সম্রাট আওরঙ্গজেবের ঈদ উদযাপন

সম্রাট আওরঙ্গজেবের ঈদ উদযাপন

চৌধুরী আতিকুর রহমান : সাকি মুস্তাইদ খান লিখিত মাসির ই আলমগিরি হল সম্রাট আওরঙ্গজেবের জীবনী। তাঁর শাসনকালের বিবরণের জন্যে আওরঙ্গজেব মির্জা মহম্মদ কাজিম নামক এক ব্যক্তিকে নিয়ুক্ত করেন। তখন বইটির নাম ছিল আলমগিরনামাহ। ১০ বছর পর ব্যয়সঙ্কোচের জন্যে সম্রাট তাঁর জীবনী লেখা বন্ধ করে দেন। ১৭০৭-এ তাঁর ইহলোক ত্যাগের পর সম্রাটের ব্যক্তিগত সচিব, শিষ্য, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অনুগামী ইনায়েতউল্লাহ খান কাশ্মিরি বাদশাহি নথির ভান্ডার সাকি মুস্তাইদ খানের সামনে অবারিত করে দেন। আওরঙ্গজেবের শাসনকালের দিল্লিতে পাঠানো বিভিন্ন প্রাদেশিক ঘটনাবলি বা যুদ্ধকালিন তাঁবুতে বসবাসরত অবস্থায় ঘটনা এই বইয়ে লিপিবদ্ধ হয়েছে। জীবনিকার প্রতিটি অধ্যায় শুরু করেছেন রমজান মাস থেকে, শেষও করেছেন রমজান আসার আগে। আওরঙ্গজেবের শাসনকালের মোট ৫০/৫১ বছর, ৭ জিলহজ্জ ১০৬৭ হিজরি (০৬.০৯.১৬৫৭) থেকে ১১১৮ হিজরি (২০.০২.১৭০৭) পর্যন্ত লিখিত হয়েছে।

১৬৫৮-র রমজান মাসে আওরঙ্গজেব দারাকে সরিযে দিল্লি ও আগ্রা দখল করেন। সেই বছরই প্রথম জিলক্কদ (২১ জুলাই) স্বল্প অনুষ্ঠান দিয়ে তাঁর প্রথমবার রাজ্যাভিষেক হয়। এরপর ভাইদের সঙ্গে মরণপণ লড়াইয়ে তিনি জিতে এলে ২৪ রমজান ১০৬৯ (৫-ই জুন ১৬৫৯)–এ ৪০/৪১ বছর বয়সে দ্বিতীয়বার ও প্রকৃত রাজ্যাভষেক হয়। খুৎবা পাঠ ও কোরআন তেলাওতের মাধ্যমে অভিষেকের পর তিনি রাজকোষ দরিদ্র-ধনী-সভাষদ সকলের সামনে খুলে দিলেন। প্রথম ফরমানটি ছিল, স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রার উপর লিখিত কলমা ও কোরআনের বাণি সরিয়ে মির আব্দুল বাকি লিখিত কবিতা, ‘বাদশাহ আওরঙ্গজেব আলমগির, মুদ্রা মুদ্রিত করেছেন, বিশ্বে যেন তিনি জ্যোছনার পূর্ণ চাঁদ’- একপিঠে লিখিত হয় এবং অন্য পিঠে যে শহরে মুদ্রিত হয়েছে ও অভিষেকের বছর লিখিত হয়। এটা করার কারণ ছিল কলমা ও কোরআনের বাণি লিখিত মুদ্রা মানুষ হাতে-পায়ে ঠেকাত। রাজকীয় শিলমোহরে উৎকীর্ণ করা হল ‘আবুল জাফর মহিুউদ্দিন মুহম্মদ আওরঙ্গজেব বাহাদুর আলমগির পাদিশাহ গাজি’। তিনি যেহেতু সম্রাট হওয়ার পথে সব বিজয়ই রমজান মাসে অর্জন করেছেন তাই ঘোষনা করে দিলেন রমজান মাসকেই সাম্রাজ্যে সরকারি কাজের বছর আরম্ভের মাস হিসাবে ধরা হবে। পার্শি ফারওযার্দি মাস অনুযাযী জামশেদ ও নওরোজের মত পারস্য দেশীয় উৎসবকে পরিত্যাগ করে তিনি রমজান মাসকেই উৎসব শুরুর মাস ও প্রথম সাওয়াল বা ইদুলফিতরকে উৎসব শেষের দিন হিসাবে ঘোষণা করলেন। নাম দিলেন নিশাত-আফরোজ জসন। এরপর মোল্লা আউজ ওযাজিহকে ১৫০০০ টাকা মাসিক বেতনের পরিবর্তে এক হাজারি মনসবদারি দিয়ে সাম্রাজ্যে ইসলাম বহির্ভুত যে কোন বেদাত বা শিরক প্রতিহত করার জন্যে নিযুক্ত করেন। ২৭-শে রমজান (৮-ই জুন) খবর পেলেন যুবরাজ মহম্মদ সুলতান সুজার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের পরিবর্তে কয়েকজন সঙ্গি নিয়ে নৌকা করে সুজার সঙ্গে মিলিত হয়েছেন।

১০৭০ হিজরি ১-লা মে ১৬৬০ বাদশাহির তিন বছরে রমজান শুরু হল। খবর এলো সম্রাটের বাহিনির তীব্র আক্রমণের সামনে দাড়াতে না পেরে সাহ সুজা ঢাকা ছেড়ে আরাকানে পালিয়ে গেছেন। ৬ রমজান সেনাপতি মুয়াজ্জেন খান ঢাকায় প্রবেশ করেছেন। ২৪-শে রমজান অর্থাৎ ২৪-শে মে রাজ্যাভিষেকের দিন থেকেই উৎসব শুরু হল। দরবারের প্রতিটি ছোট-বড়, দূরবর্তী-নিকটবর্তী কর্মচারীকে উপহার দেওয়া হয়। ঈদের দিন সকালে সম্রাট মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়ে আরো দুদিন ধরে ভোজনসহ আনন্দ উপভোগ করেন।
রাজত্বের ৪র্থ-বছরও শুরু হল রমজান থেকে। কিন্তু প্রজারা যেহেতু রোজা রাখার কারণে আনন্দ উৎসবকে ভালো চোখে দেখছে না তাই রমজান ২৪ তারিখ থেকে উৎসব স্থগিত করে দেওযা হল। ঈদের পর থেকে আরও ১০ দিন সময় নিয়ে উৎসবের দিন ঠিক করা হল। 20-শে মে 1661 হল প্রথম সাওযাল। সম্রাট ঈদগাহে গিয়ে নামাজ পড়লেন। তারপর শাহজাদা, অভিজাত, রাজা, আমির সকল মানুষকে পুরস্কার ও উপহার দিলেন। কাশিম আকা রুমি বসরার শাসক হুসেন পাসার তরফ থেকে ৫টি আরবি ঘোড়া সহ আরও কয়েকটি ঘোড়া আর জর্জীয় দাস উপহার হিসাবে দিলেন। তাঁকে মূল্যবান পোশাক ও ৫০০০ টাকা উপহার দেওযা হল। পারস্যদেশের দূত বুদাক বেগ ২২ অথবা 23 মে দিল্লির নিকটবর্তী হলে আসাদ খান, সাইফ খান ও মুলতাফাত খানকে পাঠানো হল তাঁকে স্বাগত জানানোর জন্যে। জনতার সামনে তাঁর সঙ্গে পরিচয়ের জন্যে হলঘরের ব্যবস্থা করা হল। সম্রাটকে যথাযথ সম্মানের পর সম্রাটকে তাঁর সিংহাসনোরোহনের জন্যে ধন্যবাদজ্ঞাপক শাহর পত্র পেশ করা হল। বাদশাকে দেওযা হল রত্নখচিত পাগড়ি, ছুরি, স্বর্ণমন্ডিত কাপ ও ডিস, পান ও স্বর্ণ নির্মিত পান দান, ট্রে। ৭ সাওয়াল বাদশাহকে ৬৬ টি ঘোড়া, ৩৭ ক্যারাটের মুক্তো যার দাম চার লাখ টাকা ও ২০০০০ টাকা উপহার দেওযা হল।

রাজত্বের পঞ্চম বর্ষে রমজান মাস ধর্মীয় কর্তব্যের মধ্যে কেটে গেল। ১০ মে ১৬৬২ ঈদ উদযাপিত হল। সম্রাট নামাজ শেষে সকলকে যথারীতি উপহার ও পুরস্কার দিলেন। ১২-ই মে বাদশাহ অসুস্ত হয়ে পড়েন। প্রচুর রক্তক্ষরণের ফলে দুর্বল হয়ে পড়েন। ১৩-ই মে সুস্থ হন। হাকিম মুহম্মদ আমিল ও হাকিম মাহদি তাঁর চিকিৎসা করেন।

অভিষেকের ষষ্ঠ বছর সভাসদরা রাবি নদীর তিরে দিলকশা উদ্যানে উৎসবের যাবতীয় ব্যবস্থা করলেন। ২৪ রমজান সম্রাট কাশ্মিরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। উদ্যানে পৌঁছানোর পরই খবর পেলেন খান ই খানান মারা গেছেন। ২৯ এপ্রিল ঈদের নামাজ পড়লেন তাঁবুর অস্থায়ী মসজিদে। যতারীতি পুরস্কার ও উপহারের পালা সাঙ্গ হল। ১ মে কাশ্মিরের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলেন। খবর পেলেন শিবাজি শাযেস্তা খাঁর শিবিরে আক্রমণে করে তাঁর তর্জনি কেটে ফেলেছেন।

রাজত্বের ৭-ম বর্ষ অন্যান্য বছরের মতই কাটল। অষ্টম বর্ষে মসজিদে নামাজ শেষে তিনি উপহার ও পুরস্কার বিতরন করলেন। রাজত্বের ৪র্থ বছরে তিনি হাজি আহমেদ সঈদকে ৬ লাখ ৬০ হাজার টাকার মত উপহার দিয়ে মক্কা ও মদিনার উদ্দেশ্যে পাঠিয়েছিলেন। তিনি ১৪ টি আরবি ঘোড়া এনেছিলেন এবং মক্কার শরিফের প্রতিনিধি সৈয়দ ইয়াহিয়া শরিফের একটি পত্র, তিনটি আরবি ঘোড়া ও কয়েকটি পবিত্র স্মৃতি বাদশাহর জন্যে উপহার হিসাবে আনেন। তাঁকে মূল্যবান পোশাক ও ৬০০০ টাকা দেওযা হল। আবিসিনিয়া থেকে এসেছিলেন সিদ্দি কামিল।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *