শতবর্ষী মেরাদিয়া হাট

শতবর্ষী মেরাদিয়া হাট

নিজস্ব প্রতিবেদক ● বর্তমান রামপুরা খালটি এক সময় ছিল নড়াই নদ। এ নদের তীরে ব্রিটিশ আমলে গড়ে ওঠেছিল আজকের মৃতপ্রায় মেরাদিয়া হাট। তখন একটি বড় বটগাছের নিচে হাট বসতো। পরে চাহিদা বাড়ায় বটগাছসংলগ্ন একটি পুকুরের চারপাশ ঘিরে ও পার্শ্ববর্তী মাঠে হাটের পরিসর বাড়ে। সেই বিস্তৃত পরিসর এখন আর নেই। নতুন নতুন ভবন উঠতে থাকায় স্থান সংকুলান না হওয়ায় এখন রাজধানীর দক্ষিণ বনশ্রী এলাকার জি ব্লকের রাস্তার দুই পাশকেই মূলত হাট হিসেবে গণ্য করা হয়। প্রতি বুধবার এখানে বসে শতবর্ষী এই হাট। রাজধানীর অলি-গলিতে বাজার দেখা গেলেও এখনো চাহিদা ফুরোয়নি এ হাটের। বুধবার সকাল থেকে রাত পর্যন্ত জমজমাট থাকে এ হাট।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও ঢাকার বাইরের ক্রেতা-বিক্রেতারাও ভীড় করেন এখানে। স্থানীয়রা বলছেন, মেরাদিয়া হাট এখন মৃতপ্রায়। হাটের বিষয়ে মেরাদিয়া কবরস্থান রোডের স্থানীয় বাসিন্দা নাসিরউদ্দীন বলেন, ছোটবেলা থেকে এই হাট দেখে আসছি, আশেপাশে তেমন হাট ছিল না। তখন তো আর এমন রাস্তা ছিল না, নদীতে করেই বিভিন্ন জেলা থেকে শত শত লোক দলবেঁধে কেনাবেচা করতে আসতো। এখন মেরাদিয়া হাট বলতে যা বোঝানো হয় তার প্রায় অর্ধেকই মেরাদিয়া বাজারের অংশ। ভবিষ্যতে এই হাট হারিয়ে যেতে পারে বলে আশংকা নাসিরউদ্দীনের। তিনি বলেন, হাট তো খেয়ে ফেলছে। এখন ফুটপাত দখলের মত রাস্তার দুইপাশে হাট বসে। আবার একদিন উচ্ছেদও হয়ে যাবে। এদিকে হাটের বিষয়ে কার্যত নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করে এর জন্য দক্ষিণ বনশ্রী প্রকল্প কাযক্রমকে দায়ী করেছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৩ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মাকসুদ আলম। হাটের শুরুর ইতিহাস জানতে চাইলে মাকসুদ আলম বলেন, এটা বলা মুশকিল।

বাবার কাছ থেকে এই হাটের কথা শুনে আসছি। দেড়শ বছরের ওপর তো হবেই। আশাপাশের ১০ কিলোমিটারে কাউকে পাওয়া যাবে না, এমনকি ৮০ বছরের কেউও বলতে পারবে না যে, হাটের শুরুটা তার দেখা। সবাই বলবে বাপ-দাদার দেখা। মেরাদিয়া হাটের পরিসর কমে এলেও ক্রেতা-বিক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী এখনো বেশ জনপ্রিয় এই হাট। প্রতি বুধবার জমজমাট কেনাবেচা চলে হাটে, বিশেষ করে বিকেল থেকে তীব্র ভীড় দেখা যায় হাটে। সব ধরনের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের সমাহার থাকায় হাটে সববয়সী ক্রেতার উপস্থিতি দেখা যায়। হাট ঘুরে দেখা যায়, পশ্চিম দিকের শুরুতেই জুতা, কাপড়ের দোকান। অন্যান্য পণ্যের তুলনায় এই হাটে কাপড়ের দোকান কিছুটা বেশি, রাজধানীর গুলিস্তান, নিউমার্কেট এলাকার অনেকেই মেরাদিয়া হাটে দোকান বসান। বিক্রেতাদের কেউ উন্মুক্তভাবে বসে পড়েছেন, আবার কেউ শামিয়ানা টানিয়ে বসেছেন। সব ধরণের কাপড়ের কেনাবেচা থাকলেও এ অংশে মূলত নারী ক্রেতাদের ভীড়ই বেশি দেখা যায়। ফলে কাপড়ের দোকানের মাঝেই দেখা যায়, কসমেটিক্সসহ নারীদের ব্যবহৃত অন্যান্য সামগ্রী।

মেরাদিয়া মোড়ে নানা ধরনের মিষ্টির দোকান রয়েছে। টাঙ্গাইল, কুমিল্লাসহ বিভিন্ন এলাকার মিষ্টির পাশাপাশি রয়েছে স্থানীয়ভাবে তৈরি রসগোল্লা, চমচম, গজা ইত্যাদি। স্বাদ নেয়া যাবে মুড়ি-মুরকি, গুড়, তিলের খাজা ও বিভিন্ন রকমের ভাজাপোড়ারও। মোড়ের ডান দিকেই কাঁচা বাজার। তরতাজা শাক-সবজির জন্য এই বাজারের কদর অনেক বেশি। টমেটো, লালশাক, পুঁইশাক, কচুশাক, বেগুন, মুলা, হেলেঞ্চা, ডাঁটা, ঢেড়স, আলু, পটল, করলা, লাউ, কুমড়া- এমন কোন সবজি নেই যার দেখা মিলবে না হাটের দক্ষিণ অংশে। সবজি বিক্রেতা ফয়সাল মিয়া জানান, নরসিংদী, কিশোরগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে ট্রাকে সবজি আসে এই হাটে। গলিপথে দেখা মিলবে কাঁচা মরিচ, শুকনো মরিচ, সব ধরনের মশলার দোকান। রয়েছে তেঁতুল, আমসহ নানা রকমের আচারও। পাওয়া যাবে পান-সুপারি। সংগ্রহ করা যাবে বিভিন্ন রকমের বীজ। উত্তরে রাস্তার পাশে মাছের হাটে শিং, চিংড়ি, কই, মাগুর, শিং, পুঁটি, শোল, টেংরাসহ বিভিন্ন ধরনের তাজা মাছ পাওয়া যাবে।

মাছ বিক্রেতা আতিক হোসেন জানান, নড়াই নদ দিয়ে ছোট ছোট ট্রলার ও নৌকার মেঘনার তাজা মাছ যেমন এই হাটে আসে, তেমনি পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন জলাশয় থেকেও মাছ আনা হয়। চাষের মাছ না হওয়ায় ক্রেতাদের আগ্রহও বেশি। বিভিন্ন স্থানেই দেখা যায়, ছোট-বড় বোতলে দুধ নিয়ে এসেছেন বিক্রেতারা। নন্দীপাড়া থেকে আসা বিক্রেতা রিয়াদ বলেন, এখানে যারা দুধ বিক্রি করে তাদের প্রায় সবাইই স্থানীয়। নিজেদের গরুর দুধই নিয়ে আসেন তারা। হাটের পূর্ব দিকে দেখা মিলবে বাশ ও শুঁটকির। আর একেবারে শেষ প্রান্তে ফয়জুর রহমান আইডিয়াল স্কুলের সামনে রয়েছে নানা ধরনের পাখি, কবুতর, হাঁস, মুরগির দোকান। রয়েছে হরেক রকমের ডিমের দোকানও। এর আগেই পাওয়া যাবে ছাগলের ছোট হাট। রাস্তার পাশ ধরেই অসংখ্য ফলের দোকানের দেখা মেলে। ডাব, নারিকেল, বেল, তরমুজ, পেঁপে, লেবু, কলা, বড়ই, আখসহ প্রায় সব ধরনের ফলের সমাহার দেখা যায় হাটে। ফল বিক্রেতা অসীম কুমার জানান, বরিশাল, ফরিদপুর, নরসিংদী, গাজীপুরসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে ফল আসে এই হাটে।

এছাড়াও আসবাব পত্র, দা-বটি, কাচের জিনিস, কাঠের ব্যবহায জিনিস, মাটির তৈজসপত্র, হাড়ি পাতিল, বাঁশের তৈরি পণ্য, কুঠির শিল্পের সামগ্রীসহ বিভিন্ন প্রকার গৃহস্থালি দ্রব্যাদি পাওয়া যাবে। রয়েছে মাছ ধরার পলো, বড়শি, বড়শির ছিপ, বাঁশের তৈরি টুকরি, কোলা, মোড়া, পাটি, ছনের ঝাড়ু ইত্যাদি। হাটে দেখা মিলবে তালা, ছাতাসহ অন্যান্য যন্ত্রের মেরামতকারীদের। হাট ঘিরে কখনো বসে মেলার আয়োজন। ফলে জাদু, কসরত দেখার সুযোগও মিলতে পারে। ঢাকার বাড্ডা, রামপুরা, বনশ্রী, আফতাবনগর, বেরাইদ, খিঁলগাও, ডেমরা, গোড়ানসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে এই হাটে ক্রেতারা ভীড় করেন। এছাড়াও নারায়ণগঞ্জের চনপাড়া, রূপগঞ্জ থেকেও অনেকেই কেনাবেচা করতে আসেন এই হাটে। স্থানীয়দের দাবি শতবর্ষী এই হাটটি যেন বেঁচে থাকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *