মুহাম্মাদ আল দুররার স্মরণে- মাহমুদ দারউইশ

মুহাম্মাদ আল দুররার স্মরণে- মাহমুদ দারউইশ


৩০ সেপ্টেম্বর, ২০০০ সালে ফিলিস্তিনের গাজায় নির্মমভাবে শহীদ করা হয় ছোট্ট ছেলে মুহাম্মাদ জামাল আল দুররাকে। ইসরায়েলী সেনাদের ছোড়া গুলিতে বাবার সামনেই মৃত্যুর কোলে লুটিয়ে পড়ে ১২ বছরের এক নওল কিশোর। সন্তানের লাশ কোলে নিয়ে বসে থাকা অসহায় বাবার ভিডিও মুহুর্তেই ছড়িয়ে পড়ে  সাড়া দুনিয়ার টিভি স্ক্রিনে। সবার মনে ভীষণ দাগ কাটে সেই ঘটনা।  বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ব্যাপক বিক্ষোভ হয় এ নিয়ে। ফিলিস্তিনের কবি মাহমুদ দারউইশ তাকে নিয়ে লেখেন দীর্ঘ কবিতা। পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম- এর পাঠকদের জন্য কবিতাটি আরবী থেকে অনুবাদ করেছেন ইবন হাশিম। শিশু মুহাম্মাদকে নিয়ে লেখা দারউইশের সেই কবিতা আজও প্রতিবাদী হয়ে ওঠে গাজার লক্ষ শিশুর নির্মম খুনের বিরুদ্ধে।

এই কবিতায় এমন একটি পঙক্তি রয়েছে, ‘নবীদের যতটুকু প্রয়োজন তার চাইতে রক্ত অনেক বেশী ঝরেছে’ এর দ্বারা উদ্দেশ্য, শান্তি বিনির্মাণে নবীরা যত রক্ত ঝরিয়েছেন।

 

মুহাম্মাদ আল দুররার স্মরণে

মাহমুদ দারউইশ

 

মুহাম্মাদ,

বাবার বুকে নীড় বেঁধেছে নারকীয় স্বর্গের একটি ভয়ার্ত পাখি:

আমি উপরে উড়ে যাচ্ছি, আমাকে বাঁচাও বাবা..

আমার ছোট্ট ডানা বাতাসের ধাক্কায় ভেঙ্গে আসছে,

এখানে আলোর রঙ ধূসর, বাবা..

**

মুহাম্মাদ,

সে বাড়ি ফিরে যেতে চায়

সাইকেল কিংবা নতুন শার্ট সঙ্গে না নিয়েই।

সে স্কুলে যেতে চায়

ফিরতে চায় ব্যাকরণের নোটবুকের কাছে।

আমাকে বাড়ি নিয়ে যাও বাবা,

আমার পাঠ প্রস্তুত করতে হবে

জীবন একটু একটু করে আমরা পূর্ণ করবো

সমুদ্রতীরের খেজুরগাছগুলোর নিচে,

সেগুলো তো খুব দূরে নয়, তাই না বাবা?

**

মুহাম্মাদ,

আর্মির মুখোমুখি হয়েছিলো ছেলেটা,

হাতে ছিলনা কোন পাথর কিংবা তারকা আকৃতির শ্র‍্যাপনেল

দেয়ালে লেখার ইচ্ছেও তার ছিলোনা-

‘আমার স্বাধীনতা মরবে না’

অবশ্য স্বাধীনতা তার  কোনদিনই ছিলোনা

যাকে সে রক্ষা করবে।

পিকাসোর পায়রার জন্য কোনো দিগন্ত নেই।

প্রতিনয়তই সে জন্ম নেয়,

জন্ম নেয় এমন নামে যার অভিশাপ সে বয়ে বেড়ায়

আর কতোবার সে নিজেই সন্তান প্রসব করবে?

কোন ঘর নেই … শৈশবের জন্য প্রতিশ্রুতি নেই

স্বপ্নরা যখন আসবে কীভাবে সে দেখবে?

পৃথিবী তো একটি ক্ষতস্থান, কিংবা একটি নির্জন মন্দির

**

মুহাম্মাদ,

যে দেখছে মৃত্যু ধেয়ে আসছে তার দিকে

তার মনে পড়ে একটি চিতা বাঘের কথা, যা সে টেলিভিশনে দেখেছিল,

শক্তিশালী সেই চিতা দুগ্ধপোষ্য এক হরিণছানাকে বাগে পেয়েছিলো

চিতাটি তার কাছে গিয়ে কেবল দুধের গন্ধ শোঁকল

তাকে রক্তাক্ত করলো না।

দুধের গন্ধ যেন বন্য জানোয়ারকে বশীভূত করেছে।

তাহলে, আমিও বেঁচে যাবো, ছেলেটি বললো।

সে ফোঁপাতে লাগলো,

আমার জীবন লুকিয়ে আছে

আমার মায়ের বুকে

আমি বেঁচে থাকব… আর সাক্ষী হয়ে থাকব

**

মুহাম্মাদ,

হতভাগা এক দেবদূত

যে তার ঠাণ্ডামাথার খুনির বন্দুকের নলের মুখে দাঁড়িয়ে

ঘণ্টাখানেক ধরে ছেলেটির উপর নজর রেখে চলেছে ক্যামেরা

যার ছায়াতলে সে নিঃসঙ্গ দাঁড়িয়ে

সূর্যোদয়ের মত স্পষ্ট তার মুখ

আপেলের মতো নির্মল তার হৃদয়

তার দশটি আঙুল মোমবাতির মতো স্বচ্ছ

এবং তার ট্রাউজারে শিশিরবিন্দু ঝলমল করছে

খুনির সক্ষমতা ছিলো যে,

বিষয়টি আরেকবার ভেবে দেখবে এবং বলবে-

 আমি তাকে ছেড়ে দেব

যদি সে তার ‘ফিলিস্তিন’কে নির্ভুলভাবে বানান করতে পারে।

বিবেকের তাড়নায় আজ তাকে ছেড়ে দেব

তবে কাল তাকে হত্যা করব, যখন সে আবার বিদ্রোহ করবে!

**

মুহাম্মাদ,

ছোট্ট যিশু ঘুমায়,

স্বপ্ন দেখে প্রতিমার হৃতপিণ্ডে শুয়ে,

যা নির্মিত তামা, জলপাই ডাল ও মানুষের পুনর্ণবীকরিত আত্মার সমন্বয়ে।

**

মুহাম্মাদ,

নবীদের যতটুকু প্রয়োজন তার চাইতে রক্ত অনেক বেশী ঝরেছে

এবার উড়ে যাও সিদরাতুল মুনতাহার কিনারায়

মুহাম্মাদ!

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *