পাথেয় রিপোর্ট : চতুর্থবার এবং টানা তৃতীয়বারের মতো সংসদ নেতা নির্বাচিত হয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
৪ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার দুপুরে জাতীয় সংসদ ভবনে আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের সভায় সর্বসম্মতিক্রমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আবারও সংসদ নেতা নির্বাচিত হন। এর ফলে চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা।
সংসদ নেতা নির্বাচিত হয়ে তিনি ক্ষমতাকে অর্থ অর্জনের হাতিয়ার হিসেবে এবং ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার না করার জন্য দলীয় সংসদ সদস্যদের নির্দেশ দিয়েছেন। সভায় উপস্থিত এক সংসদ সদস্য বলেন, “দলের নবনির্বাচিত এমপিদের সতর্ক করে নেত্রী বলেছেন, আপনারা শুধু নৌকা মার্কার এমপি নন, এলাকার সব জনগণের এমপি। এটা মাথায় রেখেই জনগণের ভাগ্য উন্নয়নে কাজ করতে হবে। তিনি বলেন, ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। আমরা আজকে আছি, আগামীতে থাকব কি না কেউ বলতে পারে না। তাই ক্ষমতাকে কেউ ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করবেন না।
আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য স্বপন ভট্টাচার্য্য বলেন, দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সংসদ নেতা হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নাম প্রস্তাব করেন। এরপর দলের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য আমির হোসেন আমু সেই প্রস্তাব সমর্থন করেন। এরপর প্রস্তাবটি সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। বঙ্গবন্ধুকন্যা পুনরায় সংসদ নেতা নির্বাচিত হওয়ায় দলীয় এমপিরা করতালির মাধ্যমে তাঁকে অভিনন্দন জানান।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে আওয়ামী লীগ। এর আগে দশম ও নবম সংসদ নির্বাচনেও দলটি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ায় তখন সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন শেখ হাসিনা। এ ছাড়া ১৯৯৬ সালে সপ্তম সংসদেও তিনি সংসদ নেতা নির্বাচিত হয়েছিলেন।
কয়েকজন সংসদ সদস্য জানান, পুনরায় সংসদ নেতা নির্বাচিত হলেও শেখ হাসিনা পরবর্তী সময়ে এই দায়িত্ব আর নেবেন না বলে জানিয়েছেন গতকালের সভায়। শেখ হাসিনা বলেন, আমি এবারের মতো দায়িত্ব নিলেও আর নয়। পরবর্তী সময়ে নতুন কেউ দায়িত্ব নেবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। ওই সময় উপস্থিত সবাই সমস্বরে ‘না’ ‘না’ বলে দাঁড়িয়ে যান। তাঁরা বলেন, শেখ হাসিনা যত দিন আছেন, তত দিন তিনিই দলের এবং দেশের অভিভাবক থাকবেন।
জাতীয় সংসদের সাবেক চিফ হুইপ উপাধ্যক্ষ আব্দুস শহীদ বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে ওই সভায় অন্য কেউ বক্তব্য রাখেননি। প্রায় এক ঘণ্টার বৈঠকে সংসদ নেতা বেশ কিছু নির্দেশনা দেন। এ ক্ষেত্রে ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে থেকে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানানোর পাশাপাশি ক্ষমতাকে অর্থ উপার্জনের হাতিয়ার হিসেবে না বানানোর আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
প্রথমবার নির্বাচিত সংসদ সদস্য সিনিয়র সাংবাদিক শফিকুর রহমান বলেন, প্রধানমন্ত্রী অর্থকে বড় করে না দেখার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আপনারা শুধু নৌকার এমপি নন, কে নৌকায় ভোট দিয়েছে, কে দেয়নি, সেটা বিবেচ্য নয়। সবার উন্নয়নে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশকে এগিয়ে নিতে হবে। সভায় শেখ হাসিনা বলেন, পঁচাত্তরে জাতির পিতাকে হত্যার পর অনেকেই মনে করেছিল আওয়ামী লীগ ধ্বংস হয়ে যাবে। কিন্তু সেটা হয়নি। এই নির্বাচন সেটাই প্রমাণ করেছে। আমাদের অনেক দুঃসময় গেছে। লন্ডনে থেকে আমি প্রথম আওয়ামী লীগকে সংগঠিত করি। জনগণ আমাদের পাশে আছে। জনগণ পাশে থাকলে কেউ রুখতে পারবে না বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
সংসদ সদস্যরা শপথ : নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা গতকাল শপথ নিয়েছেন। জাতীয় সংসদ ভবনের শপথ কক্ষে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী তাঁদের তিন দফায় শপথ পাঠ করান। ওই সময় তাঁরা ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে থেকে দায়িত্ব পালনের অঙ্গীকার করেন।
জাতীয় সংসদ ভবনে শপথ অনুষ্ঠানের নির্ধারিত সময় ছিল গতকাল সকাল ১১টা। কিন্তু সকাল থেকেই নির্বাচিত এমপিরা একে একে উপস্থিত হতে থাকেন সংসদ ভবনে। নির্ধারিত সময়েই স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী সংবিধান ও কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী প্রথমে নিজে শপথ নেন এবং শপথ বইয়ে সই করেন। স্পিকার শপথবাক্য পাঠ করার পর প্রধানমন্ত্রী দাঁড়িয়ে হাততালি দিয়ে তাঁকে অভিনন্দন জানান। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে উপস্থিত অন্য সদস্যরাও তাঁকে অভিনন্দন জানান। শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন সংসদ সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব ড. জাফর আহমেদ খান।
স্পিকার নিজে শপথ নেওয়ার পর আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাসহ দলের ২৫৫ জন সংসদ সদস্যকে শপথবাক্য পাঠ করান। এরপর বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির তিনজন, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) দুজন, বিকল্পধারা বাংলাদেশের দুজন, তরিকত ফেডারেশনের একজন, জাতীয় পার্টির (জেপি) একজন এবং স্বতন্ত্র তিনজন সংসদ সদস্য শপথ নেন। সবশেষে শপথ নেন রওশন এরশাদের নেতৃত্বে জাতীয় পার্টির ২১ জন সংসদ সদস্য।
সংসদ সচিবালয় সূত্রে জানা যায়, নির্বাচন কমিশনের গেজেট অনুযায়ী নির্বাচিত ২৯৮ জন এমপির মধ্যে চারটি ধাপে ২৮৯ জন শপথ নিয়েছেন। অসুস্থতার কারণে আওয়ামী লীগের সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম শপথ নিতে পারেননি। তিনি স্পিকারের কাছে চিঠি পাঠিয়ে শপথের জন্য সময় চেয়েছেন। আর জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদের গতকাল বিকেলে শপথ নেওয়ার কথা থাকলেও তিনি পরে স্পিকারের কাছে সময় প্রার্থনা করেন। দুই-এক দিনের মধ্যেই তিনি শপথ নেবেন বলে জানিয়েছেন। আর নির্বাচিত হলেও শপথ না নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন বিএনপিসহ জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সাতজন সংসদ সদস্য।
এ বিষয়ে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, সৈয়দ আশরাফ সাহেব শপথের জন্য সময় চেয়েছেন। উনি দেশে ফিরে আসার পর শপথ নিতে চান। এমনিতেই নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শপথের জন্য ৯০ দিন সময় পাবেন।
শপথ পাঠ করানোর পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে ফুলের তোড়া দিয়ে শুভেচ্ছা জানান স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী। অনুষ্ঠানে এমপিদের প্রথম সারিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডান পাশে ছিলেন আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, মতিয়া চৌধুরী, আবুল হাসান মাহমুদ আলী ও খন্দকার মোশাররফ হোসেন। বাম পাশে ছিলেন সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, ওবায়দুল কাদের, মোহাম্মদ নাসিম ও ড. আব্দুর রাজ্জাক। আর মাঝে নাজমুল হাসান পাপনের পাশে ছিলেন নতুন দুই আলোচিত সংসদ সদস্য মাশরাফি বিন মর্তুজা ও শেখ তন্ময়। শপথ শেষে সংসদের ভিআইপি ক্যাফেটারিয়ায় নতুন এমপিদের জন্য ছিল চা-চক্রের আয়োজন।


