মুফতি সাহেব (রহঃ) ঐ কনফারেন্সে মাযহাব না মানার ভয়ংকর দিকগুলো স্পষ্ট করে তাঁর বক্তৃতা তুলে ধরেন। এ বক্তৃতা এমন প্রভাব বিস্তার করেছিল যে, এই বক্তৃতাকেই কনফারেন্সের সারাংশ বলা হয়।
সাত. উৎসাহ প্রদান
হযরত মুফতি সাহেব রহ.-এর বিশেষ এক বৈশিষ্ট্য এই ছিল যে, হযরত বয়সে তাঁর ছোট ও শিষ্যদেরকে মৌখিক ও লেখনীর মাধ্যমে অনেক উৎসাহ প্রদান করতেন। যে কারণে তারা সামনে অগ্রসর হওয়ার প্রেরণা পেত। যখনই হযরত নিজের কোনও শাগরেদের ইলমী খেদমতের কথা জানতেন তখন তিনি খুব খুশি হতেন এবং দোয়ার বৃষ্টিতে তাকে সিক্ত করতেন।
সফরকালীন সময়ে সফরসঙ্গীর সাথে খোলা মনে চলতেন, যে কারণে সফরে কোনও অনাকাঙ্খিত ঘটনার মুখোমুখি হতে হতো না। এই অধমেরও একাধিকবার হযরতের সাথে সফর করার সৌভাগ্য অর্জিত হয়েছে।
একবার মুম্বাইয়ে ‘মাদ্রাসা মেরাজুল উলূম চিতা ক্যাম্পে” অনুষ্ঠান ছিল এবং হযরত মুফতি সাহেব রহঃ এর সাথে আলোচকদের মাঝে হযরত মাওলানা শওকত আলী সাহেব বাসতবি, সাথে আমি অধমেরও নাম ছিল।
যখন আমরা মাদ্রাসা থেকে অনুষ্ঠানস্থলে রওয়ানা হলাম তখন গাড়িতে বসার আগে হযরত মুফতি সাহেব (রহঃ) আমাদের দুইজনকে এক পাশে ডেকে নিয়ে বললেন, ‘নির্ভয়ে আলোচনা করবে এবং আমার কারণে বয়ান সংক্ষেপ করবে না’। আসল কথা হচ্ছে হযরতের সামনে মুখ খোলা কোনও সহজ কাজ ছিল না; কিন্তু হযরত সাহস দিলেন। সুতরাং অনুষ্ঠানে ভয়ে ভয়ে এক সংক্ষিপ্ত হাদিসের তরজমা করলাম তারপর যখন হযরত বয়ান করলেন তখন হযরতও আমার আলোচনার রেফারেন্স দিলেন। এটা উৎসাহ প্রদান না তো কি?
হযরত মুফতি সাহেব রহ. আমি অধমের একাধিক গ্রন্থের ভিতর উৎসাহব্যঞ্জক লেখা লিখেছেন। আমি অধমের ধারাবাহিক লেখা ‘আল কুরআনের জামে’ বয়ান’ শিরোনামে নেদায়ে শাহীতে ৭২ পর্বে ছাপা হয়। তারপরে এটা গ্রন্থ আকারে প্রকাশ হয়। তো হায়দ্রাবাদের ফিকহী কনফারেন্স থেকে ফেরার পথে বিমানে আমি গ্রন্থের কপিটা এক নজর দেখে দেওয়ার জন্য হযরতের খেদমতে পেশ করি। হযরত রহ. সম্পূর্ণ গ্রন্থে একবার চোখ বুলিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, এটা ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা ইনসাফের নির্দেশ দিচ্ছেন’ এই আয়াতের সারমর্ম না?
যখন আমি অধম হ্যাঁ সূচক উত্তর দিলাম তখন খুব উচ্ছসিত হলেন এবং দেওবন্দ ফিরে ‘কুরআনী আয়াতের সালমানী ওয়াজ’ শিরোনামে আমাকে একটি দোয়া সম্বলিত চিঠি প্রেরণ করলেন যেটা পড়ে আমি অধমের অনেক শরম লাগল এবং ফোনে আরয করলাম, ‘আমার ব্যাপারে হযরতের এ সুধারণা অনেক বড় সৌভাগ্যের বিষয়! হুজুর অনেক দোয়া দিলেন এবং খুশি প্রকাশ করলেন।
হুজুর নেদায়ে শাহী খুব গুরুত্ব দিয়ে পড়তেন এবং সাক্ষাতের সময় বিষয়বস্তুর উপর নানান আলোচনাও করতেন। একবার বললেন, ;আমি নেদায়ে শাহীর ওফাত সনের কলামটা অবশ্যই পড়ি, এর থেকে অনেক হযরতের মৃত্যু সনদ জানতে পারি এবং তাঁদের জন্য দোয়া করার সুযোগ হয়।’
তাহাফফুজে খতমে নবুওয়াত
১৯৮৬ সালে দারুল উলূম দেওবন্দে যখন ‘আলমী মজলিসে তাহাফফুজে খতমে নবুওয়াত’ বিভাগ প্রতিষ্ঠা করা হল তখন হযরতকে এই বিভাগের সর্বোচ্চ পদে রাখা হল। আব্বাজান শায়খ ক্বারী উসমান দা. বা. কে নাযেমের দায়িত্ব প্রদান করা হয়।
আব্বাজানের কঠোর পরিশ্রম আর একাগ্রতা এবং মুফতি সাহেবের মূল্যবান পরামর্শে আলহামদুলিল্লাহ ‘তাহাফফুজে খতমে নবুওয়াতের’ কাজ সারা দেশে খুব চমৎকারভাবে আঞ্জাম দেওয়া হয় এবং ব্যক্তিগঠনের জন্য বিভিন্ন স্থানে প্রশিক্ষণমূলক ক্যাম্প করা হয় যেখানে সুযোগ অনুযায়ী হযরত মুফতি সাহেব রহ. তাশরিফ আনতেন এবং ‘রদ্দে মির্জায়্যাতের’ নিজের বিশেষ ভঙ্গিতে বয়ান রাখতেন যা উপস্থিত সুধীজনদের মাঝে খুব প্রভাব বিস্তার করত। এ ধরণের অনেক বক্তৃতা হযরতের কতিপয় গ্রন্থের মাঝে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফিকহী সেমিনারে অংশগ্রহণ
জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের ‘ইদারাতুল মাবাহিছিল ফিকহিয়্যাহর’ অধিকাংশ সেমিনারগুলোতে হযরত খুব ইহতিমামের সাথে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আন্তরিকতার সাথে উপস্থিত থাকতেন। সকল প্রবন্ধ ও আলোচনা খুব মনোযোগের সাথে শুনতেন এবং নিজের ইলম ও সিদ্ধান্তের আলোকে মতামত পেশ করতেন। অনেক সময় হযরতের মতামতের সাথে মতানৈক্য হত, কোন কোন সময় হযরতের শিষ্যরা বিভিন্ন দলিল উপস্থাপন করত, কিন্তু অধিকাংশ সময় হযরত মুফতি সাহেব রহ. নিজ মতের উপর অটল থাকতেন এবং মতভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও কারও মতকে মন্দ আখ্যায়িত করতেন না।
একবার অধম হযরতের ঘরে গেলাম। কথাবার্তার মাঝেই হযরত বললেন, ‘আলেম এবং জাহেলের মাঝে পার্থক্য এখানেই, জাহেল মতপার্থক্যের কারণে সম্পর্ক ছিন্ন করে দেয়, অথচ আলেম দলিলাদির আলোকে ইখতেলাফকে ইখতেলাফ পর্যন্তই সীমাবদ্ধ রাখে, এর দ্বারা পুরোনো সম্পর্কে চিড় ধরতে দেয় না।’
নিঃসন্দেহে হুজুরের এই বার্তা এক আলোকিত উপদেশ যা সর্বদা সামনে রাখা উচিত। হযরতের মাদ্রাসা ও অন্যান্য মাহফিলে অংশগ্রহণ অভ্যাস পরিপন্থী ছিল তবে ছাত্র ও সমসাময়িক উলামায়ে কেরামের পীড়াপীড়িতে কিছু কিছু প্রোগামে অংশগ্রহণ করতেন। কয়েক বছর মুরাদাবাদ শহরের জমিয়ত আহুত বাৎসরিক সভা ‘সীরাতে খাতামুন নাবিয়্যিন কনফারেন্সে অংগ্রহণ করে মূল্যবান নসীহত দ্বারা সবাইকে ধন্য করেছেন।
হুজুর কয়েক বছর যাবত শাবানেরম শেষ দশকে পৃথিবীর বিভিন্ন রাষ্ট্রে (লন্ডন, কানাডা, আমেরিকা) লম্বা সফরে যেতেন এবং সেখানকার বিভিন্ন শহরে অবস্থান করতেন। ইলমী ও ইসলাহী খেদমত চালু রাখতেন। অধিকাংশ সময় শাওয়ালের শেষ দিকে প্রত্যাবর্তন করতেন। এর মাধ্যমে হযরতের ফুয়ুজ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ত।
অসুস্থতা ও মৃত্যু
হযরত মুফতি সাহেব রহ. এর স্বাস্থ্য সবসময়ই ভাল ছিল তা সত্ত্বেও বেশ কয়েক বছর যাবত ডায়াবেটিসে ভুগছিলেন এবং ইনসুলিন নিতেন। কয়েক বছর আগে হার্টের সমস্যার কারণে অপারেশনও করতে হয়েছিল তারপর তিনি সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন পুরোপুরি। তবে বিগত কয়েক বছর যাবত কোনকিছু শুনতে সামান্য বেগ পেতে হতো যা অধিকাংশ সময় অনুভূত হতো না, এর সাথে সাথে কখনো কখনো মুখে জড়তাও সৃষ্টি হতো।
এমনই এক ঘটনা এ বছর রজব মাসের মাঝামাঝি দারুল হাদিসে বুখারী শরীফ খতমের পর হয়েছিল। হুজুর অনেক চেষ্টার পরও বুখারী সমাপ্তির পর কথা বলতে যেয়েও পারেননি এবং এটা বলে চলে আসলেন যে, ‘এখন আল্লাহ পাক যা চাইবেন তাই হবে’। এ দৃশ্য দেখে ছাত্রদের মাঝে অস্থিরতা তৈরি হলো এবং সকলের মাঝে হতাশা ছেয়ে গেল।
পরের দিন হযরত চিকিৎসার জন্য মুম্বাই গেলেন, আল্লাহ পাক সুস্থতা দান করলেন এবং ঐ অবস্থা কেটে গেল। কিন্তু যখন ২৪ মার্চ ২০২০ সারা দেশ লকডাউন হয়ে গেল তখন হুজুর দেওবন্দে ফিরে আসতে পারলেন না। এ সময়ে রমজানুল মুবারক চলে আসল; তাই হযরতের শুভাকাঙ্খীরা এটাকে গনিমত মনে করে তাঁর থেকে ইলমি ও রুহানিভাবে উপকৃত হওয়ার জন্য হযরতের কাছে মুম্বাইয়ে থেকে যাওয়ার আবেদন করলেন আর মুফতি সাহেব রহ.ও তাদের আহবানে সাড়া দিলেন। প্রত্যেক দিন তারাবীর পরে হযরতের অনলাইনে বয়ান ও প্রশ্নোত্তরের ধারাবাহিকতা শুরু হয়ে গেল, যা ১৫ রমজান পর্যন্ত চলতে থাকে। এবং এ বয়ানগুলোর মাঝে অনেক মূল্যবান কথা রয়েছে। ইউটিউবে বয়ানগুলো সংরক্ষিত আছে।
এরপর হযরতের প্রচ- জ্বর হলো এবং অসুস্থতা খুব বেড়ে যাওয়ায় ‘মলাড হসপিটালে’ ভর্তি করা হল। প্রথম প্রথম খুব সুস্থতা অনুভব হতে থাকল কিন্তু ইন্তেকালের দুদিন আগে তথা ২৩ রমজানুল মুবারক অবস্থা অবনতির দিকে যেতে লাগল। গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে গেলেন। ডাক্তাররা ফুসফুসে ইনফেকশন টের পেলেন।
পরিশেষে এই অবস্থায়ই ২৫ রমজানুল মুবারক ১৪৪১ হিঃ মুতাবেক ১৯ মে ২০২০ মঙ্গলবার দিন সকালে মহান মাওলায়ে কারিমের ডাকে সাড়া দিয়ে ইহজগত ছেড়ে গেলেন। ইন্না-লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
হাসপাতালেই হযরতের গোসল ও কাফন সম্পন্ন হয় এবং নিকটবর্তী মসজিদের ময়দানে হযরতের সাহেবজাদা মাওলানা আব্দুল ওয়াহিদ সাহেবের ইমামতিতে জানাযার নামাজ অনুষ্ঠিত হয় এবং আসরের পর যোগেশ্বরী ইস্টের সর্বসাধারণের কবরস্থানে হযরতের দাফন কার্য সম্পন্ন হয়।
আল্লাহ তাআলা হযরতের দারাজাতকে বহুগুণে বৃদ্ধি করে দিন। হযরতের খিদমাতের উত্তম থেকে উত্তম বদলা দান করুন। ঘনিষ্ঠজনদের ধৈর্য্য ধারণের তাওফিক দান করুন এবং আমাদের সবাইকে হযরতের পদাঙ্ক অনুসরণের তাওফিক দিন, আমিন ছুম্মা আমিন।
[মাসিক নেদায়ে শাহী, প্রকাশিত: জুন ২০২০ ।। উর্দু থেকে অনুবাদ করেছেন মুফতী আইয়ুব ও মুফতী আব্দুল্লাহ আমান]
– সুস্থ সমাজ বিনির্মাণের সংকল্পে অটুট ‘নিমার্ণ’ সৌজন্য ।। প্রকাশিত: জুলাই ২০২০


