সচেতন নাগরিকরাই পারে ঢাকার পুরনো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে

সচেতন নাগরিকরাই পারে ঢাকার পুরনো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে

সচেতন নাগরিকরাই পারে ঢাকার পুরনো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে

ফয়জুল্লাহ আমান ● বুড়িগঙ্গার তীর ধরে প্রায় সাতশত বছরে গড়ে উঠেছে আজকের ঢাকা। প্রাচীন কাল থেকে এখানে বসতি থাকার ইতিহাস পাওয়া গেলেও ঢাকা হিসেবে নামকরণ হয় আরও পরে সম্রাট জাহাঙ্গিরের আমলে। ১৬০৮ সালে সুবাদার ইসলাম খানের মাধ্যমে নতুন এক নগরী হিসেবে পৃথিবীতে স্থান করে নিয়েছিল। এরপর ১৭৫৭ সালে মুর্শিদাবাদের পতনের মাধ্যমে ঢাকারও পতন। ১৮৬৪ সালের পৌর এক্টের ভিত্তিতে বৃটিশদের কিছুটা মনোযোগ সৃষ্টি হয় এই শহরের প্রতি। এই তো কিছু দিন আগেও ১৯৪৭ সালে এশহরের জনসংখ্যা ছিল দু লাখ পঁচানব্বই হাজার। বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় তিন কোটিতে গিয়ে ঠেকছে। আজকের সিটি কর্পোরেশনের সূচনা মাত্র ত্রিশ বছর আগে। ১৯৯০ সালে। একসময় চকবাজার থেকে সূত্রাপুর লোহারপুল পর্যন্ত যে ঢাকা তা আজ কতটা সম্প্রসারিত তা ভাবতেই বিস্ময় মানতে হয়।

ধূলার শহর ধোঁয়ার শহর এবং জ্যামের শহর বলে অনেক লকব দেওয়া হচ্ছে ঢাকাকে। দূষণ ও অব্যবস্থাপনা সত্যি সমাজকর্মীদের ভাবিয়ে তুলছে। বসতির ঘনত্বের কারণে জনজীবনের মৌলিক চাহিদাগুলির ব্যবস্থা করতে মিউনিসিপ্যাল কর্তৃপক্ষের হিমশিম খেতে হয়। সঠিক পরিকল্পনার অভাবে এই নগরবাসীকে অনেক বেশি ভুগতে হচ্ছে। বসবাসের উপযোগিতা হারিয়ে ফেললেও অনেকটা বাধ্য হয়েই রাজধানিমুখি মানুষকে ঠাসাঠাসি করে হলেও থাকতে হচ্ছে। থাকতে যখন হচ্ছেই তখন একটু ভালভাবে থাকার ইচ্ছা আমাদের হতেই পারে।

এখানে সব সমস্যার কথা বলছি না। সব সমস্যা একবারে সমাধান হয়ত সম্ভবও নয়। কিন্তু কিছু বিষয় আছে স্বল্প মনোযোগে সমাধান করা সম্ভব। ঘন বসতির কারণে মাটির নীচ দিয়ে অনেক সেবা নগরবাসীর কাছে পৌঁছাতে হয়। বিশেষত চারটি সেবার কথা বলব। পানি, বিদ্যুত, টেলিফোন, গ্যাস। এ ছাড়া পয়ো নিষ্কাশনও করতে হয় মাটির নিচে দিয়ে। প্রত্যেকটির জন্য রয়েছে পৃথক দফতর। বাড্ডা থেকে নিয়ে পুরান ঢাকা বিশেষত দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের নাগরিকরা সমস্যাগুলি কয়েক বছরে নিজেদের চোখে দেখেছেন। উত্তরের দিকেও সমস্যাগুলির প্রাদুর্ভব হতে খুব একটা বাকি নেই।

মনে করুন বর্ষাকালে ড্রেনের পানি জমে যাওয়ার কারণে পুরো সিটির নিষ্কাশন ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে কর্তৃপক্ষ খুব আন্তরিকতার সাথে কাজ শুরু করল। আমাদের মালিবাগ এলাকার বেশ কয়েকটি রাস্তা ভাঙ্গা হলো। ছয় মাস লাগিয়ে ড্রেন ঠিক হলো। ভাঙ্গা রাস্তায় চলাচলে এলাকাবাসীর কষ্ট হয়। তা উন্নয়নের স্বার্থে সয়ে যাওয়া ছাড়া উপায় নাই। প্রায় বছর লাগিয়ে যখন রাস্তাটি ঠিক হলো তখনই দেখা গেল পানির লাইনে সমস্যা হয়েছে। ড্রেনের কাজ করতে গিয়ে পানির লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এলাকাবাসী ওয়াশাকে জানালে তারা আবার গড়া রাস্তাটি ভেঙ্গে পানির লাইন ঠিক করল। কয়েক মাস লাগল তাতে। এরপরই দেখা গেল গ্যাসের লাইনে বা বিদ্যুতের লাইনে কোথাও সমস্যা দেখা দিয়েছে। টিএন্ডটির ফোনের সেবাগ্রহণকারীর সংখ্যা কমে এসেছে অনেক তবু তাদেরও মাটি খুড়তে হয় দু একটি বাসা বা অফিসে সেবা পৌঁছাতে।

মেইন রোডে দ্রুত কাজ শেষ করার তাড়া থাকে। যানজট নিরসনের স্বার্থে। গলি ঘুপচিতে কাজ শুরু হলে সেখানে আর তাড়া থাকে না। আমরা নগরবাসী একবার কাজ শুরু হলে তিনবছরের জন্য খোড়াখুড়ির কাজের কারণে চলাফেরার সমস্যাগুলো মেনে নিতে বাধ্য হই। উন্নয়নের স্বার্থে আমরা সব যন্ত্রণা মেনে নিতে প্রস্তুত। কিন্তু একটা বিষয় ভাবলে আমাদের যন্ত্রণা আরও বেড়ে যায়। যে সব উন্নয়নের কাজ হচ্ছে তাতে সরকারের ব্যয় বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। সরকারের অর্থ সে তো দেশেরই অর্থ। জনগণের অর্থ। সঠিক ব্যবস্থাপনা হলে হয়ত এরচেয়ে অনেক কম খরচে এবং কম ভোগান্তিতে নাগরিক সুবিধাগুলি পেতে পারতাম। সিটি কর্পোরেশনের কর্তা ব্যক্তিদের চোখে আমার লেখাটি পড়বে কি না জানি না। অন্তত আমরা নাগরিকরা যদি সচেতন হই তবে কোনো না কোনোভাবে কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হবো।

উন্নত বিশ্বে আমাদের যতদূর জানাশোনা, এধরনের কাজের সময় যে কোনো দফতরের কাজ হোক, এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য দফতরের লোকদেরও যোগাযোগ থাকে। এতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কম থাকে এবং কোনো কাজ অন্য দফতরের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকলে একসাথেই সবগুলি কাজ করে নেওয়া হয়। উদহারণত বিদ্যুত বিভাগের কোনো কাজে নামতে হলে ওয়াশাকে জানিয়ে দিবে, আমরা অমুক এলাকায় বিদ্যুতের কাজে মাটি খুড়ব। আপনাদের প্রতিনিধি আমাদের সঙ্গে থাকতে হবে। গ্যাসের কর্তৃপক্ষকেও জানিয়ে দিবে। ড্রেনের লোকদেরও একইভাবে অবগত করতে হবে। মাটির নিচের যে কোনো বিভাগের কাজ অন্য বিভাগের লোকদের সমন্বয়ের মাধ্যমে হলে অবশ্যই আরও কম খরচে এবং কম ভোগান্তিতে সম্পন্ন হওয়া সম্ভব। কাছাকাছি সময়ে কোনো কাজ থাকলে আগ পিছ করে একসাথে কাজ করার সুযোগও থাকে।

এখানে একটি কথা বলে রাখা আবশ্যক। ইউরোপ আমেরিকা বা মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে তুলনা করে অনেক সময় আমরা বিস্ময় প্রকাশ করি। সেখানের চেয়ে আমাদের রাস্তাঘাট নির্মাণের ব্যয় বহু গুণ বেশি। করপশন যে একেবারে নেই তা নয় কিন্তু কেবল অব্যবস্থাপনা বা দুর্ণিতির কারণে নয় বরং আমাদের দেশের নির্মাণ কাজে ব্যয় বৃদ্ধির বাস্তবসম্মত কারণও রয়েছে; উন্নত বিশ্বে যেই সমস্যাগুলি অনুপস্থিত। মধ্যপ্রাচ্যে বা ইউরোপে ফাকা মাঠে রাস্তা তৈরি হয়। আমাদের কিন্তু পুরনো স্থাপনা সরিয়ে সরিয়ে কাজ করে যেতে হয়। উচ্ছেদ অভিযান চালাতে হয়। কারো দোকান ভাঙ্গতে হয় কারো বা বাড়ি। পুরোনো বসতবাটির মালিকদের বিকল্প ব্যবস্থাও করতে হয় পূর্ত বিভাগকে। সময় ও অর্থ এজন্য অনেক বেশি ব্যয় হওয়া একেবারে অস্বাভাবিক নয়। তবু করোপশন অবশ্যই সমূলে শেষ করতে হবে। ব্যবস্থাপনা সুন্দর হলে কিছুটা তো সাশ্রয় হবে। দারিদ্র পীড়িত এ দেশে যতটা ব্যয় সংকোচন সম্ভব তাতে দেশ ও দেশের জনসাধারণের জন্য কল্যাণকর।

ওয়াশা, গ্যাস, বিদ্যুত এবং ড্রেনের কাজগুলি শতবছর ধরে চলছে। সিস্টেমের পরিবর্তন না হলে আরও কত শত বছর চলবে বলা মুশকিল। রাজধানী থেকে দক্ষিণে পদ্মাসেতুর দিকে ঢাকা সম্প্রসারিত হবার পর পরিস্থিতি কিছুটা পরিবর্তন হবে। তবু ঢাকার চাপ হয়ত কমবে না। ঐতিহ্যবাহি এই মহানগরের প্রতি রাঢ় অঞ্চলের মানুষের মোহ অত সহজে কাটবে না।

প্যারিস বা নিউইয়র্ক না হোক ঢাকা যেন তার পুরনো ঐতিহ্য নিয়ে থাকতে পারে তা আমাদের সবার প্রত্যাশা। কেবল সিটিকর্পোরেশন কর্তৃপক্ষের নয় এই মহানগরির অধিবাসী প্রত্যেক নাগরিককেই আরও সচেতন হতে হবে। নাগরিক সুবিধাগুলি পেতে আমাদের হতে হবে পরিবেশ বান্ধব। আরেকটু মানবিক আরেকটু সুন্দর এবং রুচিশীল ও পরিচ্ছন্ন মেজাযের।

লেখক : সিনিয়র মুহাদ্দিস, জামিআ ইকরা বাংলাদেশ

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *