মেট্রো রেলের হুইসেলে হুল্লোড়

মেট্রো রেলের হুইসেলে হুল্লোড়

পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : ব্যাকুল অপেক্ষা। কু ঝিক ঝিক…এই মূর্ছনা শোনার প্রতীক্ষা! ভোরের আলো ফোটার আগে থেকেই আশপাশে উত্সুক মানুষের জটলা। ঘড়ির ঘণ্টার কাঁটা তখন ১১টার ঘরে, মিনিট ৪৯। রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়ী ডিপো থেকে ধীরে ধীরে সাপের মতো এঁকেবেঁকে বেরিয়ে এলো লাল-সবুজের স্বপ্নের মেট্রো রেল। হুইসেলের শব্দ কানে বাজতেই দর্শনার্থী মানুষের উচ্ছ্বাস, হৈ-হুল্লোড়।

মেট্রো রেল উড়ালপথে ওঠার ঠিক আগে থেমে গেল। পাশেই নির্মিত অস্থায়ী মঞ্চ থেকে সবুজ পতাকা নাড়িয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ট্রেনের পরীক্ষামূলক চলাচলের সূচনা করেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। এর পরই হুইসেল বাজিয়ে মিরপুরের পল্লবীর দিকে এগোতে থাকে একটি স্বপ্ন। তখন স্বপ্নজয়ের উচ্ছ্বাসে করতালিতে মুখর চারদিক। পরে উত্তরা উত্তর, উত্তরা সেন্টার, উত্তরা দক্ষিণ ও পল্লবী ঘুরে ঠিক দুপুর ১টা ১০ মিনিটে ফের নিজ ঘর দিয়াবাড়ী ডিপোতে ফেরে ট্রেনটি। আর এর মধ্য দিয়ে আরো এক মাইলফলক স্পর্শ করল মেট্রো রেল।

পরীক্ষামূলক এই চলাচল চলবে আরো ১৪ মাস, যা মাঝেমধ্যেই দূর থেকে দুচোখ ভরে উপভোগ করার সুযোগ পাবে রাজধানীবাসী। গতকাল রবিবার যে ধরনের পরীক্ষামূলক ট্রেন চালানো হয়েছে, প্রকৌশলের ভাষায় তাকে বলে ‘পারফরম্যান্স টেস্ট’। এই পারফরম্যান্স টেস্ট চলবে আরো ছয় মাস। এরপর শুরু হবে মূল পরীক্ষামূলক চলাচল। যাকে বলা হয় ‘ইন্টিগ্রেটেড টেস্ট’। এ সময় ট্রেনের সঙ্গে সংযুক্ত সব ধরনের ব্যবস্থা ঠিকমতো কাজ করছে কি না, তা পরীক্ষা করা হবে। তিন থেকে ছয় মাস চলবে ইন্টিগ্রেটেড টেস্ট। উত্তরা থেকে পল্লবী হয়ে আগারগাঁও পর্যন্ত ইন্টিগ্রেটেড টেস্ট করা হবে। আর বাকিটা সময় যাত্রী ছাড়া বাণিজ্যিক সব ধরন মেনে ট্রেন পরিচালনা করা হবে। একে বলা হচ্ছে ‘বাণিজ্যিক টেস্ট’। তবে ইন্টিগ্রেটেড টেস্টের ফল খুব ভালো হলে বাণিজ্যিক টেস্টের সময় কমে আসতে পারে।

উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রো রেলের দৈর্ঘ্য ২০.১০ কিলোমিটার। এই পথে থাকছে মোট ১৬টি স্টেশন। এর মধ্যে উত্তরা উত্তর, উত্তরা সেন্টার, উত্তরা দক্ষিণ ও পল্লবী। এই স্টেশনগুলো পরীক্ষামূলক (পারফরম্যান্স টেস্ট) চলাচলের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। এই ট্রেনের যখন যাত্রী পরিবহন করা হবে তখন উত্তরা উত্তর স্টেশন থেকে ট্রেনের যাত্রা শুরু হবে।

পরীক্ষামূলক চলাচলের ব্যাপারে মেট্রো রেল লাইন-৬-এর প্রকল্প ব্যবস্থাপক এ বি এম আরিফুর রহমান জানান, পারফরম্যান্স টেস্টের অংশ হিসেবে বিভিন্ন গতিতে উড়ালপথে ট্রেন চলবে। নির্দিষ্ট গতি থাকবে না। তবে পাঁচ থেকে ২৫ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা গতির মধ্যে ট্রেন চালানো হবে। তিনি বলেন, ‘আজ মেট্রো রেলের ডিপোর প্রতিটি ঘাস উচ্ছ্বসিত, আনন্দিত। আমাদের এত দিনের কষ্ট ভালোবাসা সফলতার রূপ নিচ্ছে।’

মেট্রো রেলের পারফরম্যান্স টেস্টের সূচনা অনুষ্ঠানে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘মেট্রো রেল রুট-৬-এর নির্মাণকাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে। ২০২২ সালের ডিসেম্বর নাগাদ ঢাকা মহানগরীতে বাণিজ্যিকভাবে ন্যূনতম উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত মেট্রো রেল চলাচল শুরু করবে। ২০৩০ সালের মধ্যে ছয়টি মেট্রো রেলের সমন্বয়ে প্রায় ১২৯ কিলোমিটার দীর্ঘ ও ১০৪টি স্টেশনের একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হবে।’

এদিকে প্রথম পর্যায়ে নির্মাণের জন্য নির্ধারিত উত্তরা থেকে আগারগাঁও এবং আগারগাঁও থেকে মতিঝিল পর্যন্ত মোট ২০.১০ কিলোমিটার উড়ালপথের মধ্যে প্রায় ১৭ কিলোমিটার উড়ালপথের ইরেকশন শেষ হয়েছে। এ ছাড়া উত্তরা ডিপো থেকে বিজয় সরণি স্টেশন পর্যন্ত শেষ হয়েছে উড়ালপথের নির্মাণকাজ। লাইন-৬-এর ১৬টি স্টেশনের মধ্যে প্রথম ৯টি মেট্রো রেল স্টেশনের কনকোর্স, প্রথম পাঁচটি মেট্রো রেল স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম ও প্রথম চারটি মেট্রো রেল স্টেশনের স্টিল রুফ স্ট্রাকচার এবং তিনটি মেট্রো রেল স্টেশনের রুফ সিটিংয়ের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। বাকি মেট্রো রেল স্টেশনগুলোর নির্মাণকাজ বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে।

এরই মধ্যে ডিপোর ভেতরের রেললাইন স্থাপনের কাজ শেষ হয়েছে। ভায়াডাক্টের ওপরে মেইন লাইনে প্রায় ১৭ কিলোমিটার রেললাইন স্থাপন করা হয়েছে। প্রথম পাঁচটি স্টেশন পর্যন্ত ট্রেন চলাচলের উপযুক্ত করে প্রয়োজনীয় বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম স্থাপন ও পরীক্ষা করা হয়েছে। ভায়াডাক্টের ওপর প্রায় সাড়ে ১৭ কিলোমিটার ওভারহেড ক্যাটেনারি সিস্টেম (ওসিএস) ওয়্যারিং শেষ হয়েছে। ছয় কোচসংবলিত চারটি মেট্রো ট্রেনের সেট এরই মধ্যে ঢাকার উত্তরা ডিপোতে এসে পৌঁছেছে। গত ১১ মে ডিপোর ভেতরে মেট্রো রেলের ফাংশনাল টেস্টের সূচনা করা হয়। এরই মধ্যে প্রথম দুটি মেট্রো ট্রেন সেটের ফাংশনাল টেস্ট সফলভাবে শেষ হয়েছে।

মেট্রো রেল রুট-৬ প্রথম পর্যায়ে উত্তরা তৃতীয় পর্ব থেকে আগারগাঁও অংশের ভৌতিক কাজের অগ্রগতি হয়েছে ৮৮.১৮ শতাংশ। দ্বিতীয় পর্যায়ে আগারগাঁও থেকে মতিঝিল অংশের নির্মাণকাজের অগ্রগতি ৬৬.৭৪ শতাংশ। ইলেকট্রিক্যাল ও মেকানিক্যাল সিস্টেম এবং রোলিং স্টক ও ডিপো ইকুইপমেন্ট সংগ্রহ কাজের সমন্বিত অগ্রগতি ৬০.৬৬ শতাংশ। মেট্রো রেলের নির্মাণকাজের সার্বিক অগ্রগতি ৬৮.৪৯ শতাংশ।

 

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *