ভারতে পর্যটন । চৌধুরী আতিকুর রহমান
শহীদ টিপুর পদচিহ্ন ধরে..
গোয়ার মাড়গাঁও স্টেশন থেকে অনেক রাতে মৎস্যগন্ধা এক্সপ্রেস ধরে সকাল ৯ টা নাগাদ ম্যাঙ্গালোর সিটি নামলাম। এখান থেকেই শুরু হচ্ছে আমার ঈপ্সিত ভ্রমণ ‘টিপুর পদচিহ্ন ধরে’। ম্যাঙ্গালোর, মাদিকেরি, মহিশুর, ব্যাঙ্গালোর কর্নাটকের এই চারটি জনপদ আমার ভ্রমণ পরিকল্পনার অঙ্গ।
ম্যাঙ্গালোরে যে লজে উঠেছিলাম সেখান থেকেই বলে দিল আজ আপনারা যান কেরালার কাসারগড়। সেখানে রয়েছে ইসলামের প্রাথমিক যুগের একটি মসজিদ ও মাযার। উভয়েই মালিক বিন দিনার (র.)-এর নামে নামাঙ্কিত। এই ব্যাপারে পরে আলোকপাতের ইচ্ছা রইল।
পরদিন প্রথমেই গেলাম গুরুপুর নদীর কুলে টিপুর পর্যবেক্ষণ মিনারটি দেখতে। এই পর্যবেক্ষণ মিনারটি বহু আগে থেকে থাকলেও হায়দার ও টিপু শুধুমাত্র ব্রিটিশ জাহাজ আঁটকানোর জন্যে এটি ব্যবহার করতেন। উঁচু সিঁড়ি দিয়ে উঠে গিয়ে পাথর বাঁধানো চাতাল, দেওয়ালে কামানের নল ঢোকানোর জন্যে বেশ কয়েকটি খাঁজ রয়েছে। এখান থেকে দেখা যায় গুরুপুর নদীটি বাঁক নিয়ে আরব সাগরের দিকে বয়ে গেছে। এরপর গেলাম বন্দর এলাকায় টিপুর তৈরী একটি মসজিদ দেখতে। পশ্চিম তটের রীতি অনুযায়ী কাঠের তৈরী সূক্ষ্ম কারুকার্য খচিত সৌন্দর্যমন্ডিত থাম ও কড়ি-বর্গার উপর লাল টালির আচ্ছাদন, কোন মিনার বা গম্বুজ নেই।
পরদিন বেঙ্গালুরু ভায়া মারকারা, মহিশুর। বেঙ্গালুরুতে হায়দার ও টিপু নির্মিত কাষ্ঠনির্মিত গ্রীষ্মকালীন আবাস বেঙ্গালুরুর পর্যটন মানচিত্রকে সমৃদ্ধ করেছে। বাইরে থেকে দেখে মনে হবে একতলা কিন্তু ভিতরে প্রবেশ করলে দেখা যায় এটি দ্বিতল। দ্বিতলে ব্যালকনির মত করা আছে যার মাঝেরটিতে বসতেন টিপু বাঁ দিকে মীর সাদিক ও ডান দিকে পুর্নাইয়া পন্ডিত। এই ভাবেই সভার কাজ চলত। টিপু যেখানেই থাকার ব্যবস্থা করেছিলেন সেখানেই হিন্দুদের জন্যে একটি মন্দির নির্মাণ করেছেন বা আগে থেকেই ছিল। সামার প্যালেসের পাশেও একটি সুদৃশ্য মন্দির দেখেছি। লালবাগ উদ্ভিদ উদ্যান হায়দার ও টিপুর নির্মাণ। বিদগ্ধজন বলেছেন এখানে টিপু সারা ভারত থেকে উদ্ভিদ এনে লাগিয়েছেন তো বটেই বিদেশ থেকেও এনে লাগিয়েছিলেন।
এরপর হায়দার-টিপুর রাজধানী শ্রীরঙ্গপত্তনম। এখানে টিপু একটি মসজিদ কাম মাদ্রাসা তৈরী করেন, অদূরেই রয়েছে একটি বিখ্যাত মন্দির। এখানেই বীর টিপু ইংরেজদের সঙ্গে লড়াই করতে করতে শহীদ হন, তাঁর শহীদস্থলটিও চিহ্নিত করা রয়েছে। তাঁর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেন তাঁরই বিশ্বস্ত মীর সাদিক।
এরপর আমাদের গন্তব্যস্থল হল বৃন্দাবন গার্ডেন। বৃন্দাবন গার্ডেন যে বাঁধটিকে ঘিরে তৈরী হয়েছে তার নাম কৃষ্ণরাজ সাগর হলেও এটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন টিপু সুলতান।
টিপুর ২৬৬ তম জন্মদিন পালনের উদ্দেশে কর্নাটক সরকার ২০১৫-র ১০-ই নভেম্বর দিনটি ঠিক করেছে। কিন্তু সঙ্ঘ পরিবার হিন্দু ও খ্রিস্টানদের উপর অত্যাচারী ছিলেন বলে যে ভাবে টিপুর চরিত্র হনন করছে তার বিপরীতে বহু স্বনামধন্য ঐতিহাসিক বহু মূল্যবান মতামত দিয়েছেন। আমিও স্বচক্ষে টিপুর বাসস্থান ও মন্দিরের সহাবস্থান দেখে সীদ্ধান্তে এসেছি টিপুর প্রতি অবিচার করা হচ্ছে। এর জন্যে অনেকটাই তৎকালীন ব্রিটিশদের দোষারোপ করা যায়। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যাঁরাই অস্ত্র ধরেছেন তাঁদের দিকে কাদা ছোঁড়া ব্রিটিশ চরিত্রের অন্য দিক।
লেখক : পশ্চিমবঙ্গের কলামিস্ট


