মাওলানা আব্দুল মালেক কি নতুন কোনো ফিতনার দরজা খুলছেন?

মাওলানা আব্দুল মালেক কি নতুন কোনো ফিতনার দরজা খুলছেন?

মাওলানা আব্দুল মালেক কি নতুন কোনো ফিতনার দরজা খুলছেন?

আবু মুতাসিম ● ইসলাম চর্চার নানান ধারা পৃথিবীতে রয়েছে। প্রধান তিনটি ধারায় এই সবগুলিকে শ্রেণীবদ্ধ করা যায়। উগ্রবাদী, শিথিলবাদী ও মধ্যপন্থী। উগ্রবাদী ধারায় জামাতি সালাফি ওয়াহাবি, জঙ্গিবাদি ইখওয়ানি প্রভৃতি গোষ্ঠি রয়েছে। শিথিলবাদি বলতে অতি উদারতাবাদী বেদাতি বা মাজারি মিলাদি নামে পরিচিত গোষ্ঠি। আর মধ্যপন্থী হিসেবে বর্তমান পৃথিবীতে ভারতের দেওবন্দ ধারার অনুসারীরা সমধিক পরিচিত।

আমরা অনেক সময় দেওবন্দের গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে এমনভাবে কথা বলি তাতে কারো কারো বিরূপ ভাব সৃষ্টি হয়। ঠিক করে বোঝাতে না পারলে সত্য ও বাস্তব বিষয়টিও অবাস্তব মনে হয়। কুরআন হাদীসে কোথাও দেওবন্দকে অনুসরণের কথা নেই। কিন্তু মধ্যপন্থার কথা আছে। আর বর্তমান দুনিয়ায় উগ্রবাদ ও শিথিলবাদের মাঝামাঝি কোন দল খুঁজে দেখুন; দেওবন্দী ধারাকেই পাবেন সেই ভারসাম্যের জায়গায়। খোদ দেওবন্দেও আছে নানান চিন্তা নানান মনন। কিন্তু সামগ্রিকভাবে এ ধারার অনুসারীরা বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ি থেকে নিজেদের আঁচল বাঁচিয়ে চলেন। উগ্রতা ও শৈথিল্য যেখানেই হোক তা পরিত্যাজ্য।

আমরা দেওবন্দী ধারার গুরুত্ব বর্ণনা করতে গেলে চরমপন্থী উগ্রবাদীরা বলে, সারা বিশ্বের দিকে তাকান; আরও কত ধারা আছে সেগুলি গ্রহণ করুন।

বাস্তবে ধারা বহু নয়। মৌলিক ধারা এ তিনটিই। বাতিলের বিভিন্ন রঙ থাকে। সত্য একটিই হয়। মিথ্যা হয় বহু। সত্যের বিপরীত যত ধারা থাকে তা তার বৈচিত্রময় সৌন্দর্য বোঝায় না; সত্যের বিকল্প বিভৎস বিভিন্নতা বোঝায়।

নানামুখি চিন্তানৈতিক সমস্যায় আমরা আক্রান্ত। এর ভেতর প্রধান সমস্যা কোনটি তা আমাদের আবিস্কার করতে হবে। তাহলেই সামাজিক মৌলিক সমস্যাগুলি সমাধান আমাদের জন্য সহজ হবে।

কিছু দিন যাবৎ সোশ্যাল মিডিয়ায় নব্য মৌদুদিবাদ নিয়ে আলোচনা চলছে। মার্কাজুদ্দাওয়ার মাওলানা আব্দুল মালেক সাহেবকে নিয়ে শুরু হলেও এ ব্যামো অনেক বেশি ছড়িয়ে পড়েছে আমাদের কাওমি অঙ্গনে। যদিও সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করতে হলে আরও সময় প্রয়োজন। বাতিলকে চিহ্নিত করা না গেলে তা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। ধরে ফেলতে পারলে তা নিয়ে কোনো টেনশন থাকে না। কারণ বাতিল সে তো মাকড়শার জাল। ফু দিলেই তা উড়ে যায়। আপাত দৃষ্টিতে যতই শক্তিশালী মনে হোক না কেন বাতিলের মূলত কোনো শক্তি থাকে না। ইন্নাল বাতিলা কানা যাহুকা। আল্লাহর এ শাশ্বত বাণী সত্যের পূজারিদের চির আশ্বস্ত করে এসেছে।

নানামুখি চিন্তানৈতিক সমস্যায় আমরা আক্রান্ত। এর ভেতর প্রধান সমস্যা কোনটি তা আমাদের আবিস্কার করতে হবে। তাহলেই সামাজিক মৌলিক সমস্যাগুলি সমাধান আমাদের জন্য সহজ হবে। চিন্তা চেতনা ধ্যান ধারণা ও জ্ঞানগত দিকগুলিই অন্য সব দিক পরিচালিত করে। কাজেই আমাদের মানসিকতার ঐক্যের কথাটি ভাবা প্রয়োজন।

সিরাতে মুস্তাকিমকে আত্মস্থ করতে সূরা ফাতিহায় কিতাব ও রিজাল উভয়টির প্রতি সমান গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। সিরাতাল্লাযিনা আনআমতা আলাইহিম বলে রিজালের দিকে করা হয়েছে স্পষ্ট ইঙ্গিত। ইসলাম চর্চার তিনটি ধারার ভেতর দেখা যায় যারা রিজাল ছেড়েছে তাদের ভেতর উগ্রতা ছড়িয়ে পড়েছে। আর যারা কিতাব পরিত্যাগ করেছে তারা শৈথিল্য আক্রান্ত হয়েছে।

রিজাল ছাড়া যারা কেবল কিতাব নিয়ে থাকে তাদের ভেতর রহম দিলি থাকে না। কারণ সুকোমল হৃদয়বৃত্তির জন্য প্রয়োজন উন্নত মানসিকতার মনীষীদের সংস্পর্শ। কিতাব কথা বলতে পারে না। কিতাবের ভেতর কোনো প্রাণ থাকে না। কিতাব থেকে হৃদয়বৃত্তির সবক নেওয়া যায় বটে কিন্তু সেটা বাস্তবে নিজের হৃদয়ে প্রতিষ্ঠা করতে হৃদয়বান মানুষের সাহচর্য ধন্য হতে হয়। রিজলের সহযোগিতা ব্যতীত মূক কিতাব দিয়ে উন্নত মানসিকতার অধিকারী হওয়া অসম্ভব।

দেওবন্দ ও উলামায়ে দেওবন্দের কথা কুরআন হাদীসে নাই। কুরআন হাদীসে আছে ভারসাম্যপূর্ণ পথের অনুসরণের কথা। বাস্তবতা হচ্ছে বর্তমান চরম ফিতনার সময়ে উলামায়ে দেওবন্দ সেই ভারসাম্যপূর্ণ পথের ধারক বাহক।

পক্ষান্তরে যারা কেবল রিজাল নিয়ে থাকে তাদের ভেতর অতি ভক্তি ও ঔদার্যের নামে শিথিলতার ভাব চলে আসে। তার কারণ তারা কিতাবুল্লাহর কঠোরতা থেকে পলায়নপর। কোনও বাধ ছাড়া যেমন পুকুর বা প্রস্নবণ জমে না তাদের চিন্তা চেতনারও কোনো পাড় না থাকায় অতি উদারতার নামে সরলপথচ্যুত হয়ে যায় মনের অজান্তে।

দেওবন্দ ও উলামায়ে দেওবন্দের কথা কুরআন হাদীসে নাই। কুরআন হাদীসে আছে ভারসাম্যপূর্ণ পথের অনুসরণের কথা। বাস্তবতা হচ্ছে বর্তমান চরম ফিতনার সময়ে উলামায়ে দেওবন্দ সেই ভারসাম্যপূর্ণ পথের ধারক বাহক। যারা সমাজের মানুষকে উলামায়ে দেওবন্দ থেকে বিমুখ করে তারা মূলত ইসলামের শাশ্বত ভারসাম্যপূর্ণ পথ থেকেই বিমুখ করার চেষ্টা করে। রিজাল থেকে বিমুখ করার অর্থই হচ্ছে চরম উগ্রতার দিকে ঠেলে দেওয়া। যেমন কিতাবুল্লাহ থেকে বিমুখ করার অর্থ চরম শিথিলতার দিকে ঠেলে দেওয়া।

মাওলানা আব্দুল মালেক সাহেবের সাথে আমাদের ব্যক্তিগত কোনো শত্রুতা নেই। তার বিরোধিতার অর্থ এখন বহু মানুষের শত্রুতা খরিদ করা। তারপরও আমরা যে তার সম্পর্কে সতর্কবার্তা জারি করছি তার কারণ কোনো বৈষয়িক স্বার্থ নয় বরং দ্বীনী স্বার্থেই আমাদের এ পদক্ষেপ। দীর্ঘ সময় পর্যবেক্ষণের পর আমরা এ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি। শুরু থেকেই দেখে আসছি তিনি উলামায়ে দেওবন্দের ব্যাপারে তালিবুল ইলমদের মাঝে বিরূপ ভাব সৃষ্টি করে আসছেন। দেওবন্দের প্রতি ভক্তিকে তিনি আসাবিয়াত বলে ব্যক্ত করে আসছেন। হক হাক্কানিয়াতের জন্য রিজালের প্রয়োজন নেই; কুরআন হাদীস আমাদের জন্য যথেষ্ট এমন এক চেতনা সৃষ্টির চেষ্টা করছেন। তার চিন্তা চেতনার স্বরূপ স্পষ্ট হতে সময় লেগে গেলেও যতই দিন যাচ্ছে তিনি তার অবস্থানে আরও দৃঢ় হয়ে বসছেন। এখন স্পষ্ট মতবিনিময়ের সময় এসে গেছে।

আপনি কী করে বুঝবেন, যে ভুল ধরছে সে মনীষীদের থেকে বিমুখ করতে চাচ্ছে না নির্মোহভাবে ভুলটাই চিহ্নিত করছে? মূলত বৃক্ষের নামপরিচয় ঠিক হয় ফলের দ্বারা।

আকাবির আসলাফ ও রিজালের ভুল হওয়া অসম্ভব নয়। কিন্তু তাদের পুরো জীবন কখনও ভুল হয়ে যায় না। সত্য সুন্দরের মূল কথাগুলো তাদের জীবনে জাজ¦ল্যমাণ। সিরাতে মুস্তাকিমের দিশা আমরা তাদের কাছ থেকেই পেয়েছি। তাদের ছোটখাটো ভুল যা হয় তা হাজারটা সৌন্দর্যের ভেতর আড়াল হয়ে থাকে।

আপনি কী করে বুঝবেন, যে ভুল ধরছে সে মনীষীদের থেকে বিমুখ করতে চাচ্ছে না নির্মোহভাবে ভুলটাই চিহ্নিত করছে? মূলত বৃক্ষের নামপরিচয় ঠিক হয় ফলের দ্বারা। মাওলানা মওদূদি আকাবিরের ভুল ধরা শুরু করলে তার ভক্ত ও শিষ্যদের ভেতর যে প্রভাব হয়েছে তা থেকেই বোঝা গেছে সে কেবল ভুলই ধরছে না। তাদের ঠিকটা থেকেও মানুষকে বিমুখ করার ষড়যন্ত্র করছে। গোড়া বা শেকড় থেকে গাছকে বিচ্ছিন্ন করার মতই উম্মাহকে পূর্বসূরী মহান মনীষীদের অনন্য সূত্র থেকে সরিয়ে নেওয়াই বাতিলপন্থীদের চিরকালীন মিশন।

মাওলানা মওদুদিকে মাওলানা মাদানী ও মুফতী কেফায়াতুল্লাহ রহ. এক সময় আলজমিয়ত পত্রিকার সম্পাদক বানিয়েছিলেন। তার প্রতিভার মূল্যায়ন করতেন আকাবিরে দেওবন্দ। পরবর্তীতে মওদূদির প্রতি ব্যক্তিগত কোনো আক্রোশ থেকে তারা বিরোধিতা করেননি। বরং ইসলাম ও মুসলমানের জন্য ক্ষতিকর মনে করার কারণেই তার বিরোধিতা করেছেন।

সম্প্রতি ঢাকার দুজন বড় দেওবন্দী আলেম মাওলানা আব্দুল মালেক সাহেবের প্রতি তাদের চরম ভক্তির প্রকাশ ঘটিয়েছেন। দুজনই জামিয়াতুল উলুমিল ইসলামিয়ার শিক্ষক। মাওলানা আবুল বাশার সাহেব ও মাওলানা আব্দুল মতিন সাহেব। মাওলানা আবুল বাশার সাহেব বলেছেন, মাওলানা আব্দুল মালেক বর্তমান পৃথিবীর মানুষের জন্য আল্লাহর হুজ্জত। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বলের সাথে তিনি তুলনা করেছেন তাকে। বর্তমান সময়ে তার মত আলেম তিনি আর দেখেননি। সুতরাং মাওলানা আব্দুল মালেক যা বলেন সবার তা বিনা বাক্য ব্যয়ে মেনে নেওয়া উচিত বলেও মত দিয়েছেন তিনি।

অপরজন মাওলানা আব্দুল মতীন সাহেব আরও স্পষ্ট করে বলেছেন, আমরা কাজি সাহেবের কাছে পড়েছি, মাওলানা নূর হুসাইন কাসেমীর কাছে পড়েছি, দেওবন্দে বড় বড় আলেমের কাছে পড়েছি কিন্তু মাওলানা আব্দুল মালেক সাহেবের মত বড় আলেম আমরা দেখিনি। তিনি শুধু বাংলাদেশ নয় পুরো বিশ্বের মানুষের জন্য রহমত।

ইতিহাসে নজর বুলালে খুব অবাক হতে হয়। কি বিস্ময়করভাবে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হয়। আজ থেকে প্রায় একশত বছর আগে দুজন শ্রেষ্ঠ আলেম একইভাবে মাওলানা মওদূদির প্রতি তাদের ভক্তি প্রকাশ করেছিলেন। নুমানি ও নদভী। মাওলানা আলি মিয়া নদভী অনেক উচু বংশের ছিলেন। মাওলানা মনজুর নুমানি ছিলেন কীংবদন্তীতুল্য মুহাদ্দিস আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশমিরির ছাত্র। তা সত্ত্বেও তারা মওদূদি দ্বারা প্রচ-প্রভাবিত হয়েছিলেন। সবাইকে ছেড়ে তারা হিজরতও করেছিলেন মওদূদির দারুল ইসলামে।

মওদূদির বিরুদ্ধে প্রথম কলম ওঠান শাইখুল ইসলাম মাওলানা সায়্যিদ হুসাইন আহমাদ মাদানী রহ.। দারুল উলুম দেওবন্দ ও সাহারানপুর মাজাহিরুল উলুম মাদরাসার অনেক উস্তাদও মওদূদী দ্বারা প্রভাবিত হয়ে গিয়েছিলো। শাইখুল ইসলাম রহ. সতর্কবার্তা জারির পর অন্যদের ঘুম ভাঙ্গে। মওদূদীর মোহ ধীরে ধীরে কাটতে থাকে দেওবন্দী ঘরানার ভেতর থেকে। একসময় একদম এক সাইড হয়ে যায় মওদূদী পন্থীরা। সর্বমহলে স্বীকৃত হয়ে যায় বাতিলপন্থী, আকাবির বিদ্বেষী হিসেবে।

মনীষীদের প্রতি কতটা বিদ্বিষ্ট হলে এক দিনে শতাধিক নবীকে হত্যা করা যায় তা সত্যি ভাবা যায় না। সেই পরিস্থিতিতে গেলে আমাদের এ দেশের দীনী পরিবেশ ধ্বংস হয়ে যাবে। দেশে শুরু হয়ে যাবে চরম হানাহানি। গালাগাল তাকফির ও তাহকিরে নষ্ট হয়ে যাবে ধর্মীয় আবহ।

বক্রার্থে মালেকবাদ নামে নামকরণ করে নতুন এ ফেতনাকে হালকা করার প্রয়োজন নেই। রম্য রচনা দিয়ে তরুণরা যেন আমাদের ক্ষতি না করেন। ঠাণ্ডা মাথায় ভাবতে হবে বর্তমান সময়ের এ বড় ফেতনাটিকে। রিজালুল্লাহ থেকে সমাজকে সরিয়ে দেওয়ার এ ফিতনা ইহুদিদের থেকেই এসেছে। মনীষীদের প্রতি কতটা বিদ্বিষ্ট হলে এক দিনে শতাধিক নবীকে হত্যা করা যায় তা সত্যি ভাবা যায় না। সেই পরিস্থিতিতে গেলে আমাদের এ দেশের দীনী পরিবেশ ধ্বংস হয়ে যাবে। দেশে শুরু হয়ে যাবে চরম হানাহানি। গালাগাল তাকফির ও তাহকিরে নষ্ট হয়ে যাবে ধর্মীয় আবহ। পরস্পর শ্রদ্ধাবোধ ও আলেমদের আজমত বাকি রাখতে আমাদের সবাইকে সোচ্চার হতে হবে। আসুন কিতাবুল্লাহ ও রিজালুল্লাহর সমন্বয়ের যে ভারসাম্যপূর্ণ পথ তা গ্রহণ করি। নিজেদেরকে পথভ্রষ্টতা থেকে রক্ষা করি। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন। আমীন। ওয়া সাল্লাল্লাহু তাবারাকা ওয়া তাআলা আলা নাবিয়্যিহি ওয়া আলিহি ওয়া সাহবিহি ওয়া বারাকা ওয়া সাল্লাম।

লেখক : সিনিয়র মুহাদ্দিস ও কলামিস্ট

মতামত একান্তই লেখকের, এর জন্য সম্পাদক দায়ী নয়

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *