সংকটে ভেবেচিন্তে আলেমদের সিদ্ধান্ত নেয়া জরুরি

সংকটে ভেবেচিন্তে আলেমদের সিদ্ধান্ত নেয়া জরুরি

সংকটে ভেবেচিন্তে আলেমদের সিদ্ধান্ত নেয়া জরুরি

আমিনুল ইসলাম কাসেমী : কদিন আগে দিল্লির নিজামুদ্দীন মারকাজে করোনা নিয়ে যে সংকট দেখা দিয়েছিল। ভারতের কিছু ইসলাম বিদ্বেষী মিডিয়াগুলো যেভাবে আদা জল খেয়ে লেগে ছিলেন ইসলাম এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে। সেই সাথে যুক্ত হয়েছিলেন ভারত সরকারের কিছু নীতি নির্ধারক ব্যক্তিবর্গ। সকলের জওয়াবে আমাদের দারুল উলুম দেওবন্দের সিনিয়র মুহাদ্দিস, জমিয়ত উলামায়ে হিন্দের ছদর আল্লামা আরশাদ মাদানী দামাত বারাকাতুহুম একটি কথাই বলেছিলেন, দেশের এই সংকটময় মুহুর্তে কিভাবে করোনা ভাইরাস মহামারি থেকে বাঁচতে পারি, সেই প্রচেষ্টা সকলে এক প্লাট-ফরমে এসে করা দরকার। আপোসে কারো বিরুদ্ধে বিষোদগার আর নয়। নিজামুদ্দিন এর সাথে মতনৈক্য থাকলেও, সাইয়্যেদ আরশাদ মাদানী বৃহত্তর স্বার্থে নিজামুদ্দীনের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। একদম বুক চিতিয়ে দিয়েছিলেন তিনি।

পাকিস্তানেও দেখলাম, আল্লামা তকী উসমানী সাহেবের নেতৃত্বে সব ধরনের ইসলামী দল, এমনকি বেরলী গ্রুপ পর্যন্ত এক জায়গায় হাজির হয়ে বর্তমান পরিস্হিতির উপর এক সুন্দর দিক নির্দেশনা জাতির সামনে উপস্থাপন করেছেন।

আমাদের বাংলাদেশেও সর্ব শ্রেণীর ওলামায়ে কেরামকে এক টেবিলে বসানোর চেষ্টা করেছিলেন আমাদের ইসলামী ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ। দেশ সেরা মুফতীগণের চেহারা সেদিন এক জায়গায় দেখা গেল। দেওবন্দী হালকা ছাড়াও ভিন্ন মতের ওলামায়ে কেরামের উপস্হিতি লক্ষ্য করা গিয়েছিল সেদিন। আলেমগন বর্তমান পরিস্হিতির উপর সুন্দর সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের মানুষকে দিলেন। আমাদের দেশের আপামর জন- সাধারণ সে সিদ্ধান্তবলী সন্মান জানিয়ে ছিল। কেউ কোন চ্যু- চেরা করেনি। মসজিদে জামাত, শবে বরাতে করণীয়, জুময়ার জামাত ইত্যাদী বিষয়গুলোতে দেশের মুফতীগণের ফতোয়াকে দেশ বাসি মাথা পেতে নিয়েছে। কেউ আর এটা নিয়ে তেমন দ্বিমত করেনি।

এখন একটা বিষয় নিয়ে কিছুটা মতানৈক্য মনে হচ্ছে, সেটা হল রমজানের তারাবীর নামাজ। মাননীয় প্রধান মন্ত্রী বর্তমান এই প্রেক্ষাপটে নিজ ঘরে তারাবীর নামাজ পড়ার আহবান জানিয়েছেন। কেননা, করোনায় মানুষ সংক্রমিত হচ্ছে খুব বেশী। মসজিদে বড় জামাত করতে গেলে, কে সুস্হ আর কে অসুস্থ সেটা বোঝা যায় না। আবার মসজিদে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা সম্ভব হয় না। এ কারণে একটা বড় ঝুকিতে চলে যায় মানুষ গুলো।সেই দৃষ্টি কোন থেকে তিনি সকলকে ঘরে তারাবীর নামাজের আহ্বান জানিয়েছেন।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তিনি সৌদি আরব এবং অন্যান্য দেশের রেফারেন্স টেনেছেন। সেসকল জায়গায় তারাবীর নামাজ বন্ধ করে ঘরে পড়ার জন্য বলা হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সে সব জায়গার সিদ্ধান্তের কারণে তিনি বাংলাদেশের মানুষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

এদিকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পরে আমাদের ওলামায়ে কেরামের একটি জামাত, যারা আমাদেরই ছারে তাজ, তাঁরা এক মিটিংএর মাধ্যমে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, রমজান মাসে তারাবীর নামাজের জন্য সকল মসজিদকে উন্মুক্ত করে দেওয়ার জন্য। যেটা নিয়ে এখন দেশব্যাপি আলোচনা চলছে। অনেক আলেমগণও ব্যক্তিগত ভাবে অন লাইনে এসে সরকারকে আহবান জানাচ্ছেন মসজিদ খুলে দিয়ে তারাবীর নামাজ পড়ার জন্য।

মোটকথা সকলেরই মনের কথা সুন্দর। লক্ষ্য উদ্দেশ্য সহী। আমি কারো মাঝে কোন বিদ্বেষ ভাব দেখছিনা।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী চাচ্ছেন, মানুষের নিরাপত্তা। যেভাবে মহামারি শুরু হয়েছে। তাতে তো মানুষ যেন মসজিদে গ্যাদারিং করে সংক্রমিত না হয়। মানুষ যেন সুস্থ থাকে। কেননা, মসজিদে তো বোঝা যায় না কে সুস্থ আর কে অসুস্থ। কে কোথা থেকে এসেছেন,সেটা আন্দাজ করা যায় না।

ওলামায়ে কেরামের উদ্দেশ্য অনেক সুন্দর। মাহে রমজান, বরকতের মাস। নেক আমলের মাধ্যমে, মানুষ কান্নাকাটির মাধ্যমে আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ করার দ্বারা এই মহামারি থেকে বাঁচতে পারবে বলে আশা করা যায়। মসজিদে- মসজিদে তওবা – ইস্তেগফার করে মহামারি থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যাবে। আশা করা যায় মহান আল্লাহ বালা- মুসিবত তুলে নিবেন।

সকলেই ভাল উদ্দেশ্যে নিজ নিজ অবস্থান থেকে বক্তব্য পেশ করছেন। নেক উদ্দেশ্য সকলেরই।

তবে আমি বলব, আমাদের মুরুব্বীদের আরো চিন্তা করা দরকার। ভাবার বিষয়। শুধু এক জামাত নয়। সকল শ্রেণীর আলেমদের ঐক্যবদ্ধ প্লাট – ফরম জরুরী। এই সংকটময় মুহূর্তে সব শ্রেণীর আলেমদের এক জায়গায় বসে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ইসলামিক ফাউন্ডেশন যেমন কিছুটা করতে সক্ষম হয়েছিল, ওর থেকে আরো জোরালো ভাবে এক টেবিলে বসে সিদ্ধান্ত নিলে সেটা সকলের কাছে গ্রহন যোগ্য বেশী হবে বলে আশা করা যায়।

এখানে অনেক ভাবতে হবে আলেমদের। বর্তমানের হালাতটা কি? কদিন আগে যে পরিস্থিতি ছিল, তার থেকে এখন কিন্তু আরো ভয়াবহ অবস্থা। এই পরিস্থিতিতে কি করণীয়, সেটা অনেক চিন্তা করে জাতির সামনে সঠিক বিষয়টা পেশ করতে হবে।

আমরা জানি, মসজিদে হারামে নামাজ আদায় করলে বেশী ছওয়াব। দুনিয়ার যত মসজিদ আছে, সকল মসজিদ থেকে উত্তম মসজিদ হলো মসজিদে হারাম।যেটা মক্কায় অবস্থিত। যেখানে নামাজ আদায় করলে এক লক্ষগুণ ছওয়াব।

এমনি ভাবে বায়তুল্লাহ, কাবা ঘর, যার মর্য্যার সাথে কোন তুলনা চলেনা। যে ঘরের দিকে খালি চোখে তাকিয়ে থাকলেও ছওয়াব আছে। সেই মসজিদে হারামে নামাজ আদায় করাকে সীমিত করা হয়েছে। একদম কড়া নিয়ন্ত্রণে। অথচ ও গুলো কিন্তু দুআ কবুলেরই জায়গা। ওখানে যে দুআ করা হয়, আল্লাহ কবুল করেন।

এমনি ভাবে মসজিদে হারামের পরে সন্মানিত স্হান কিন্তু মসজিদে নববী। মদিনার মসজিদ। সেখানেও প্রবেশে কড়া নিষেধ। সেখানেও দুআ কবুলের জায়গা রয়েছে।

এদৎ স্বত্ত্বেও মসজিদে হারামের তারাবী বন্ধ। মসজিদে নববীর তারাবী বন্ধ। দুআ কবুলের যত জায়গা আছে, সব জায়গা বন্ধ রাখা হয়েছে। আসলে একটা বৃহত্তর স্বার্থের দিকে তাকায়ে সৌদি সরকার কড়াকড়ি আরোপ করেছেন। যাতে মানুষ ক্ষতি গ্রস্হ না হয়।

বাংলাদেশের আলেমগণের সার্বিক দিক বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া চাই। মানুষের জীবন বড়। আল্লাহ বলেছেন, ওয়ালা তুলকু বি আইদিকুম ইলাত তাহলুকা” তোমরা নিজেদেরকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিওনা।

সরকার একা কিন্তু পারবেনা এই মহামারি থেকে কাউকে রক্ষা করতে। নিজেদের কে সচেতন হতে হবে। আমাদের সকলকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ভেবে চিন্তে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আল্লাহ তায়ালা আমাদের হেফাজত করুন। এদেশ জাতিকে হেফাজত করুন। আমিন।

লেখক : শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *