ডাক দিয়ে যাই । লাবীব আবদুল্লাহ
ফজরের পর নিদ্রা ও জীবনের যত ভুল
মাদরাসায় আমার দায়িত্ব ফজরের আগে সবাইকে জাগিয়ে দেওয়া৷ আবাসিক ছাত্র৷ কে মসবুক হলো তাদের শাসন করা৷ ধমক খতমে হাজির না থাকলে৷ সকাল নয়টা থেকে আসর পর্যন্ত দরস৷ মাগরিবের পর ছেলেরা এলো কি না তা খোঁজ নেওয়া৷ ছেলেরা পড়ে না গল্প করে তার খোঁজ নেওয়া৷ নিদ্রার সময় নিদ্রা না গিয়ে গপ্প করলে ওই… হে… তোরা কেন নিদ্রায় যাও না… এই গর্ধবের দল৷ গাধা কাহেকা।
কয়েক শো ছাত্রের জিম্মাদারি৷ আমি কখনও সহকারী কখনো প্রধান ছাড়া একা৷ ফ্লোরে আবাসন৷ আমার ব্যাচেলর চৌকি ছিলো একটি৷ একটি তেপায়া৷ এরটি টেবিলও ছিলো৷ নিজের পয়সায় কেনা বাঁশের তৈরি বুক শেলফ একটি৷ টিফিন ক্যারিয়ার ডাল ভাত বোর্ডিং থেকে খাবার আনার জন্য৷ এই আমার মাদরাসার সংসার৷
১৯৯২-৯৮ পর্যন্ত এক রুটিন৷ এক দিন ঢাকা থেকে এক বন্ধু এলেন৷ রাত যাপন করলেন৷ আলাপ করলেন৷ কেন তিনি এলেন এবং মাদরাসায় থাকতে দিলাম তারও জবাবদেহি করতে হলো উপরতলায়৷ হুজুরগণ বস পছন্দ করেন না৷ আমার উপরের হুজুর বললেন,
তোমার কাছে বাইরের লোক আসে কেন? আমার কাছে লোক আসবে৷ বন্ধুরা আসবে৷ আডডা দেবে৷ খানা খাবে৷ কিন্তু এতে মাদরাসার কী ক্ষতি তা বুঝতে পারলাম না৷ মন খারাপ হলো৷
মনের তো কোন গুরুত্বই নেই এই বন্দীখানায়৷ মন খারাপ তাতে কি? সকাল বিকেল হুটহাট৷ চমক ধমক৷ এইভাবেই কাটলো দিন রাত৷ ময়মনসিংহ শহরে মাদরাসার সেই টিনের কামরাটিই আমার জগৎ সংসার৷
বিয়ে? জীবনে বিয়ে করে কী করবো আমি হুজুর না!
আমার মহরের টাকা কে দেবে? বিয়ে করে রাখবো কোথায়? বিয়ে করলে পনের দিনে ছুটি একদিন৷ বৃহস্পতিবার যেতে হবে৷ জুমার পর মাদরাসায় হাজিরা দিতে হবে৷ বাজে ও অমানবিক নিয়ম এসব৷ কোন জালেম এবং সংসারত্যাগী এই নিয়ম তৈরি করছে জানি না৷ হকের কথা বলা হয় শুধু৷ এই নিয়মে বউ বাচ্চার হক কীভাবে আদায় হবে? বেতন বা অজিফার সময় কারুণের খালাতো ভাই সেই দাজ্জাল মার্কা কমিটি৷ সেই কমিটির গোলাম হলেন মাদরাসার প্রিয়জনেরা ৷ বললাম না৷ ফতোয়া আসবে৷
অধিকাংশ কালেক্টর হলেন জামিয়ার প্রিয়জনরাই ৷
জালেমের চূড়ান্ত সীমাও সেইসব পাঁচ বর্ণের লোকগুলো৷ নিজের স্বার্থ ছাড়া যারা দুনিয়াতে আর কিছুই দেখতে চায় না৷
তাদের বিরুদ্ধে বা পক্ষে কিছুই বলতে চাই না৷ তারা হিসাব রক্ষকের কাছে জিম্মি৷ হিসাব রক্ষক হলেন ভক্ষক টাইপের৷
রক্ষক ভক্ষক যা হোক৷ তারা হোক৷ কিন্তু আরেক বাটপার হলো বোর্ডিং ম্যানেজার৷ খায়েন৷ সেও সেই পাঁচ অক্ষরের স্বার্থ রক্ষা করে নিজের স্বার্থ রক্ষা করতে৷
এইসব কথা বলা মহাপাপ৷ কিন্তু যারা খিয়ানতের সাথে জড়িত হয়ে মাদরাসা ধ্বংস করছে সেটি পাপ নহে৷ সেটি নেকির কাজ!
মাদরাসায় স্বচ্ছতার কথা মাদরাসাবিরোধী৷ কিন্তু যাদের সব অস্বচ্ছ তারাই মাদরাসার রক্ষক! মাদরাসা মেধাহীনদের আখড়া হলেও বলা যাবে না৷ মাদরাসা ছাত্রশূন্য হলেও বলা যাবে না৷ কমিটি লাম্পট্য করলেও বলা যাবে না৷ কিছুই যেহেতু বলা যাবে না তাই বললাম না৷
আমি আমার মাদরাসার কথা বলছি না৷ আমার মাদরাসার কোনো বদনাম আগেও করিনি৷ আগামীতেও নিয়ত নেই৷ আমি বলছি দীনি শিক্ষায় স্বচ্ছতা না থাকলে সমাজে মাওলানাদের আরও অবক্ষয় হবে৷ সমাজ এতো অসচেতন না৷
আমার জীবনে ভুল হলো আমি টুপি দাড়ি দেখলেই তাকে ফেরেশতা স্বভাবের মনে করি৷ দোকানদার হলে দোকানে যাই৷ ডাক্তার হলে চিকিৎসার জন্য যাই৷ বিশ্বাস করি তারা সৎ ও সরল৷ কিন্তু আমি প্রতারিত হয়েছি এই গোষ্ঠীর কিছু ধান্দাবাজের কাছে৷ তারা সরলতার আড়ালে নিজ স্বার্থ ছাড়া আর কিছুই বুঝে না৷ নিজে বাসা করবে৷ প্রসাধ বানাবে৷ জায়গা কিনবে৷ জমির ব্যবসা করবে৷ হজের নামে ধান্দা করবে৷ কিন্তু স্বজাতির আর কাউকে সামনে এগুতো দেবে না৷ গীবত করবে৷ বদনাম ছড়াবে৷ গুতাগুতি করবে৷
তবুও আমি সেই গোষ্ঠীকেই সরলভাবে বিশ্বাস করি৷ আমিও সেই বলদের মতো৷ তৈল বানায় কুলু যারে দ্বারা৷ চক্কর খাই৷ মক্করবাজি করে৷ করে ফক্করবাজি ৷ আমি তবুও হুজুর হুজুর করি৷
জীবনের দুই যুগ পেরিয়ে বুঝি আমার জীবনে সেই মকরবাজের পেছনে দেওয়া ঠিক হয়নি। আমার এসব কথা কেউ আমার উস্তাযের বিরুদ্ধে মনে করলে কষ্ট পাবো৷ আমার মুহতারাম উস্তাযগণ যুগের সেরা ব্যক্তিত্ব৷ তাদের নিয়ে “আমার উস্তাযজী” নামে আমার আলাদা সিরিজ লেখা আছে৷ আমি নানা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চাকুরী উরফে খেদমত করেছি৷ নাম না নিয়ে বলছি৷ এরপরও যদি কথায় ফাওয়াদে কুয়ুদ তালাশ করে প্যাঁচ ধরে কেউ তাহলে আমার করার কিছু নেই।
আমার জীবনের আরেক ভুল, মাদরাসায় জীবনের শুরু শেষ মনে করে সকালে নিদ্রায় যেতাম৷ অলস৷ অালস্য৷ অকর্মন্য৷ যেহেতু মাদরাসায় খেদমত ছাড়া অন্য কিছু করা যাবে না তাই সকালে নিদ্রায় চলে যেতাম৷ ফলে শরীর মোটা, অলসতা বোনাস হিসেবে পেয়েছি৷
সকাল রিজিক তালাশের সময়৷ এই সময় আমি নিদ্রাকে স্বাগত জানিয়ে নিজের জীবন বরবাদ করেছি৷ এই আমার মক্করবাজি৷ এই আমার ফক্করবাজি৷ এই আমার বরবাদি৷ আমিও মোল্লা৷ আমিও হুজুর৷ আমি তখন ছিলাম জামালপুরী হুজুর৷ ডালপুরী নয় আবার৷
তবে বিকেলে দোস্তদের সাথে দোকানে বসে ডাল ও পুরীও খেতাম৷ কিছু দিন ছিলাম “তালীমাত হুজুর”৷ ছাত্রররা ডাকতো আবদুল্লাহ হুজুর৷ তরক্কী পেয়ে এখন উস্তাযজী! লেখা পড়ে রাগের মিটার বাড়লে একটি গালি বা গোলাব দিতে অনুরোধ করলাম আজ৷
আমি আমার ভুল বলছি৷ আমার ভুল আরেক জনের ভুল নয়৷
সকালে না ঘুমিয়ে লিখলে বাজারে আমার আরও কিছু বই থাকতো৷ সকালে ঘুম লেখকদের জন্য ক্ষতিকর৷ ফজরের আগে জেগে লিখলে ভালো৷ নীরব সময়৷ নির্জনে লেখা আসে করোটিতে৷
ইবনে খালদুন ইনস্টিটিউট


