রাজনীতিকে ইসলামী করণের অন্ধকার!
আমিনুল ইসলাম কাসেমী :: আমরা যারা রাজনীতি করি, উচিত ছিল রাজনীতিকে ইসলামী করণ। এই প্রচলিত রাজনীতিকে মুসলমান বানানো। কিন্তু রাজনীতিকে মুসলমান বানানো দুরে থাক, ইসলামী রাজনীতিকে নষ্ট করার পাঁয়তারা করা হচ্ছে। এখন আমাদের বড় বড় নেতাগণ এমন তরিকায় এগোচ্ছেন, দুনিয়াদার রাজনীতিবিদ এবং আমাদের হুজুরদের মধ্যে কোন তফাৎ নেই।
অনেক বন্ধুর কাছে হয়ত বিষয়টা খারাপ লাগতে পারে। অনেকে ভুল বুঝতে পারেন। অনেকে হয়ত গালমন্দ করতে পারেন, কিন্তু একটু গভীর ভাবে লক্ষ্য করেন, আমরা কোন দিকে এগিয়ে চলেছি, আমাদের গন্তব্য কোথায়?
আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে মনে হয় এমনটি ছিল না। বর্তমান আমরা যে অবস্হার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছি, এরুপ অবস্হা আগে লক্ষ্য করা যায় নি। যেভাবে একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ শুরু হয়েছে, যেভাবে নেফাকী- দালালী চলছে নিজেদের মধ্যে, এরকম পরিস্থিতি মনে হয় আর হয়নি কোন দিন।
আমাদের রাজনীতিটা তো ইসলামের জন্য। নিজেদের শুদ্ধির জন্য, জনতার শুদ্ধির জন্য, দ্বীন কায়েমের জন্য,কিন্তু এখন সেই ইসলামের জন্য,দ্বীনের জন্য নেই। সবই এখন সেই জাহেল- মুর্খদের তরিকা আমরা গ্রহণ করে নিয়েছি। এখন রাজনীতিতে দালালী, রাজনীতিতে হুমকি – ধমকি, রাজনীতিতে একে অপরের বিরুদ্ধে বিষোদগার। নিজের মুসলিম ভাই নিজেদের আলেম সম্প্রদায়ের ভাইদের হুমকি- ধমকি, নিজেদের ভিতরে কেয়ামত ঘটিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা চলছে। অথচ এগুলো কোন ইসলামী দলের নেতাদের থেকে কাম্য নয়।
আগে আমাদের পূর্বসুরীগণ তাগুতের বিরুদ্ধে হুঙ্কার দিতেন, নাস্তিক- মুরতাদদের বিরুদ্ধে হুঙ্কার দিতেন, যাতে ওরা দমে যায়। এখন হুঙ্কার দেওয়া হয় স্বজাতি ভাইদের। নিজেদের ঘরানার লোকদের বিরুদ্ধে। কোন বাতিলের বিরুদ্ধে এখন আর হুঙ্কার নেই, হুঙ্কার দেওয়া হয়, নিজের জাতি ভাইদেরকে। আবার আমাদের মধ্যে কিছু এমন ভাই গড়ে ওঠেছেন, যারা নিজেদেরই ক্ষতি সাধন করছি। কোন ইসলামের দুশমুনদের ক্ষতি না করে, নিজেদের মধ্যে ফাটল সৃষ্টি করা হচ্ছে।
মানে বড় দুঃখজনক অবস্হান আমাদের এখন রাজনীতিতে। রাজনীতির ময়দানে নেমে পুরো দুনিয়াদারদের রাজনৈতিক আদর্শ এখন আমাদের মধ্যে। ওরা যা করছে, আমরাও তাই করছি। ওরা যদি রাজপথে জ্বালাও -পোড়াও করে, আমরাও জ্বালাও- পোড়াও করে থাকি, ওরা যে ষ্টাইলে স্লোগান দেয়, আমরাও সেই কায়দায় স্লোগান মারছি। ওরা যদি বলে, ” ধর ধর জবাই কর, আমরাও স্লোগান দেই, ধর ধর ধর জবাই কর”।
হুবহু দুনিয়াদার রাজনীতিবিদদের আদর্শ আমাদের মধ্যে। কোন পার্থক্য নেই। ওরা ক্ষমতা দখলের জন্য যেভাবে লড়াই করে, যে সব প্রক্রিয়া অবলম্বন করে, আমরাও ওদের মত সে রাস্তা অবলম্বন করে যাচ্ছি।
দুনিয়াদার রাজনীতিবিদদের মত আজ সকল ইসলামী দলের মধ্যে গ্রুপিং। ওরা গ্রুপিং করে দু’ দলে মারামারি ভাংচুর করে, আমরাও তাই করে যাচ্ছি। মানে ইসলামের নাম দিয়ে, ইসলামী রাজনীতির নাম দিয়ে, যত গর্হিত কাজের জন্ম দেওয়া হচ্ছে। না জায়েজ কাজগুলো আমরা অবলীলায় করে যাচ্ছি।
কেউ কিছু মনে করছেন না। কেউ কোন আপত্তি তুলছেন না। যদি কেউ বলে, সেটা উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
আমাদের আজ হিংসাত্মক মনোভাব। কারো বিরুদ্ধে কোন কথা বলতে গেলে, সহজ ভাবে না বলে, সেখানে কেয়ামত ঘটানো হচ্ছে। হুমকি- ধমকি, একদম শেষ করে ফেলার মত কথা উচ্চারিত হচ্ছে।
আমাদের ওনারা কেউ কিন্তু অবুঝ নন। সব সেলিব্রিটি। বড় বড় শায়েখ। কিন্তু শায়েখগণের এমন আদর্শ, যেটা প্রকাশ করা যায় না। কারো সামনে বলা যায় না। চিন্তার বিষয় আমাদের। কেন আজ আমরা ক্ষতিগ্রস্হ হচ্ছি।কেন আমরা সফলতার মুখ দেখতে পাচ্ছি না। কেন আজ আমাদের দেশে এত জনপ্রিয়তা থাকা সত্বেও মনজিলে মাকসুদে যেতে পারি না। বারবার ব্যাকফুটে চলে আসা হচ্ছে।
একটু লক্ষ্য করুন, আমরা যে গণজাগরণ সৃষ্টি করেছি এদেশে, আর কোন সংগঠন এত জনপ্রিয়তা, এত জাগরণ তুলতে পারিনি। কিন্তু ফলাফল কি? শেষমেষ কিন্তু জিরো।
আহ! হাফেজ্জী রহ.- এর সময়ের গণজাগরণ। শায়খুল হাদীস রহ.-এর লংমার্চ এর জাগরণ। সর্বশেষ, আল্লামা শফি রহ.-এর হেফাজতের আন্দোলন। একটু ভেবে দেখুন তো, এত্ত বড় গণজাগরণ কি আর কোথাও হয়েছে? হয় নি। আমরা সেটা দেখায়েছি।কিন্তু ফলাফল নেই।
বারবার হোঁচট খাচ্ছি। আমরা এগোতে পারছি না। কিন্তু কেন এরকম হচ্ছে? আসলে ভালভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, আমাদের নৈতিক অবক্ষয়। ব্যক্তি গঠনে অনিহা। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবাদের আদর্শ ত্যাগ করে দুনিয়ার নেতাদের আদর্শ আমাদের মধ্যে। আমরা মিছিলে বলছি রাসুল সৈনিক, সাহাবা সৈনিক। কিন্তু আব্রাহাম লিংকন, লেলিন, কালমার্কসের আদর্শের সাথে আমাদের সখ্যতা। নামে আমরা হয়েছি রাসুল সেনা, কিন্তু কামে সব ঐ নাস্তিকদের আদর্শ, তাদের চিন্তাধারা আমাদের পেয়ে বসেছে।
সেক্যুলিরিজম কে হটাতে চাচ্ছি। কিন্তু সেক্যুলিরিজমকে হটাতে গিয়ে নিজেরাই এখন ইসলামের ভিতরে আছি কিনা সন্দেহ। অনেকেই সেক্যুলিরিজমে আবদ্ধ হয়েছেন, আবার ইসলামী রাজনীতির নাম করতে করতে এখন তিনি আর ইসলামে নেই। ইসলামী বিধি বিধান কাঁট- ছাঁট করে মডারেট ইসলাম বানিয়ে ফেলেছেন।
এই অবস্হার থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার রাস্তা খুঁজতে হবে আমাদের। এজাতিকে বাঁচাতে হবে।বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম, তরুন আলেমদের সহী রাস্তায় না উঠালে আরো অস্হির হবে আমাদের অঙ্গন।
এক,, ব্যক্তি গঠনের দিকে মনোনিবেশ করা দরকার। আগেই ক্ষমতা দখলের রাজনীতি না করে, রিজাল তৈরী করা সময়ের দাবী।
প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কাতে তের বছর ব্যক্তি গঠন করেছেন। এই তের বছর কোথাও, “ধর ধর জবাই কর ” বলেন নি। বরং কেউ কিছু বললে চুপ থেকেছেন। তাঁদের শক্তি ছিল না এমন নয়। শক্তি ছিল, তারপরেও তিনি কারো উপর চড়াও হননি। তাঁর প্রথম টার্গেট ছিল ব্যক্তি গঠনের উপরে জোর দেওয়া।
এরপর মদীনাতে গিয়ে তিনি কাফেরদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। সেই তৈরী করা মানুষ নিয়ে ঝাপিয়ে পড়েছেন কাফির – মুশরিকদের বিরুদ্ধে।
দুই,, সাহাবায়ে আজমাঈনদের নঁকশে – কদমে চলা দরকার। সাহাবাদের বৈশিষ্ট ছিল, ” রুহবানান ফিল লাইল ওয়া ফুরাসান ফিন্নাহারি” রাতে সন্নাসী বৈরাগী আর দিনে অশ্বারোহী সৈনিক।
সাহাবাগণ রাতে মহান প্রভুর দরবারে সেজদায় লুটিয়ে পড়তেন, আর দিনে মর্দে মুজাহিদ হয়ে কাফেরদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতেন। দুটি গুণই তাদের মাঝে বিদ্যমান ছিল। কোন একদিকে ঝুঁকে পড়েন নি। যেমন তারা আল্লাহর প্রেমে পাগলপারা। ইবাদতে মশগুল থেকেছেন, আবার তীব্র সাহসিকতায় বাতিলের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে গেছেন।কোন সাইড তাদের দুর্বলতা ছিল না।
আমাদের বর্তমান অবস্হা অনেকটাই নাজুক। রাজনীতি করতে গিয়ে দ্বীনের বহু ক্ষতি সাধন করে ফেলেছি। একদিকে ঝুকে পড়েছি। বহু মুহাদ্দিস- মুফতি রাজনীতির কাছে তাদের ইসলাম হার মেনেছে। জামাত তরক হচ্ছে, নামাজ কাজা করছেন। আর রাতের নিবিড় ইবাদতের তো খোঁজ নেই।
বিশ্বাস না হলে একটু খোঁজ নিয়ে দেখবেন। আমরা কোথায়? আজ রাজনীতির কাছে আমরা সব কিছু বিলীন করে দিয়েছি। আখলাক চরিত্র তো আগেই নষ্ট হয়েছে।গীবত- শেকায়েত এখন পান্তা ভাত। আমানতের খেয়ানত। লুটপাট, দুর্নীতি, এসবের কারণে আমাদের রাজনীতিবিদগন আরো অধঃপতনে যাচ্ছেন।
এজন্য নিজের আখলাক, চরিত্র ঠিক করে, সামনে এগোতে হবে। তিন,, রাজনৈতিক নেতা- কর্মিগণের ইসলাহী প্রশিক্ষন সময়ের দাবী। নেতার ইসলাহের প্রয়োজন। কর্মির ইসলাহের প্রয়োজন। শুধু কর্মিদের বসায়ে নেতাদের চম্মট দিলে হবে না।
তাই আসুন! রাজনীতি করা নিষেধ নয়। তবে রাজনীতিকে মুসলমান বানান। নিজে ঠিক হোন। ঐ জাহেলী সিষ্টেম পরিহার করুন। ওদের মত খিস্তি- খেউড়কে না বলতে হবে।
আমাদের পুর্বসুরীগণ রাজনীতি করেছেন।কিন্তু তারা ইসলামকে কলুষিত করেন নি। নিজেদের আখলাক চরিত্রে অবনতি হয় নি কোন দিন। বরং তারা সাহাবাদের নকশে কদমে চলার চেষ্টা করেছেন। মহান আল্লাহর সাথে গভীর তায়াল্লুক রেখে পথ চলেছেন। আল্লাহ আমাদের সকলের উপর রহম করুন। আমিন।
লেখক : মাদরাসা শিক্ষক


