শত্রু যখন ফেরেশতা | মুহাম্মাদ আইয়ুব
মানুষ নামক প্রাণীটি বড় ভয়ংকর ও অদ্ভুত। আপনার সাথে যখন শক্তি- সামর্থ্য, যশ-খ্যাতি, টাকা- পয়সা, নাম-ডাক দিয়ে কুলিয়ে উঠতে পারবেনা তখন বাজার ঘাটে আপনার প্যান্ট বা লুঙ্গি খুলতে দ্বিধা করবে না। খুলতে পারুক আর না পারুক টানাটানি সে করবেই। ব্যক্তিগত জীবনে সে যত বড়ই কারুন হোক না কেন টানাটানির প্রতিযোগিতায় সে হাতেম তাঈকেও ছাড়িয়ে যাবে।
সম্প্রতি জার্মান ভিত্তিক জুতা ও ক্রিড়াসামগ্রী প্রস্তুতকারী বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ’adidas’ মার্কিন অভিনেতা, ডিজাইনার কেনি ওয়েস্টের ডিজাইন করা দুটো জুতো বাজারে আনার ঘোষণা দিয়েছে। জুতো কোম্পানি বাজারে ছাই বিক্রি করবে না জুতো ই বিক্রি করবে ভাল কথা, কিন্তু সেই জুতোর নামকরণ যদি আমাদের মহান দুই ফেরেশতা হযরত ইসরাফিল আঃ ও হযরত আজরাইল আঃ এর নামে করে তখন ভালোটা আর ভালো থাকেনা নিকৃষ্টতর থেকে নিকৃষ্টতর হয়। সম্প্রতি তারা এই নিকৃষ্ট ও জঘন্য কাজটিই করেছে। (adidas com/Yeezy) র অফিসিয়াল ওয়েবসাইট দিয়ে দিলাম আগ্রহী পাঠকগণ সত্যতা যাচাই করতে পারেন ((https:/www. adidas. com/Yeezy)।
ফেরেশতারা আমাদের আকীদা বিশ্বাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ফেরেশতাদেরকে আমরা মুসলিমরা মনে প্রাণে ভালোবাসি, ভালোবাসতে ভালোবাসি। যারা ফেরেশতাদের সাথে বিদ্বেষ পোষণ করে, গালাগালি করে তাদেরকে আমরা ঘৃণার চোখে দেখি,তারা মোটেও আমাদের ভালোবাসার পাত্র হতে পারে না। মুসলমানদের আছে ব্যক্তিগত ইতিহাস-ঐতিহ্য, যশ-খ্যাতি। ইসলাম ধর্ম তার জন্মলগ্ন থেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ। নিজের জৌলুশ বাড়াতে কখনো কোন ধর্মের কাছে হাত পাততে হয়নি।
ইসলামের এই নামডাক, জগতজোড়া সাফল্য, বিশ্বব্যাপী তরতর করে উত্থান শয়তান ও তার দোসররা ভালভাবে নিতে পারেনি। শক্তি-সামর্থ্যে, মেধা-বুদ্ধিতে, যশ-খ্যাতি, কোন দিক দিয়েই যখন ইসলাম বিরোধীরা কুলিয়ে উঠতে পারেনি তখন আড়ালে আবডালে,রাস্তা ঘাটে বাজারে মহান আল্লাহ তা’আলা, আম্বিয়ায়ে কেরাম , সাহাবায়ে কেরাম, ফেরেশতাগণ সর্বোপরি ইসলামের বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা শুরু করে দেয়। এর জন্য শয়তান ও তার দোসররা কাড়ি কাড়ি অর্থ, সময়, মেধা, শ্রম দেদারসে ব্যয় করতে থাকে এটাকেই জীবনের পরম আরাধ্য ও পূজনীয় বস্তু বানিয়ে নেয়। কেনি ওয়েস্টের মেধা আর এ্যডিডাসের অর্থ ও শ্রম এর উৎকৃষ্ট প্রমাণ।
ফেরেশতাদের সাথে তাদের এই বৈরীতা ও বিদ্বেষ যে কেবল আজকের তা কিন্তু নয়! এ বিদ্বেষের ইতিহাস তো হাজার হাজার বছরের পুরনো। কেননা আমার দেখতে পাই যে,আজ থেকে প্রায় সাড়ে চৌদ্দশ বছর আগে মহান রাব্বুল আলামীন ফেরেশতাদের প্রতি ইহুদিদের বৈরী মনোভাবের কারণে পবিত্র কুরআনুল কারিমের সূরা বাকারার ৯৮ নং আয়াতে সুস্পষ্ট ভাবে বলেছেন যে, ” যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতা,রাসূলগন এবং জিবরাঈল ও মিকাঈলের শত্রু, নিশ্চয়ই আল্লাহ পাক এমন কাফেরদের শত্রু”।
তবে আশ্চর্যের বিষয় হল, মহান আল্লাহ পাকের এমন শত্রুর সাথে যখন আমরা মুসলমানরা বন্ধুত্ব স্থাপন করি,গলাগলি করে মনের আনন্দে ঘুরে বেড়াই, ওদের তৈরী জুতো,জার্সি পরে মাঠ দাপিয়ে বেড়াই। ছি! ছি!! ছি!!! আফসোস যতই করি ততই কম হয়!
বনের রাজা সিংহ কখনো অন্যের শিকার করা জন্তুতে মুখ লাগায় না এটা তার আত্মমর্যাদা বোধের পরিপন্থী। না খেয়ে মরে যাবে কিন্তু নিজ হাতে আত্মমর্যাদার হন্তারক হতে সেটাকে গলা টিপে মারতে সে আদৌ রাজি নয়। দূর্ভাগ্যবশত যদি কোনদিন সে মুখ দিয়েই ফেলে তাহলে বুঝতে হবে সে রাজা হওয়ার মর্যাদা হারিয়ে ফেলেছে। আকৃতিতে সিংহ থাকলেও সিংহ জাতের সাথে তার কোন সম্পর্ক নেই, ছিন্ন হয়ে গেছে। তাই এখন সে গাধা,শূকর,কচ্ছপ, শেয়াল সবার সাথেই ঘুরে বেড়ায়! নালা,নর্দমা,ডোবা,ড্রেন,মরা গরু,পঁচা বকরী সব খানেই তার মুখ যায়! যে কোনো পরিবেশ ই সে মানিয়ে নেয়! মজার ব্যাপার হল, এটাই নাকি তার চূড়ান্ত স্বাধীনতা!!
বাংলা একাডেমির অভিধানে ‘ঈদ’ যেমন ‘ইদ’ হয় , ‘গরু’ যেমন ‘গোরু’ হয় ঠিক তেমনি মুসলমানের অভিধানে ও আজ পরিবর্তন এসেছে! আদি যুগের মুসলমান ছিলেন ‘রুহবান ফিল্লাইল ফুরসান ফিন্নাহার’ তথা রাতের বেলায় আল্লাহর ইবাদাতে নিমগ্ন আর প্রভাতে আল্লাহর পথের অশ্বারোহী। আর এই যুগের মুসলমান হল রাতের বেলায় রিয়াল বার্সার লা লিগা, ম্যানসিটি ম্যানইউ আর্সেনাল চেলসি লিভারপুলের প্রিমিয়ারলীগ,বায়ার্ন বুরুশিয়ার বুন্দেসলিগা, জুভেন্টাসের সি রি আ,পিএসজির লীগ অন,ডব্লিউডব্লিউইর রেসলিং,মুম্বাই চেন্নাইয়ের আইপিএল আর দিনের বেলায় বেঘোরে মরার ঘুম। কি ভয়ংকর কম্বিনেশন বাপরে বাপ!
হযরত ওমরের যুগের সিংহরা যখন ঘুমিয়ে থাকতেন তখন ধূর্ত শেয়ালরা একশ মাইলের ভিতর আসার ও দুঃসাহস দেখাত না আর আজ খলিফাতুল মুসলিমীন(?) হাফেজ এরদোগান সাহেবের যুগে ল্যাংড়া ছাগল ও সিংহকে লাথি মেরে বলে আর কত ঘুমুবে চল তোমার আঙিনায় তোমার বউ, বাচ্চাকাচ্চাদের সাথে একটু ফূর্তি করি,জীবনটা উপভোগ করি! তারপরও কি বলব ওমরের শাসন চাই?! আমাদের মত নকল সিংহের ঠিকাদারীর জন্য খলিফা ওমরের ঠেকা লাগেনি।
আর যদি তাঁর মতো কেউ কোনদিন আসেনও তাহলে আমাদের মত গাদ্দার বেঈমানদের শূলিতে চড়িয়ে পৃথিবীটাকে আত্মমর্যাদাহীন গাদ্দার মুক্ত করে রাজ্য পরিচালনা করবেন হয়তবা।
মহারাজার পরিবার! অলসতার এ ঘুম আর কতকাল? কবি নজরুলের সেই দিন কবে আসবে যেদিন বনের সকল সিংহরা এক যোগে গেয়ে উঠবে-
“বাজিছে দামামা বাঁধরে আমামা
শির উঁচু করি মুসলমান।
দাওয়াত এসেছে নয়া যমানার
ভাঙ্গা কেল্লায় ওড়ে নিশান।।
মুখেতে কালেমা হাতে তলোয়ার,
বুকে ইসলামী জোশ দুর্বার,
হৃদয়ে লইয়া এশক আল্লাহর
চল আগে চল বাজে বিষান।
ভয় নাই তর গলায় তাবিজ
বাঁধা যে রে তোর পাক কোরান।।
নহি মোরা জীব ভোগ- বিলাসের,
শাহাদাত ছিল কাম্য মোদের,
ভিখারির সাজে খলীফা যাদের
শাসন করিল আধা জাহান-
তারা আজ পড়ে ঘুমায়ে বেহুঁশ
বাহিরে বহিছে ঝড় তুফান।।
ঘুমাইয়া কাজা করেছি ফজর,
তখনো জাগিনি যখন যোহর,
হেলা ও খেলায় কেটেছে আসর
মাগরিবের আজ শুনি আজান।
জামাত শামিল হওরে এশাতে
এখনো জমাতে আছে স্থান।।
শুকনো রুটিকে সম্বল ক’রে
যে ঈমান আর যে প্রানের জোরে
ফিরেছে জগত মন্থন ক’রে
সে শক্তি আজ ফিরিয়ে আন।
আল্লাহ আকবর রবে পুনঃ
কাঁপুক বিশ্ব দূর বিমান”
লেখক : শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক।


